সব মিলিয়ে আলিবাবা ও চালিচারে অনিমেষ আইচ পাশ মার্কই পাবেন। প্রথম সিনে উত্তর কুমারের নায়ককে ট্রিবিউট, বৃষ্টির মাঝে চালিচার ফ্যাক্টরি থেকে বের হওয়া আলির হাসি বা আরো টুকরো টুকরো শট- পরিচালক তার দায়িত্বটুকু সামলেছেন ঠিকঠাক...

মিথ থেকে আধুনিক এডাপ্টেশন করা যেকোনোকিছু আমি খুব বেশি পছন্দ করি। কারণ, এভাবেই গল্পগুলো বেঁচে থাকে। বেঁচে থাকে গল্পের প্রাসঙ্গিকতা। আরব্য রজনীর আলিবাবা ও চল্লিশ চোরকে নেহাত এক কাল্পনিক গল্প ভাবতে চাইলে ভাবাই যায় কিন্তু গল্পকার শিবব্রত বর্মন সে কাল্পনিক গল্পকেই বাস্তবে নিয়ে এসেছেন। যেখানে আলিবাবা হয়ে যায় ঢাকার নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা, ছাপোষা জীবন যাপন করা মোহাম্মদ আলি। যে কীনা চাকরি খুইয়ে প্রতিদিন সকালে ‘অফিসে যাচ্ছি’ বলে বের হয়ে যান আর রাস্তায় রাস্তায় ঘোরেন। আর চল্লিশ চোর ও চোরদের গুহা হয়ে যায় চালিচার ফার্মাসিউটিক্যালস। জামিলা, কাশেম, মর্জিনা সবাই ই আছে আরব্য রজনীর কিন্তু সবার ভূমিকাই নতুন। 

গল্পে প্রথমেই দেখা পাই আমরা মোহাম্মদ আলির পরিবারের। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের ধারাবিবরণী দিয়ে যান পরিচালক। এর মাঝে সহজ-সরল মোহাম্মদ আলি প্রতিদিন অফিসের নাম করে বের হয়ে যান ঢাকার রাস্তায়। তিনি রাস্তায় খুঁজে পাওয়া এক ঝালমুড়ি বিক্রেতা আয়নালের সাথে বন্ধুত্ব পাতান। আয়নাল চালাক-চতুর, মোহাম্মদ আলি বোকাসোকা; তবুও তিনি আয়নালের সাথে কথা বলে আরাম পান। বাসায় গেলে বউয়ের অভাবের ফিরিস্তি শোনা লাগে, আর চাকরি ছাড়ার কথা শুনে তো সবার মাথার ওপরই যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। এই অভাব, অভাবের তাড়না, অনিশ্চিত জীবন আলিকেও যেন তাড়া করে বেড়ায়। একদিন হুট করেই আলি দেখেন চালিচার ফার্মাসিউটিক্যালস নামের একটা গোডাউনের সামনে দামী কালোগাড়ি এসে থেমেছে। সেখান থেকে বের হয়ে আসে কালো স্যুট, সানগ্লাস পরা কিছু লোক। ব্রিফকেস হাতে তাদের, অটোম্যাটিক ডোর পাস দিয়ে গোডাউনের দরজা খুলে তারা ভেতরে চলে যায়। মোহাম্মদ আলির মনে কৌতূহল জন্মে। তিনি প্রতিদিন এসে দাঁড়িয়ে থাকেন সেখানে। একদিন হুট করেই দরজার সামনে দেখেন অটোম্যাটিক ডোর পাসটি পড়ে আছে। তিনি সাহস করে ঢুকে যান ভেতরে। এরপর ঘটনা পরিক্রমায় মোহাম্মদ আলির জীবন পরিবর্তন হয় আকস্মিকভাবে, সাথে অজানা অনেক বিপদও যেন এসে ভর করে।

আলিবাবা ও চালিচার আরব্য রজনীর আলিবাবা ও চল্লিশ চোরের গল্পটিরই মর্ডার্ন এডাপ্টেশন। কিন্তু তাই বলে একই গল্প বলে যান নি গল্পকার, পরিচালকও একই গল্প দেখিয়ে যান নি। যার যার মতো উভয়েই নিজস্বতার ছাপ রেখেছেন গল্পে। গল্প এডাপ্ট করলেই কেবল হয় না, প্রাসঙ্গিকতা থাকতে হয়। শিবব্রত বর্মনের গল্পে সে প্রাসঙ্গিকতা ছিল। একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের স্ট্রাগল, অভাবের তাড়না, লোভের স্বরূপ, নিম্নবিত্ত দিনমজুরের একসময় গিয়ে বিদ্রোহ করে ওঠা অনেককিছুই উঠে এসেছে আলিবাবা ও চালিচারের গল্পে। কখনো উঠে এসেছে শেয়ার বাজারের অনিশ্চয়তা, কখনো উঠে এসেছে সরকারি কাজে দুর্নীতির প্রভাব, প্রতিবেশীদের মাঝে ‘দেখিয়ে দেয়া’র স্বভাব, মাফিয়া কালচারসহ আরও অনেক বিষয়। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে সাজানো এই গল্প যেন দৈনন্দিন জীবনের গল্পই বলে যায়। অভিনয়ে সবাই কম-বেশি সাবলীল ছিলেন। নূর ইমরান মিঠু ও ভাবনা ভালো করেছেন কিন্তু তাদের কাছে আরও বেশি আশা ছিল। ভাবনার বরিশালের আঞ্চলিক একসেন্ট বারবার যাচ্ছিল ও আসছিল। ঠিক একই জায়গায় ইশতিয়াক আহমেদ রুমেল টানা একসেন্ট ধরে রেখে ভালো কাজ দেখিয়েছেন। চালিচার ফার্মার গুণ্ডাদের সকলের অভিনয়ই খুব ওভার দ্য টপ লেগেছে। খুবই ক্যারিক্যাচারিশ, হয়তো পরিচালক এভাবেই দেখাতে চেয়েছিলেন। তাও আরও ভালো এক্টরদের নেয়া যেত এই জায়গাটায়। সবার কথা বললাম, আয়নালের কথা না বললে কীভাবে হয়? আয়নাল চরিত্রে সোহেল মণ্ডল আবারও দেখিয়েছেন যে পার্শ্ব চরিত্রে ভালো অভিনেতা থাকলে মূল চরিত্রও কীভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আয়নাল না থাকলে আলির অস্তিত্ব থাকতো না। সোহেল মণ্ডলের স্ক্রিন টাইম বেশ কম, কিন্তু সে কম সময়েই তার চরিত্র হয়ে উঠেছে গল্পের মূল হোতা। অভিনয়েও তিনি ছিলেন সপ্রতিভ।  

'নায়ক'কে দারুণ ট্রিবিউট দিয়েছেন এই নাটকের পরিচালক! 

সব মিলিয়ে আলিবাবা ও চালিচারে অনিমেষ আইচকে পাশ মার্কই দেবো। প্রথম সিনে উত্তর কুমারের নায়ককে ট্রিবিউট দিয়ে হোক, ফুলতোলা মশারির আড়ালে ধীরে চলা ফ্যানের শট দিয়ে হোক, বৃষ্টির মাঝে চালিচার ফ্যাক্টরি থেকে বের হওয়া আলির হাসি দিয়ে হোক কিংবা শেষ দৃশ্যে আয়নালের ক্রূর চোখ দেখিয়ে-পরিচালক তার কাজটি বেশ ভালমতোই করেছেন। আর বই থেকে নেয়া গল্পের এমন দৃশ্যায়ন নিয়মিত হলে দর্শক ভালো ভালো গল্পের সন্ধান পাবে আরও অনেক বেশি। এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক, এটাই কামনা।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা