থ্রি ইডিয়টস কিংবা রং দে বাসন্তীর কথা বাদই দিলাম, এক ‘রেহনা হ্যায় তেরে দিল মে’ সিনেমাটা দিয়েই আমাদের মনে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন ম্যাডি, সেই আসন কভু টলে যাওয়ার নয়। মাধবন আমাদের কাছে ওল্ড ওয়াইনের মতোই, যতোই পুরনো হবেন, আবেদনটা আরও বাড়বে...

চকলেট বয় হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। দেড়যুগের ক্যারিয়ারে থ্রি ইডিয়টসের মতো সিনেমা তিনি করেছেন, বিক্রম ভেদায় জাঁদরেল পুলিশ অফিসার রূপে হাজির হয়েছেন, রঙ দে বাসন্তী বা তানু ওয়েডস মানু’র মতো সিনেমায় তাকে দেখা গেছে। নিজের শেকড় দক্ষিণী সিনেমায় তো শুরু থেকেই নিয়মিত, মণি রত্নমের মতো পরিচালকের সঙ্গে একাধিকবার জুটি বেঁধেছেন। অভিনয়প্রতিভা দিয়ে নিজেকে ভেঙেছেন বারবার, জায়গা করে নিয়েছেন দর্শকের মনে। কিন্ত আজও যখন মাধবনের প্রসঙ্গ ওঠে, সবার আগে ‘র‍্যাহনা হ্যায় তেরে দিল মে’ সিনেমাটার কথাই মাথায় আসে, কানে বাজে বিষণ্ণ সেই সুর, চোখে ভাসে বৃষ্টিভেজা সেই সিকোয়েন্সটার কথা! 

পুরো নাম রঙ্গনাথন বালাজি মাধবন, জন্ম ভারতের বিহারে, জামশেদপুর নামের একটা জায়গায়, জামশেদ টাটার নামে যে জায়গাটা এখন বিখ্যাত। দক্ষিণ ভারতীয় পরিবার, টাটা স্টিল ফ্যাক্টরিতে ম্যানেজারের চাকরি করতেন বাবা, আর মা ছিলেন ব্যাংকার। আর্থিক কষ্ট ছিল না ছোটবেলায়, অভিনেতা হওয়াটাও ফিউচার প্ল্যানের রাডারে ছিল না। বাবা-মা দুজনেই উচ্চশিক্ষিত, ছেলেমেয়েরাও ক্যারিয়ার নিয়ে ভীষণ সচেতন। ভালো ছাত্র ছিলেন, ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিঙে বিএসসি ডিগ্রি নিয়েছিলেন মাধবন।

কলেজ জীবনে ক্যাডেট কোরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেখান থেকেই তাকে পাঠানো হলো ইংল্যান্ডে। একটা শর্টকোর্সে তার একাগ্রতা আর অনুশীলনের প্রতি মনযোগ দেখে সিলেক্টরেরা তাকে অফার দিলেন ব্রিটিশ আর্মি, রয়্যাল নেভি এবং রয়্যাল ব্রিটিশ এয়ারফোর্সের হয়ে অনুশীলন করার জন্যে, অনুশীলন শেষ হলে চাকুরিও দেয়া হবে তাকে। দেয়া হলো সেই নিশ্চয়তা। কিন্ত বয়স কম থাকায় ব্যাটে বলে হলো না ব্যাপারটা, কোর্স শেষ করে মাধবন ফিরে এলেন ভারতে।

কলেজে শিক্ষকতা শুরু করলেন এবার। খুব আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলতে পারেন, বোরিং টপিককেও ইন্তারেস্টিং বানিয়ে ফেলেন- স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রছাত্রীদের প্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠলেন অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই। এই পুরো ঘটনাক্রমের কোথাও কিন্ত অভিনয় ব্যাপারটা ছিল না। কলেজ জীবনে নাটক-ফাটক করেছেন কিছু, কিন্ত সিরিয়াসলি অভিনয় করবেন, এটা মাধবন যেমন কোনদিন ভাবেননি, তার আশেপাশের মানুষও কখনও চিন্তা করেনি যে মাধবন অভিনয়ে নাম লেখাবেন। 

সেই পথে যাত্রার শুরুটা হলো ১৯৯৬ সালে, একটা টিভি কমার্শিয়াল দিয়ে। সেখান থেকে পরিচয় হলো বিখ্যাত পরিচালক মণি রত্নমের সঙ্গে, তার সিনেমায় রোল পাবার জন্যে অডিশনও দিলেন মাধবন। কিন্ত শিকে ছিঁড়ল না ভাগ্যে, বাদ পড়লেন তার চোখের কারণে, যে নিষ্পাপ চোখের দিকে তাকিয়ে খুন হয়ে যেতে চায় হাজারো তরুণী। মণি রত্নমের বক্তব্য ছিল, চরিত্রের তুলনায় মাধবনের লুকটা নাকি বেশিই ইনোসেন্ট ছিল! টিভি সিরিয়ালে কাজ করলেন, আবার ফোন এলো মণি রত্নমের চেম্বার থেকে। ততদিনে কন্নড়া ফিল্ম দিয়ে মাধবনের অভিষেকটা হয়ে গেছে। মণি রত্নম তাকে নিয়ে বানালেন ‘আলাইপৌথেই’ নামের একটা সিনেমা, সেটা ২০০০ সালের কথা। পরের বছর বলিউডে অভিষেক হয়ে গেল, সিনেমার নাম ‘রেহনা হ্যায় তেরে দিল মে’ যে সিনেমাটা কাল্ট ক্ল্যাসিকে রূপ নিয়েছে এখন। দিয়া মির্জার বিপরীতে তার চকলেট বয় ইমেজটা লুফে নিলো দর্শক, তাদের জুটি করলো বাজিমাত। এরপরে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। 

'রেহনা হ্যায় তেরে দিল মে' এর চকলেট বয় মাধবন

বোম্বে আর দক্ষিণ ভারত- দুই ইন্ডাস্ট্রিতেই একাধারে কাজ করেছেন, নিয়মিত বিরতিতে উপহার দিয়েছেন ভালো কাজ, হারিয়ে যাননি, মানের সঙ্গেও আপোষ করতে দেখা যায়নি। ভালো ভালো পরিচালকেরা বরাবরই তার ওপর আস্থা রেখেছেন, প্রধান চরিত্রে না হলেও, পার্শ্বচরিত্রে তিনি ছিলেন নিয়মিত। রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা তাকে নিয়েছিলেন রং দে বাসন্তী-তে, সেই সিনেমায় তার মুখের ‘কোয়ি দেশ পারফেক্ট নেহি হোতা…’ ডায়লগটা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে টিকে আছে এখনও। রাজকুমার হিরানী তাকে নিলেন থ্রি ইডিয়টসে, পুরো সিনেমার গল্প এগিয়েছে ফারহান’রূপী মাধবনের মুখেই। আনন্দ এল রাইয়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে করেছেন ‘তানু ওয়েডস মানু’ সিরিজটা, মণি রত্নমের কথা তো শুরুতে বলা হলোই। 

নায়ক হিসেবে নিজেকে বেঁধে রাখেননি কোন নির্দিষ্ট গণ্ডিতে, তবে রোমান্টিক সিনেমাতেই কাজ করেছেন বেশি। চরিত্রাভিনেতা হওয়ার দিকে ঝুঁকেছেন, আর সেকারণেই তাকে বারবার দেখা গেছে নানাধর্মী চরিত্রে। তিন পাত্তি সিনেমায় স্ক্রিন শেয়ার করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন এবং বেন কিংসলের মতো অভিনেতার সঙ্গে, ‘সালা খাড়ুস’ সিনেমায় হাজির হয়েছেন বক্সিং ইন্সট্রাক্টর হিসেবে, ফিজিক্যাল স্ট্রাকচার পাল্টে নতুন লুকে হাজির হয়েছেন, চকলেট বয় ইমেজটাকে ছুঁড়ে ফেলেছেন ভারত মহাসাগরে।

প্রতিবারই তার অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে, বেশ কয়েকবার ভূষিত হয়েছেন ফিল্মফেয়ার সহ আরও অনেক পুরস্কারে। সিনেমার গণ্ডি ছাড়িয়ে নাম লিখিয়েছেন ওয়েব সিরিজেও। জীবজন্তুর অধিকার নিয়ে তিনি ভীষণ সচেতন, নিজে ভেজিটেরিয়ান। মোটাদাগে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে দুই দশকের বেশি সময় পার করে ফেলেছেন, বিতর্ক তাকে ছুঁতে পারেনি এখনও। দক্ষিণী কিংবা মুম্বাই- দুই ইন্ডাস্ট্রিতেই অন্যান্য তারকাদের সঙ্গে তার দারুণ বন্ধুত্বপূর্ন অবস্থান। 

আমরা যারা শৈশব-কৈশোরটা বলিউডি ফিল্ম দেখে কাটিয়েছি, তাদের কাছে মাধবনের আবেদনটা অন্যরকম। ম্যাডির সঙ্গে সঙ্গে আমরা বেড়ে উঠেছি, তার কাজ দেখেছি। তিনি বিশাল বড় কোন সুপারস্টার হতে পারেননি, কিন্ত নিজের কাজ দিয়েই ভালোবাসা অর্জন করে নিয়েছেন, তিনি অভিনেতা হয়েছেন। থ্রি ইডিয়টস কিংবা রং দে বাসন্তীর কথা বাদই দিলাম, এক ‘রেহনা হ্যায় তেরে দিল মে’ সিনেমাটা দিয়েই আমাদের মনে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন ম্যাডি, সেই আসন কভু টলে যাওয়ার নয়। মাধবন আমাদের কাছে ওল্ড ওয়াইনের মতোই, যতোই পুরনো হবেন, আবেদনটা আরও বাড়বে...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা