সাদকে আপনি টকশোতে পাবেন না, টিভি বা পত্রিকার ইন্টারভিউতে পাবেন না, ফেসবুকে পাবেন না, তিনি নেই ইন্সটাগ্রামেও। কোথাও তার একটা ইন্টারভিউ নেই, ভালো রেজ্যুলেশনের দুটো ছবিও নেই। সবকিছু থেকে দূরে সরে তিনি...

গুণী লোকজন নাকি একটু চাপা স্বভাবের হন, অন্তর্মুখী হন। ঢাকঢোল তো পিটিয়ে বেড়ান যাদের ভেতরটা ফাঁপা, যারা অন্তঃসারশূন্য, তারা। সবার ক্ষেত্রে এই যুক্তি কাজ করে না, তবে পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের বেলায় এই লাইনটাকে আপ্তবাক্য ধরা যায়। আস্ত একটা সিনেমা বানিয়ে ফেলেছেন বছর তিনেক আগে, সেই সিনেমা প্রশংসিত হয়েছে, বিদেশী ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃত হয়েছে, সবাই তাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়িয়েছে তখন, অথচ গুগল বা ইউটিউব ঘেঁটে তার একটা ইন্টারভিউ খুঁজে বের করা যাবে না! 'ইন্ট্রোভার্ট' শব্দটাও সাদকে দেখলে লজ্জা পাবে সম্ভবত। 

লাইভ ফ্রম ঢাকার ট্রেলারে মোস্তফা মনোয়ারকে দিয়ে সাদ যখন বলিয়ে নিলেন- 'এই বালের শহরে সবকিছু উল্টাপাল্টা! বারো মিলিয়ন মানুষ সারাক্ষণ একজন আরেকজনের সাথে কুত্তার মত ঘেউ ঘেউ করে। এত মানুষের ঘাম, রক্ত আর গুয়ের গন্ধে আমার বমি আসে...' - তখন একটা ধাক্কার মতো লেগেছিল। সিনেমা বা নির্মাতার সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান না থাকা স্বত্বেও সিনেপ্লেক্সে গিয়ে দেখেছিলাম লাইভ ফ্রম ঢাকা। দেড়ঘন্টার এক সাদাকালো জার্নিতে ডুব দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। এই শহরের বুকে মঞ্চস্থ হওয়া এক দুর্বিষহ জীবনের গল্প প্রত্যক্ষ্য করেছিলাম সেদিন, যে গল্পটা আমার জীবনে আছে, আপনার জীবনে ঘটছে, ঘটছে আরও কোটি মানুষের জীবনে, প্রতিদিনই। 

আপনার মাথাভর্তি সিনেমা বানানোর পোকা, অথচ পকেটে কিচ্ছু নেই। ষোলো লাখ টাকা দিয়ে কি হয়? একটা মানুষ মধ্যবিত্ত স্ট্যান্ডার্ডে ঢাকা শহরে দুই বছরও টিকে থাকতে পারে না ষোলো লাখ টাকায়। অথচ এই টাকা দিয়ে আস্ত একটা সিনেমা বানিয়ে ফেলেছিলেন আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ! মুগ্ধ হয়েছিলাম ক্যামেরার কাজে, একটা পঞ্চাশ মিলিমিটার লেন্স আর একটামাত্র ডিএসএলআর ক্যামেরা দিয়ে পুরো সিনেমাটা শ্যুট করা হয়েছে- এটা শুনেই চমকে উঠেছিলাম তখন! পুরো ফিল্ম জুড়ে এক্সপেরিমেন্টের ছড়াছড়ি, কিন্ত সেসবের কোনটাতেই তেমন বিরক্তি আসে না, বরং মুগ্ধতা বাড়ে পাল্লা দিয়ে। সিনেমার জাম্পশটগুলোও দারুণ, যদিও এই ধরণের কাজ আগে হলিউডি সিনেমায় অনেক হয়েছে। তবুও বাংলাদেশী সিনেমায় এমন কিছু দেখা নতুন অভিজ্ঞতা ছিল।

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ। ছবি- প্রথম আলো

২৭তম সিঙ্গাপুর ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সেরা পরিচালক হিসেবে সিলভার স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড জিতেছিলেন সাদ, এই সিনেমার জন্য। লাইভ ফ্রম ঢাকার পর সাদকে নিয়ে আলোড়ন পড়ে যাওয়ার কথা ছিল। পড়েনি, সেটার একটা বড় কারণ সাদ নিজে। মিডিয়া তাকে খুঁজে হয়রান হয়েছে, একটা ইন্টারভিউর জন্য পেছনে পড়েছেন সাংবাদিকেরা। সাদ থোড়াই কেয়ার করেছেন সেসব প্রচারণাকে। তার মাথায় তখন পরের সিনেমার গল্প ঘুরছে। নিজের রুমে একাকী বসে তিনি লিখছেন চিত্রনাট্য, সাজাচ্ছেন একটার পর একটা সিকোয়েন্স। 

সেই সিনেমার নাম 'রেহানা মরিয়ম নূর'। প্রতিবাদী এক শিক্ষিকাকে নিয়ে সিনেমার গল্প। কেউ খোঁজ রাখেনি, বা রাখার চেষ্টা করেও খোঁজ পায়নি, দুই বছর ধরে সাদ গোপনে সিনেমার শুটিং করলেন, শেষ করে ফেললেন পোস্ট প্রোডাকশনের কাজও। তিনি নিজে আলোর বাইরে থাকা মানুষ, অভিনয়শিল্পী আর কলাকুশলীদেরও কঠোরভাবে নিষেধ করে দেয়া হয়েছিল, সিনেমার ব্যাপারে কোন তথ্য যেন বাইরে না যায়। সাদ বোধহয় নিশ্চিত ছিলেন, তার এই প্রোজেক্টটা একদিন বিস্ফোরণ ঘটাবে। বোমাটা যখন ফাটলো বিশাল গর্জনে, সবাই যখন তাকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছে, তখনও তিনি কোথাও নেই, তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না অনলাইন কিংবা অফলাইনে।  

ক্যালেন্ডারের পাতায় তেসরা জুন দুই হাজার একুশ- এই তারিখটা মনে রাখবে বাংলাদেশের অনেক সিনেমাপ্রেমী মানুষ। সাদের সিনেমা রেহানা মরিয়ম নূর জায়গা করে নিয়েছে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ৭৪তম আসরের অফিসিয়াল সিলেকশনে। ‘আঁ সার্তে রিগার্দ’ বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে এই ছবিটি। এই খেতাব সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল না। যখন জানলাম, কান চলচ্চিত্র উৎসবের মূল পর্বের প্রতিযোগিতা বিভাগ ও আঁ সার্তে রিগার্দ বিভাগের মধ্যে একটিতে বাংলাদেশ থেকে এবারই প্রথম কোনও চলচ্চিত্র নির্বাচিত হলো- তখন বুঝলাম এর মাহাত্ম্য! এই সিনেমার পোস্টারে এখন শোভা পাবে কানের সম্মানজনক লোগো। ভাবতে পারছেন ব্যাপারটা? 

সাদ ও তার রেহানা মরিয়ম নূর

আজকের দিনের নায়ক সাদ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, কোন সন্দেহ নেই। আরও কয়েকদিন তাকে নিয়ে মাতামাতি চলবে। কিন্তু এই লোকটাকে এবারও খুঁজে পাওয়া যাবে না, মোটামুটি নিশ্চিত আমি। তিনি চুপটি করে পড়ে থাকবেন ঘরের এক কোণে। মাথায় ঘুরবে নতুন কোন গল্পের প্লট, ডালপালা মেলবে সেগুলো। ল্যাপটপের কীবোর্ডে ঝড় তুলবেন, লিখবেন চিত্রনাট্য। সাদকে আপনি টকশোতে পাবেন না, টিভি বা পত্রিকার ইন্টারভিউতে পাবেন না, ফেসবুকে পাবেন না, তিনি নেই ইন্সটাগ্রামেও। কোথাও তার একটা ইন্টারভিউ নেই, ভালো রেজ্যুলেশনের দুটো ছবিও নেই। সবকিছু থেকে দূরে সরে তিনি কাজের মধ্যেই ডুব দিয়ে পড়ে থাকেন, নিজস্ব একটা জগত আছে তার, সেখানেই তার বাস। 

চট্টগ্রামে জন্ম নেয়া এই তরুণ কিন্তু এই ডুব দিয়ে থাকাটাকে উপভোগই করেন, এটাই তার কমফোর্ট জোন। এই অভ্যাসের জন্য লোকে যে তাকে এলিয়েন ভাবে, সেটাও তিনি জানেন। স্বভাবে তিনি বিনয়ী, আলাপে স্পষ্টভাষী। নিজের এই প্রচারণার বাইরে থাকার ব্যাপারটা নিয়ে হাসতে হাসতেই তিনি অকপটে বলেন- ‘অনেকেই হয়তো আমাকে ভুল বোঝেন, কিন্তু আমাকে নিয়ে মাতামাতিটা আমার আন-ইজি লাগে, আমি বিব্রত হই।’

আমরা সাদকে বিব্রত না করি। তাকে তার কাজটা করতে দিই, তার মতো করে। সম্ভব হলে তার পাশে দাঁড়াই, সেটা দর্শক হিসেবে হোক, লগ্নিকারী হিসেবে হোক, কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে তাকে সিনেমা বানানোর জন্যে অনুদান দিয়েই হোক। নির্মাতার স্বাধীনতা আর স্বকীয়তা নিয়ে তিনি কাজ করে যান। 'লাইভ ফ্রম ঢাকা' বা 'রেহানা মরিয়ম নূর' তো কেবল মাঝসাগরে ভেসে থাকা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। গোটা হিমশৈলটার গভীরতা দেখা এখনও বাকি। সেই গভীরতা তিনি আমাদের নিশ্চয়ই দেখাবেন। সাদের জন্য ভালোবাসা, এবং শুভকামনা। আপনাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি সাদ! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা