একটি চলচ্চিত্রের সাধারণ সব বৈশিষ্ট্যের বাইরেও মানব পাচারের মত রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও সচেতনতার আভাস ‘শান’ ছবিটিকে বিশ্বের অন্যান্য মানব পাচার সম্পর্কিত ছবিটির তালিকাতেই শুধু স্থান দেয়নি; বরং দেশি বানিজ্যিক ছবিতে রাজনৈতিক সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় সংকটকেও প্রকাশ করেছে...

একদমই শুরুতে একটু বইপত্রের সংজ্ঞার মত করে শুরু করা যেতে পারে। মানব পাচার শব্দটার সঙ্গে মোটামুটি সবাই পরিচিত। তবে আদতে মানব পাচারের সংজ্ঞা কী? জোরপূর্বক শ্রম, যৌন দাসত্ব অথবা পাচারকৃত মানুষদেরকে ব্যবসায়িক যৌনশোষণমূলক কাজে নিয়োজিত করার জন্য সংঘটিত অবৈধ মানব বাণিজ্যকে মানব পাচার বলা হয়। এ বিষয়টি জোরপূর্বক বিবাহের মাধ্যমে পত্নী জোগাড়, অঙ্গহানি বা টিস্যু/কলাহানি বা ভ্রূণকোষ ধ্বংস করাকেও পরিবেষ্টন করতে পারে। মানব পাচার মূলত নারী এবং শিশু পাচারকেই ইঙ্গিত করে থাকে। কিন্তু অঙ্গ পাচার বিষয়টি বেশ গুরুতর। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের তথ্য মতে, মহামারী করোনার সময়েও ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমকালে মোট ১০৬ জন পুরুষ, ৩২ জন নারী ও ১২ জন শিশু আটক হয়। মোট ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয় ৭৭টি এবং একজন পাচারকারীও ধরা পরে। এটা শুধু কয়েক মাসের সীমান্ত অতিক্রমকালে আটকের হিসাব, এছাড়া আরও হাজার হাজার নারী-পুরুষকে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। প্রতি বছরই মানব পাচার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

খুবই চাঞ্চল্যকর বিষয়টি নিয়ে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে তেমন একটা ছাপ পাওয়া যায় না। ২০২০ সালের অর্ধেক সময়েই ১০৬ জন পুরুষ, ৩২ জন নারী ও ১২ জন শিশুকে পাচার করার সময় আটক করা হলেও, পরের বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় এই বিষয়কে উপজীব্য করে লেখা বইয়ের তেমন কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। গত বিশ বছর ধরে সমানুপাতিক হারে বাড়তে থাকা মানব পাচার ও অঙ্গহানি করে সেগুলো কালো বাজারে বিক্রির বিষয়টি নিয়ে সাহিত্য-সিনেমা তথা শিল্প মাধ্যমে সরব হতে দেখা যায়নি তেমন কাউকে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিল্প মাধ্যমের কাজই হলো শৈল্পিক উপায়ে সমাজের বাস্তবতার দিকগুলো ফুটিয়ে তোলা। সচেতন দর্শক মাত্রই অনুভব করবেন চলচ্চিত্রে মুলত অমুক বিষয়টিকে সামনে আনা হয়েছে। শৈল্পিক কারিশমা থাকার কারণেই আজও মানুষের বিনোদন ও চিন্তার খোড়াক জুগিয়ে আসছে চলচ্চিত্র।

যদিও বিশ্বের দিকে তাকালে এমন সিনেমার উদাহরণ পাওয়া যায় অনেক। ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘স্পার্টান’ তেমনই এক সিনেমা। যেখানে দেখা যায়, যখন রাষ্ট্রপতির কন্যা, লোরা নিউটন যেই চরিত্রে অভিনয় করেছেন ক্রিস্টেন বেল, একটি মানব পাচারকারী চক্র দ্বারা অপহরণ করা হয়, তখন উচ্চ পদস্থ সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট রবার্ট স্কট (অভিনয়ে ভ্যাল কিলমার) মামলাটির দায়িত্ব নেন। রবার্ট তদন্ত শুরু করেন, কিন্তু লোরার মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলে অপারেশনটি বন্ধ হয়ে যায়। যাইহোক, রবার্ট এবং কার্টিস, যারা বিপরীতে প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন, তাদের অনুসন্ধান চালিয়ে যান এবং শীঘ্রই একটি চাঞ্চল্যকর বিষয় সামনে আসে। এভাবেই এগিয়ে যায় মানব পাচার সম্পর্কিত এক দারুণ গল্প। যেটি বক্স অফিসে ৮ দশমিক ১১ মিলিয়ন ডলার আয় করেছিলো।

স্পার্টম্যান সিনেমার পোস্টার

এছাড়াও ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সোল্ড’ সিনেমা, যেখানে লক্ষ্মী নামের একটি নেপালি বাচ্চা মেয়েকে আমরা দেখি যে কিনা প্রচন্ড দুর্দশার মধ্যে বাবা-মা কে নিয়েও থাকলেও স্বপ্ন দেখে স্কুলে যাবার। তেমনই এক সময় শহর থেকে আসা বিমলা নামের একজন বিদেশী তাকে ভারতে দাসী হিসেবে বিক্রি করার প্রস্তাব দেয় বাবা-মায়ের কাছে। মা অস্বীকৃতি জানালেও, বাবা জানান প্রচন্ড দারিদ্রতা ও দুর্দশার কারণে তিনি ইতোমধ্যে বিমলা থেকে লক্ষ্মীকে বিক্রি করার বিনিময়ে অর্থ গ্রহন করেছেন। শুরু হয় মানব পাচারের করুণ এক আখ্যান।

সোল্ড সিনেমার পোস্টার

মানব পাচারকে উপজীব্য করে চাঞ্চল্যকর চলচ্চিত্রের তালিকায় সম্প্রতি যোগ হতে চলেছে ঢাকাই একটি সিনেমা। ‘শান’ শিরোনামে আসন্ন ছবির গল্পের প্লটই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড সহ আশেপাশের দেশে গড়ে ওঠা মানব পাচারের নেটওয়ার্ককে কেন্দ্র করে। ‘শান’ সিনেমার ফার্স্ট লুকের পোস্টারেও দেখা গিয়েছিলো এরই ছাপ। চোখ বাধা সারি সারি মানুষ, সামনে সীমান্তের কাঁটাতার। সামনের মানুষটির পেটে কাঁটা দাগ। যেন এক ছবিতেই মানব পাচারের অনেকটাই দেখিয়ে দিয়েছিলো ‘শান’ সিনেমার পোস্টার। তবে কিছুদিন আগে ট্রেলার মুক্তির পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

শান সিনেমার পোস্টার
শান সিনেমার পোস্টার

ট্রেলারে দেখা গেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাঝ সমুদ্রেই একটি সন্দেহজনক গতিবিধির জাহাজকে ঘিরে ধরা থেকে শুরু করে বাংলাদেশ পুলিশের মানব পাচার বিরোধী একশন, বিভিন্ন দেশের মানব অঙ্গ পাচারকারী নেটওয়ার্কের সূত্র ধরে বাংলাদেশের হোতাকে খুঁজে বের করা, ভদ্র মুখোশের আড়ালে মানব পাচার সহ দুর্দান্ত সব বৈশিষ্ট্যের আভাস।

একটি চলচ্চিত্রের সাধারণ সব বৈশিষ্ট্যের বাইরেও মানব পাচারের মত রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও সচেতনতার আভাস ‘শান’ ছবিটিকে বিশ্বের অন্যান্য মানব পাচার সম্পর্কিত ছবিটির তালিকাতেই শুধু স্থান দেয়নি; বরং দেশি বানিজ্যিক ছবিতে রাজনৈতিক সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় সংকটকেও প্রকাশ করে। ছবিটির স্ট্যান্ট শো’কে বিশ্বমানের করতে স্ট্যান্ট পরিচালনা করেছেন বলিউডের বিখ্যাত স্ট্যান্ট ডিরেক্টর আব্বাস আলী মোঘল। এছাড়াও এই ছবিতে গান গেয়েছেন বলিউডের একাধিক শিল্পী। খাঁটি দেশী ছবির আবহ তৈরি করতে পুরনো ও প্রবীন অভিনেতারাও এখানে কাজ করেছেন। ‘শান’ ছবির মাধ্যমে চব্বিশ বছর পর এক ছবিতে কাজ করেছেন অরুণা বিশ্বাস ও চম্পা। নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত মুখ সিয়াম আহমেদ অভিনয় করেছেন সিনেমার মূখ্য চরিত্রে। ২০২২ সালের প্রথম সপ্তাহেই মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথে মুলত ছবিটি মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীদের কর্মকান্ড দেখানোর পাশাপাশি, বাংলা ছবিতে মানব পাচারের মত ভয়ংকর বিষয়ের যে অনুপস্থিতি, তার শূন্যতা অনেকটাই পূরণ করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা