সহশিল্পী বা স্টারকাস্ট কে, সেটা জানার আগে আলিয়া গল্পটা শোনেন, পরিচালকের নামটা তার কাছে নায়কের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই মেয়ে বলিউডে রাজত্ব করবে না তো কে করবে?

একদমই গ্ল্যামারাস একটা ক্যারেক্টার, ব্রোকেন ফ্যামিলিতে বেড়ে ওঠা একটা মেয়ে, প্রেমিকের কাছে অ্যাটেনশন পায় না ঠিকমতো, হুট করেই প্রেমিকের বন্ধুর প্রেমে পড়ে গেল সে, একদমই অপ্রত্যাশিতভাবে। বছর নয়েক আগে স্টুডেন্ট অফ দ্য ইয়ার সিনেমায় শানায়া সিংহানিয়া হয়ে আলিয়া ভাট যখন প্রথমবার আমার দৃষ্টিগোচর হলেন, বাড়তি মনোযোগ দেয়ার মতো কিছু খুঁজে পাইনি তার মধ্যে। সৌন্দর্য্য- সেটা বি-টাউনে অনেকেরই আছে। অভিনয়ে এমন কোন আহামরি প্রতিভার ঝলক ছিল না, দুয়েকটা দৃশ্য বাদে কোথাও নজরও কাড়তে পারেননি সেভাবে। বিখ্যাত বাপের আহ্লাদী বেটি- আলিয়া ভাটের ব্যাপারে এটা ছাড়া আর কোন চিন্তা মাথায় আসেনি তখন। বরং কফি উইথ করণে গিয়ে তিনি কেন ভারতের প্রেসিডেন্টের নাম ভুল করেছেন- সেটাই তাকে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছিল। 

তারপর বছর দুয়েকের বিরতি নিলেন আলিয়া, ফিরলেন হাইওয়ে নিয়ে। ইমতিয়াজ আলীর সিনেমা, আমার সবচেয়ে পছন্দের পরিচালক। ইমতিয়াজ আলী বরাবর ভালোবাসার গল্প বলেন, কিন্ত বড় ক্যানভাসে, জীবনকে একীভূত করে, ভিন্ন একটা স্টাইলে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম বীরা ত্রিপাঠিকে! ছোটবেলায় অ্যাবিউজের শিকার হওয়া একটা মেয়ে, নিজের অপহরণকারীর কাছে যে আশ্রয় খুঁজতে চায়, অন্যরকম একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে মধ্যবয়েসি লোকটার সঙ্গে। সেটা কী ভালোবাসা? আমি জানিনা। তবে সেখানে বিশ্বাস আছে, ভরসা আছে, আছে নিশ্চিত নির্ভরতা। রণদীপ হুদার মতো মেথড অ্যাক্টরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করলেন আলিয়া, কোথাও কোথাও হয়তোবা ছাপিয়েও গেলেন! আমি দেখতে বসেছিলাম ইমতিয়াজ আলীর সিনেমা, অথচ দেখলাম শুধু আলিয়াকে! ফিল্মফেয়ারে সেবছর সমালোচকদের রায়ে আলিয়ার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতাটা মোটেও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল না। 

হাইওয়ে সিনেমায় আলিয়া ভাট

এরপর টু-স্টেটস, অন্যরকম একটা ভালোবাসার গল্প। দক্ষিণী তরুণীর চরিত্রে আলিয়া এখানেও প্রাণবন্ত৷ পাশাপাশি বরুণের সঙ্গে তো দুলহানিয়া সিরিজই চলছে, প্রথাগত রোমান্টিক ঘরানার সিনেমা। এরমধ্যে আবার কাপুর এন্ড সন্স করলেন, ব্যতিক্রমী হিসেবেই 'শানদার' করেছেন, যদিও সেটা দর্শক-সমালোচক কাউকেই খুব একটা খুশি করতে পারেনি। তিনি দেখতে ভীষণ আকর্ষণীয়, ভালো অভিনয় করেন, ভালো নাচতে পারেন, মোটামুটি গাইতেও পারেন। মানে টোটাল একটা প্যাকেজ। চাইলেই গ্ল্যামারকে আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকতে পারতেন আলিয়া, অথচ মাত্র ২২-২৩ বছর বয়স থেকেই যেভাবে তিনি ক্যারিয়ারের গতিপথটা নিয়ন্ত্রণ কদেছেন, এখনও যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন, সেটা একদম অবাক করার মতো।

২০১৬-তে এলো ডিয়ার জিন্দেগি। আমি পাঁড় শাহরুখ ভক্ত, শাহরুখের জন্য এই সিনেমা দেখতে বসা। অথচ মন জয় করে নিলেন কায়রা! মানসিক অবসাদে ভোগা জটিল মনস্তত্বের এক নারী চরিত্র, কি অদ্ভুতভাবেই না সেটাকে পর্দায় আঁকলেম আলিয়া! গৌরী সিন্ধে নিজেও আলিয়ার কাছে এতটা এক্সপেক্ট করেছিলেন কিনা, কে জানে! আলিয়ার তুমুল তাণ্ডবে যেন ঢাকা পড়ে গেলেন এক্সট্যান্ডেড ক্যামিও রোলে হাজির হওয়া শাহরুখও। বিষণ্ণতাকে এত চমৎকারভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা যায়, সেটা ডিয়ার জিন্দেগির আলিয়াকে না দেখলে বিশ্বাস হতো না বোধহয়। 

একই বছর উড়তা পাঞ্জাব এলো, পরিচালকের নাম অভিষেক চৌবে। বাউড়িয়া নামের যে চরিত্রে আলিয়া অভিনয় করেছেন, অনেক হাইপ্রোফাইল অভিনেত্রীই এই চরিত্রকে 'না' বলে দিতে দু'বার ভাবতেন না। আলিয়া সেটায় অভিনয় করেছেন, পুরস্কারও পেলেন হাতেনাতে। প্রথমবারের মতো সেরা অভিনেত্রী হিসেবে জিতলেন ফিল্মফেয়ারের ব্ল্যাক লেডি। 

সিনেমার নাম হাইওয়ে

তারপর 'রাজি' করলেন আলিয়া। এই সিনেমা, বা সেহেমত খান চরিত্রটাকে নিয়ে যত কথাই বলা হোক, যত লাইনই লেখা হোক, সেটা কম হয়ে যাবে। আলিয়ার ক্যারিয়ারের এখনও পর্যন্ত সেরা চরিত্র, সেরা অভিনয়ও। ভারতীয় গুপ্তচরের ভূমিকায় আলিয়া গোটা সিনেমাজুড়েই ছিলেন অনবদ্য, রাজি যে দেখেছে, সে এই বাক্যের সঙ্গে দ্বিমত করবে বলে মনে হয় না। গাল্লি বয়ের সাফিনা হয়ে তিনি ফিল্মফেয়ার জিতেছেন, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গা আছে সত্যি। কিন্ত নিজের অভিনয়গুণে সাদামাটা একটা চরিত্রকে মনে দাগ কেটে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন আলিয়া- এই সত্যিটাকে অস্বীকারের উপায় কি আছে? 

কোন সিনেমাটা করবো, আর কোনটা করবো না- এই বোধটা ঠিকঠাকমতো ব্যবহার করতে না পারলে বিশাল সুপারস্টারেরাও গাড্ডায় পড়েন৷ উদাহর হিসেবে গত তিন-চার বছরে শাহরুখ খানের উদাহরণই আনা যায়। আলিয়া ভাট এই জায়গাটায় একেবারেই অনন্য৷ যে কাজগুলো তিনি করেছেন, বা করছেন, সেগুলোর চিত্রনাট্য তাকে কনভিন্স করতে পারলেই প্রজেক্টে যুক্ত হয়েছেন তিনি, নইলে না৷ গ্ল্যামারের চেয়ে সিনেমার গল্পটা তাকে অনেক বেশি টানে। 

গত কয়েক বছরে আলিয়া এমন কিছু সিনেমার কাজ ছেড়েছেন, যেগুলোর নাম শুনলেও তার প্রতি সম্মানটা বেড়ে যায়৷  এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে থাগস অফ হিন্দুস্তান৷ যশরাজ ফিল্মজের ব্যানারে নির্মিত এই সিনেমার অফার নিয়ে তার কাছে গিয়েছিলেন পরিচালক বিজয় কৃষ্ণ আচার্য্য। ফাতিমা সানা শেখের চরিত্রটা শুরুতে আলিয়াকেই অফার করা হয়েছিল। বিগ বাজেটের সিনেমা, তার ওপরে আমির খান এবং অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ, এসবকিছুই আলিয়াকে আকর্ষণ করেনি। থাগসের প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এই বলে- এই সিনেমায় কোন গল্পই নেই। আলিয়া যেটাকে রিজেক্ট করেছিলেন শুটিং শুরুর আগে, সেই সিনেমাটাকে মুক্তির পরে দর্শকও রিজেক্ট করেছে, বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছে থাগস অফ হিন্দুস্তান। 

রাজি সিনেমায় অভিনয়ের জন্য জিতেছেন ফিল্মফেয়ার

এর আগে রাবতা, গোলমাল রিটার্নস, সাহো, নীর্জার মতো সিনেমাগুলো ছেড়ে দিয়েছেন আলিয়া। বিগ বাজেটের দক্ষিণী সিনেমা সাহো মুক্তির পর সমালোচনা কুড়িয়েছে, তার ওপর নারী চরিত্রে ছিল না কোন গভীরতা; সেটাকে 'না' বলতে তাই আলিয়া দু'বার ভাবেননি৷ রাবতা তো বক্স অফিসে সুপারফ্লপ, সমালোচকেরাও প্রশংসা করেননি সেটার। গোলমাল রিটার্নস ভালো ব্যবসা করলেও, রোহিত শেঠির সিনেমা মানেই তো ক্রিটিক্সের গায়ে জ্বালাপোড়া৷ আর পরিণীতি চোপড়ার যে চরিত্রটা আলিয়াকে অফার করা হয়েছিল, সেটা আদতে শো-পিস ছাড়া আর কিছু তো নয়৷ 

হ্যাঁ, নীর্জা সিনেমাটার ব্যাপারেই আলিয়া একটু আফসোস করতে পারেন, তবে মনে হয় না সেটারও দরকার আছে৷ পঁচিশ বছর বয়সে যার ক্যারিয়ারে উড়তা পাঞ্জাব, রাজী কিংবা গাল্লি বয়ে'র মতো সিনেমা থাকে, তার তো একটা নীর্জা'র জন্যে আফসোস করার কথা নয়! 

স্ক্রিপ্ট চয়েজ ব্যাপারটা যে কত গুরুত্বপূর্ণ, ক্যারিয়ারের সাফল্য ব্যর্থতায় সেটা যে কি বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে, এটা আলিয়া ভাট তার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বুঝে গিয়েছেন। সেভাবেই তিনি নিজের ক্যারিয়ারের চিত্রনাট্য সাজিয়ে চলেছেন। আলিয়ার ক্যারিয়ারের কলঙ্ক বলতে পারেন 'কলঙ্ক' এবং 'সড়ক-২' সিনেমা দুটোকে, একটা করণ জোহরের এবং অন্যটা নিজের বাবার সিনেমা না হলে এই দুটোকেও হয়তো রিজেক্ট করতেন তিনি। কিন্ত তাতে কী, চাঁদেরও তো কলঙ্ক থাকে, আর আলিয়া তো মানুষ! 

নেপোটিজম নিয়ে সমালোচনা বলিউডে সবসময়ই চলে। সুশান্তের আত্মহত্যার পর তো খুব চর্চা হলো নেপোটিজম নিয়ে। নেপোটিজম যদি ঘুঁটঘুটে অন্ধকার হয়, আলিয়া ভাট নিঃসন্দেহে সেখানে আলোর রোশনাই। তারকার সন্তান হলেই যে সফলতা বা প্রশংসা মিলবে, এমন তো কোন কথা নেই। টিকে থাকতে হয় নিজের গুণে, নিজ যোগ্যতা দিয়ে। আর সেই জায়গাটায় আলিয়া ভাট নিজেকে টিকিয়ে রাখছেন, নিজেকে অন্যরকম একটা উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে। 

আলিয়া যখন গাঙ্গুবাই কাটিয়াবাদী

অভিনেত্রী আলিয়ার পাশাপাশি মানুষ আলিয়াকেও দেখুন, তার মেন্টাল ম্যাচুরিটি দেখুন। কঙ্গনা রনৌত গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে এলে আলিয়াকে দেখেছেন কখনও প্রত্যুত্তর করতে? না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, না মিডিয়ার সামনে। কটুকথার জবাব দেয়ার পরিবর্তে আলিয়া বরং নিজের কাজে মন দেয়াটাকেই গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন। মেধা আর পরিশ্রমের পাশাপাশি পরিণতিবোধের জায়গাতেও নিজেকে অনন্য করে তুলেছেন আলিয়া, শীর্ষে থাকার মূলমন্ত্র তো এগুলোই। 

আলিয়ার আপকামিং প্রোজেক্টগুলো যে কোন নায়িকার জন্যেই স্বপ্নের মতো। সঞ্জয় লীলা বানসালীর গাঙ্গুবাই কাটিয়াবাদীতে তিনি কোঠির সরদারনী গঙ্গা'র চরিত্রে অভিনয় করছেন, রাজামৌলির সিনেমায় আসছেন সীতা হয়ে। অয়ন মুখার্জীর ড্রিম প্রোজেক্ট ব্রহ্মাস্ত্রেও লিড রোলে আছেন তিনি। সহশিল্পী বা স্টারকাস্ট কে, সেটা জানার আগে আলিয়া গল্পটা শোনেন, পরিচালকের নামটা তার কাছে নায়কের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 

আলিয়া আজ আটাশে পা দিলেন, শিশুশিল্পী হিসেবে 'সংঘর্ষ'কে বাদ দিলে ফিল্ম ক্যারিয়ার মাত্র নয় বছরের। অথচ এরইমধ্যে আলিয়া কাজ করেছেন ইমতিয়াজ আলী, অভিষেক চৌবে, অভিষেক বর্মন, শশাঙ্ক খাইতান, বিকাশ বল, শকুন বাত্রা, গৌরী সিন্ধে, মেঘনা গুলজার, জোয়া আখতার, সঞ্জয় লীলা বানশালী, অয়ন মুখার্জী বা এসএস রাজামৌলির মতো ডাকাবুকো সব ডিরেক্টরের সঙ্গে। এমন ফিল্মি গ্রাফ বলিউডে এই মুহূর্তে আর কোন অভিনেত্রীর নেই, হওয়া সম্ভবও নয়। এই মেয়ে বলিউডে রাজত্ব করবে না তো কে করবে? 

কফি উইথ করণের একই এপিসোডে বরুণ ধাওয়ান ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নাম ভুল করেছিলেন। অথচ ট্রল হয়েছে শুধু আলিয়ার ভুল নিয়ে। কয়েক বছর আগেও যে তরুণী ট্রল আর্মির প্রিয়পাত্র ছিলেন, গুগলে আলিয়া ভাট লিখে সার্চ দিলে তার নামের উইকিপিডিয়া পেজটার ঠিক পরপরই আসতো আলিয়াকে নিয়ে হাস্যকর সব ছবি- সেই আলিয়ার এমন দিনবদলের গল্পটা তো ফেইরি টেলের মতোই শোনায়! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা