'রাটাটুলি', 'ইনসাইড আউট', 'কোকো' কিংবা 'সোল'... এই নির্মাণগুলোতে জীবনবোধের বয়ান এতটাই গভীর, সূক্ষ্ম অনুভূতির সুলুকসন্ধানে এই নির্মাণগুলো এতটাই অনবদ্য, খুব গভীরভাবেই মনে দাগ কাটে তারা। পাশাপাশি, স্থায়ী আবাস গাড়ে অভ্যন্তরেও। অনেকটা ঠিক সেরকমই, এবারের অস্কারে নমিনেশন পেলো যে অ্যানিমেশন সিনেমাগুলো, সেগুলোর মধ্যেও প্রাধান্য রইলো 'থট প্রভোকিং' নির্মাণগুলোরই!

'অ্যানিমেশন ফিল্ম' বললেই অনেকের চোখে যে দৃশ্যপট ভেসে ওঠে, তা অনেকটাই একপেশে। বাচ্চাদের জন্যে, রঙচঙে গল্পের বর্ণময় এক নির্মাণকেই তারা 'অ্যানিমেশন ফিল্ম' এর সংজ্ঞার মধ্যে আঁটোসাটোভাবে বসিয়ে দিতে চান। অথচ যদি আমরা 'অ্যানিমেশন মুভি'র ইতিহাসের দিকে তাকাই, খুব বেশি পেছনে না তাকালেও এমন সব সিনেমার কথা বলা যাবে, যারা পাল্লা দিয়ে সমসাময়িক মেইনস্ট্রিম নির্মাণের চেয়েও গভীর কিছু ভাবনার মুখোমুখি করেছে। 'রাটাটুলি', 'ইনসাইড আউট', 'কোকো' কিংবা 'সোল' এগুলো খুব বেশি আগেরও নির্মাণ না, অথচ জীবনবোধের বয়ান, সূক্ষ্ম অনুভূতির সুলুকসন্ধানে এরা এতটাই অনবদ্য, খুব গভীরভাবেই মনে দাগ কেটেছে তারা, পাশাপাশি, স্থায়ী আবাস গেড়েছে অভ্যন্তরে। অনেকটা ঠিক সেরকমই, এবারের অস্কারে নমিনেশন পেলো যে অ্যানিমেশন ফিল্মগুলো, সেগুলোর মধ্যেও প্রাধান্য রইলো 'থট প্রভোকিং' নির্মাণগুলোরই। যেসব সিনেমা নিয়েই আজকের কথাবার্তা। 

১. এনকান্তো

জমকালো এক 'ম্যাজিক্যাল হাউজ' দিয়ে শুরু হয় এই নির্মাণের আখ্যান। এই জাদুর বাড়ির শুধুমাত্র একজন ছাড়া বাকি সব সদস্যেরই কিছু না কিছু জাদুর ক্ষমতা আছে। এবং বলাই বাহুল্য, যার কোনো জাদু-ক্ষমতা নেই, সে-ই গল্পের প্রোটাগনিস্ট। এবং সেই মানুষটিই কিভাবে ক্রমশ পরিবারের বাকিদের চেয়েও ওঠে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটার গল্পই বলে 'এনকান্তো।' এই ক্ষোভ-বিক্ষোভের পৃথিবীতে প্রীতি-মায়া-মমতা- ভালোবাসারই খানিকটা বোধ দিয়ে যায় প্রচণ্ড কালারফুল এ  মিউজিক্যাল ড্রামা।

এনকান্তো! 

২. লুকা 

ডিজনি-পিক্সারের কম্বিনেশন বরাবরই অনবদ্য। এই কম্বিনেশনের বিগত নির্মাণ 'সোল' দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হয়েছিলাম। সে মুগ্ধতার ব্যত্যয় হয়নি নবতম নির্মাণ 'লুকা'র ক্ষেত্রেও। মানুষের রূপ ধারণ করতে পারে এমন এক সাগর-দানো'র সাথে বন্ধুত্ব হয় মনুষ্যসমাজের একজনের। সেই বন্ধুত্বে রূপকের আড়ালে চলে আসে বহুকিছু। বিশ্বাস, সহমর্মিতা, সহযোগিতা... যেসব সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ, সেসবকেই যেন মনে করায় 'লুকা'র এই দুর্দান্ত আখ্যান।

লুকা! 

৩. ফ্লি

'ফ্লি' নামের এই ডকু-অ্যানিমেশন ফিল্ম দেখে বিস্তর বিস্মিত হয়েছি, চমকেছি।  আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসা এক ব্যক্তির জীবনযুদ্ধের সত্যঘটনা অবলম্বনে যে অ্যানিমেটেড ফিল্ম, তাতে শুধু যে এক রিফিউজির ক্লেদাক্ত উপাখ্যানই দেখানো হয়েছে তা না, শুচিবায়ুগ্রস্ত সমাজে এক সমকামী কিশোরের যাপিত বিড়ম্বনাও এসেছে যুগপৎভাবে। 'ফ্লি' এমন এক রূঢ় গল্পই বলে গিয়েছে আলগোছে, বোধের অপরাধবোধে ক্ষণে ক্ষণে বিব্রত হয়েছি এবং সামাজিক জীব হিসেবে মাথা হেঁট করতে বাধ্য হয়েছি। 

ফ্লি! 

৪. রায়া অ্যান্ড দ্য লাস্ট ড্রাগন

বহুকাল আগের এক কল্প-পৃথিবী, যার নাম 'কুমান্দ্রা', সেখান থেকেই শুরু হয় এই অ্যানিমেটেড ফিল্মের গল্প। 'কুমান্দ্রা' নামের এই কল্প-পৃথিবী যখন বিস্তর সংকটে পড়ে, তখন 'রায়া' নামের কিশোরী বের হয় পৃথিবীর শেষ ড্রাগনটিকে খুঁজে বার করার জন্যে। যে ড্রাগনটিই একমাত্র পারবে পৃথিবীকে বাঁচাতে। এই ড্রাগন খোঁজার যাত্রাপথে নানাবিধ সংকট, বহু চলকের রেষারেষি, দ্বন্দ্ব, সংঘাত, সংঘর্ষ... সবকিছুর জমজমাট পটবয়লারে মিশে থাকে এই নির্মাণ।  এই ফিল্ম ফ্যান্টাসিতে ভরপুর হলেও অর্থবহ উপাদানও এখানে কম নেই মোটে। বিচ্ছিন্নতার এই পৃথিবীতে ঐক্যবদ্ধ থাকার যে শিক্ষা, এই নির্মাণের পরতে পরতে মিশে থাকা সে বার্তায় এ নির্মাণ গূঢ় তাৎপর্যেও বেশ অর্থবহ প্রভাব রাখে। 

রায়া অ্যান্ড দ্য লাস্ট ড্রাগন! 

৫. দ্য মিচেলস ভার্সেস দ্য মেশিনস

প্রযুক্তির এই সময়, যে সময় শাখাপ্রশাখায় আমাদের আটকে রেখেছে যান্ত্রিক নানা প্রকোষ্ঠে, সে সময়ে পারিবারিক বন্ধন কতটা ঠুনকো ও ম্লান, সেটারই এক বার্তা দেয় এ সিনেমা। 'মিচেল ফ্যামিলি' এক রোড ট্রিপে যাওয়ার মধ্যিখানে পড়ে রোবট-যুদ্ধের। রোবটেরা ধরে ধরে নিকেশ করছে মানবসভ্যতা, এরকম এক সংকটে শেষমেশ ত্রাতা হয় মিচেল পরিবার। মানুষ বনাম যন্ত্র... কারা জিতবে অবশেষে, এটাই হয়ে দাঁড়ায় পৃথিবীর সাম্যাবস্থার প্রধাণতম অনুঘটক। যান্ত্রিক এই পৃথিবীতে অযান্ত্রিক স্বাভাবিক জীবনের গল্পই বলে 'দ্য মিচেলস ভার্সেস দ্য মেশিনস।'

দ্য মিচেলস ভার্সেস দ্য মেশিনস

এই পঞ্চ-নির্মাণ ছাড়াও বিগত বছরে আরো বেশ কিছু অ্যানিমেটেড নির্মাণ এমন হয়েছে, যারা শুধুমাত্র কল্পিত রঙচঙে পৃথিবীতেই পড়ে থাকেনি, বরং সমসাময়িক পৃথিবীর নানা প্রসঙ্গ নিয়ে ক্রমশ হয়েছে সরব। এবং এই সরব হওয়া খানিকটা গৌরব করার মতই বিষয়। সিনেমা, সিরিজে যাপিত নানা অসঙ্গতি নিয়ে কথা তো হচ্ছেই। পাশাপাশি, 'অ্যানিমেশন ফিল্ম' এর ঝলমলে ঝালরের অভ্যন্তরেও এসব নিয়ে যদি কথা বলার চর্চা হয়, তাহলে সেটাই যে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক, তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখেনা!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা