একটা সময় বাংলা ছবিতে পাঁচটা গান থাকলে চারটাই এন্ড্রু কিশোর গাইতেন। একা, সম্পূর্ণ একা, এক হাতে এই ভদ্রলোক এই দীনহীন, গরীব বাংলা ফিল্ম মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিটাকে সার্ভ করে গেছেন বিশাল সময় ধরে...

কলকাতার বাংলা ছবির মিউজিক যে লেভেলে চলে গেছে, তার সামনে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের দুঃখী বাংলাদেশি বাংলা ছবির মিউজিক। 

বাংলাদেশের বাংলা ছবিতে ভালো গান হয়না। সত্যি কথা মেনে নেন, আসলেই হয়না। এমনকি বাংলাদেশ যে সময় "ওরে নীল দরিয়া" গানের মতো কালজয়ী সৃষ্টিকে জন্ম দিচ্ছিলো, তখনও কলকাতা বাংলাদেশের চেয়ে অনেকগুণ ভালো কোয়ালিটির মিউজিক তৈরি করছিলো - এই ব্যাপারে তর্কের কোনো অবকাশই নাই। 

বাঘা বাঘা সুরকার ছিলো আমাদের, অত্যন্ত ভালো মানের গীতিকারও ছিলেন। রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, শাহনাজ রহমতুল্লাহ, সৈয়দ আব্দুল হাদী, সুবীর নন্দী, খুরশীদ আলম, আব্দুল জব্বার, বশির আহমেদ, মাহমুদুন্নবীর মতো দুর্দান্ত গায়ক-গায়িকারা ছিলেন। 

তারপরেও, এখানে-সেখানে টুকটাক বিচ্ছিন্ন কিছু ভালো গান বাদ দিয়ে, ওভার অল বাংলাদেশি ফিল্ম মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি কখনোই ধারাবাহিকভাবে ভালো করতে পারে নাই। কেন পারে নাই, এটা নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে। তারপরেও, যে সময়টা ভালো গান হতো, সেই সময়টাকে যদি আমরা "আমাদের" স্বর্ণালী সময় হিসাবে চিহ্নিত করি, তাহলে তার একমেবাদ্বিতীয়ম যোদ্ধা ছিলেন আমাদের এন্ড্রু কিশোর। 

এন্ড্রু কিশোর, অসুস্থ অবস্থায়

একটা সময় বাংলা ছবিতে পাঁচটা গান থাকলে চারটাই এন্ড্রু কিশোর গাইতেন। একা, সম্পূর্ণ একা, এক হাতে এই ভদ্রলোক এই দীনহীন, গরীব বাংলা ফিল্ম মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিটাকে সার্ভ করে গেছেন বিশাল সময় ধরে। একটা পার্টিকুলার ফিল্ডে অসামান্য দক্ষতা না থাকলে আসলে এতো দীর্ঘ সময় ধরে পারফর্ম করা যায়না। 

খারাপ লাগে কুমার বিশ্বজিতের কথা ভেবে। খালিদ হাসান মিলু, কুমার বিশ্বজিৎ আর এন্ড্রু কিশোরের যে ত্রিরত্নের গান, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদির একদম শেষে বাজতো, সেই গান গাওয়ার জন্য এখন একমাত্র আপনিই রয়ে গেলেন। চোখের সামনে মিলু, বাচ্চু, এন্ড্রু কিশোর - সবাই চলে গেলেন, নিঃসঙ্গ এক ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে কুমার বিশ্বজিৎ রয়ে গেলেন।

উইন্ড অফ চেইঞ্জ - বিশেষ ভালো লাগার বস্তু কখনোই ছিলোনা, এখনও নাই। মেধাহীনতার অপূর্ব উদাহরণ, কোক স্টুডিওর শোচনীয় বাংলা ভার্শন এই আয়োজন নানাভাবেই ব্যর্থ। শুধু যদি একটামাত্র গান এখানে ভালো হয়ে থাকে, তাহলে সেটা সৈয়দ শামসুল হকের লেখা, এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া এই বিখ্যাত গান, "হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস।

তিনটা জিনিস খেয়াল করবেন এই গানে। এক, বাংলাদেশের রত্ন, বংশীবাদক পাগলা জালাল, কী অসামান্য দক্ষতায় গানের শেষে "মানুষরে এ এ " বলে একটা বুক ফাটা আর্তনাদের ব্যাক ভোকাল দেয়। দুই, সামান্য মিউজিকের ব্যবহার দিয়ে কীভাবে অসামান্য গান তৈরি হতে পারে। তিন, শিল্পী এন্ড্রু কিশোর "মাইক্রোফোন" কী অসাধারণ দক্ষতার সাথে ব্যবহার করেন, কীভাবে সামনে-পিছে-সাইডে সরে গিয়ে একেকভাবে শব্দের ব্যঞ্জনা তৈরি করেন। লিজেন্ড এমনি এমনি তৈরি হয়নারে নোবেল ম্যান, কাজটা করতে জানতে হয়। 

মানুষটা না ফেরার দেশে চলে গেছেন গত বছর। বিদায়, হতদরিদ্র বাংলা ছবির গানের জনমদুঃখী মহারাজ, অজাতশত্রু মহাত্মা এন্ড্রু কিশোর। বিদায় ঘন্টা বেশ অনেকদিন থেকেই বাজছিলো, তারপরেও খারাপ লাগাটা মেনে নেয়া ছাড়া আসলেই কিছু করার নাই। 

একটা মাত্র জীবন, চলে গেলেই সব শেষ, আহারে, আহারে জীবন, আহারে...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা