মানুষটি মৃণাল সেনের সিনেমায় মেথড অভিনয় করার সময়ে রক্ত-ডায়রিয়া হয়ে হাসপাতালে বেঘোরে পড়েছিলেন মাসের পর মাস। মানুষটি অপর্ণা সেনের ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে ডুবে গিয়েছিলেন সমুদ্রে। সাঁতার না জেনেই তিনি ক্যামেরাকে পেছনে রেখে চলে গিয়েছিলেন সমুদ্রের বিপজ্জনক দূরত্বে, শুধুমাত্র লাস্ট সীনটাকে অসাধারণ করার জন্যে। অভিনয়কে ঠিক এতটাই ভালোবাসতেন তিনি!

মানুষটির ছোটবেলা কেটেছে দার্জিলিং এ। বরফ-দানো পাহাড়ঘেরা সাবেকি সেন্ট পলস' স্কুলে। মেঘ, কুয়াশা, কাঞ্চনজঙ্ঘা,  কেভেন্টারস এর হট চকলেট, সেন্ট পলস এর ছাইরঙা ইউনিফর্ম, দস্যি ছেলেদের মোশাই গ্যাং, কিশোরবেলার প্রেম-প্রণয়-অনুরাগ... জীবনের শুরুর ধাপগুলো এরকম দার্জিলিং-ঘেঁষা হওয়ার কারণে কী না জানা নেই, মানুষটির কাজেকর্মে বরাবরই ফিরে ফিরে এলো দার্জিলিং। যখন গান গাইলেন, যখন সিনেমা বানালেন কিংবা যখন অভিমান করলেন... সবকিছুতেই প্রকট রইলো মেঘভেজা বাতাসের সোজাসাপটা সেই শহর। তিনি তার অজস্র নির্মাণে এতবার 'দার্জিলিং' এনেছেন, অনেকে তাকে বিদ্রুপ করে 'দার্জিলিং দত্ত' বলেও ডাকে। যদিও তার ভালো নাম- অঞ্জন। অঞ্জন দত্ত। 'বেলা বোস' কিংবা 'রঞ্জনা'র অঞ্জন দত্ত। 'চলচ্চিত্র' কিংবা 'সিটি অব জয়' এর অঞ্জন দত্ত। 'ম্যাডলি বাঙ্গালী' কিংবা 'সাহেব বিবি গোলাম' এর অঞ্জন দত্ত। 

তাকে আপাতদৃষ্টে বেশ সফল একজন মানুষই বলা যায়। এই বয়সে এসেও নিয়মিত গাইছেন। সিনেমা-সিরিজ বানাচ্ছেন। অভিনয় করছেন। থামছেন না মোটেও। 'সফল' তাকে বলাই যায়। কিন্তু 'হাসির শেষের নীরবতা'র মতন ব্যর্থতার গল্পও যে তার কম নেই মোটেও, তার সুলুকসন্ধান পেতে হলে তার জীবনীর দিকে সেভাবেই তাকাতে হয়, যেভাবে প্রবল বিস্ময়বোধে দেখতে হয় রোদে ঝলসানো সুবর্ণবর্ণ কাঞ্চনজঙ্ঘা! যে প্রচণ্ড সংগ্রামী জীবন তাঁর, সেই অতলান্ত জীবনের ছিঁটেফোঁটার সন্ধানও যারা পেয়েছেন, তারা যে অঞ্জন দত্তকে গড়পড়তা স্বাভাবিক চোখে আর দেখতে পারেননি  কখনো, সেটাও বোধহয় নির্দ্বিধায়ই বলে দেয়া সম্ভব। 

এখানে একটু চমকে দিই- যে গান দিয়েই তিনি আজকের অঞ্জন দত্ত, বিস্ময়ের ব্যাপার- তিনি এই গানের জগতে আসতেই চাননি কখনো। তিনি হতে চেয়েছিলেন অভিনেতা। ভেবেছিলেন, দুনিয়াকে বদলে দেয়ার মতন অভিনয়-দক্ষতা আছে তার। মানুষটি মৃণাল সেনের সিনেমায় মেথড অভিনয় করার সময়ে রক্ত-ডায়রিয়া হয়ে হাসপাতালে বেঘোরে পড়েছিলেন মাসের পর মাস। মানুষটি অপর্ণা সেনের ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে ডুবে গিয়েছিলেন সমুদ্রে। সাঁতার না জেনেই তিনি ক্যামেরাকে পেছনে রেখে চলে গিয়েছিলেন সমুদ্রের বিপজ্জনক দূরত্বে, শুধুমাত্র লাস্ট সীনটাকে অসাধারণ করার জন্যে। অর্জুনের মতন পবিত্র প্রতিজ্ঞা ছিলো তাঁরও৷ কিন্তু কী পেলেন? প্রথমদিকে ন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। মানুষজন হাততালি দিয়েছে। ঐ যা। অভিনেতা হিসেবে ঠিক 'শক্তিমান অভিনেতা'র খেতাব টা আর পাওয়া হয়নি কখনোই। 

মৃণাল সেনের সিনেমায়! 

একসময়ে হাল ছেড়েছেন। ভেবেছেন- ক্যামেরার সামনে হলোনা, এবার ক্যামেরার পেছনে ঠাঁই নেওয়া যাক। এলেন  পরিচালনায়৷ অভিনয়ের অতৃপ্তি ঘোচাতেই হয়তো। পরিচালক হিসেবেও খুব যে ভাংচুর রকমের কাজকর্ম করলেন তাও না। তবু এ মানুষটি না অভিনয়, না পরিচালনা... একটিও ছাড়লেন না। এখনো 'সাহেব বিবি গোলাম' এর ঠাণ্ডা স্বভাবের শ্যুটার বা 'নির্বাক' এর প্রচণ্ড নার্সিসিস্ট লোকটির চরিত্রে প্রবল আত্মবিশ্বাসে দেখা যায় তাকে। তিনি এখনো বিশ্বাস করেন, তিনি ভালো অভিনেতা। তিনি এখনো বিশ্বাস করেন, তিনি অনেক কিছুই দিতে পারতেন ইন্ডাস্ট্রিকে। কিন্তু কেউ তাকে ব্যবহার করেন নি৷ মার্কেজের মতন তার ঝুলিতেও অজস্র গল্প। যেগুলো তিনি বলতে চান সবাইকে৷ ক্যামেরার কলমে। এখনো বুকভরা অভিমান নিয়ে তিনি বলেন-

অঞ্জন দত্তকে ব্যবহার করতে পারলে না, এটা তোমাদেরই সীমাবদ্ধতা। 

হয়তো কথাটা খানিকটা বাড়াবাড়িই মনে হবে কারো কাছে।  তবুও এটাই অঞ্জন দত্তের বৈশিষ্ট্য।  তিনি অকপটেই বলেন সবকিছু।  কোনো লুকোছাপা নেই। সাদাসিধে কিশোরের মতন ভেতরের সব বলে দেন। বলবেন নাও বা কেন? বড় হয়েছেন দার্জিলিং এ, বড় হয়েছেন কাঞ্চনজঙ্ঘার হাতছোঁয়া দূরত্বে। মেঘ মাখানো পাহাড়ের মতন বিশালতা ও স্বচ্ছতা যে তার চরিত্রে থাকবে, এটাই তো কাম্য।

স্ত্রী ছন্দা'র সাথে তার ভালো সখ্যতা! 

তবে অভিনেতা হিসেবে অঞ্জন যত অসফল, গায়ক হিসেবে ঠিক ততই সফল এই মানুষ। ভক্তদের উন্মাতাল পাগলামি, অমরত্ব পাওয়া একেকটা গান .. অঞ্জন হয়তো গায়ক হিসেবে পেয়েছেন প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। কিন্তু কোথায় যেন তিনি খুশি হন না। তিনি তো হতে চেয়েছিলেন অভিনেতা। সেটাই আর হয়নি এ জীবনে। বিষাদের অস্বস্তির কাঁটা তাই বরাবরই বিঁধে থাকে কন্ঠে। তবে এটাও ঠিক, যে গান তিনি গেয়েছেন, সেসব যাপিত গানের চরিত্রকে তিনি করেছেন মৃত্যুঞ্জয়ী। নিজে স্বীকারও করেছেন, বেলা বোস, রঞ্জনা, মেরী অ্যান… দেখেছেন প্রত্যেককেই। প্রত্যেকটা গান তাই বাস্তব, সত্য, পবিত্র। ঈশ্বর যেন তাকে মূদ্রার ওপাশে আক্ষেপ দিয়ে, এপাশে দিয়ে রেখেছেন বিস্তর প্রাপ্তি। বিধাতার চিত্রনাট্য, বিচিত্র! 

খ্যাপাটে! 

কলকাতার বাঙ্গালী মহল অঞ্জন দত্তকে ঠিক পছন্দ করে না। অঞ্জন দত্তও তাদের পছন্দ করেন৷ না। তিনি ঠিক প্রথাগত 'মাছে-ভাতে'র বাঙ্গালী ননও। সাহেবদের স্কুলে পড়েছেন। বাড়ির পরিবেশেও ছিলো সাহেবী কায়দার প্রবল আধিপত্য। মাছ-ভাতের বদলে বরাবরই শান্তি পান ওয়াইন-হুইস্কিতেই। একটা সময় ঠিকঠাক বাংলাও বলতে পারতেন না। ব্যোমকেশ-ফেলুদা-কাকাবাবু-পরাশর বর্মা পড়ে বাংলাকে ঠিক করেছেন। তিনি এখনো পূজার প্যান্ডেলের বদলে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য পান চার্চের কাঠের বেঞ্চিতে। অঞ্জন দত্ত এরকমই। তিনি ওগুলোকে গুরুত্ব দেনও না, কে তাকে কী ভাবছে বা না ভাবছে। তিনি কাউকে বলেনও না, তিনি ঠিক কী ভুল। তিনি তাঁর মত করেই এগোতে থাকেন ক্রমশ। স্ত্রী ছন্দা আর একমাত্র সন্তান নীল... এদের নিয়েই অঞ্জনের পাগলামো, খ্যাপাটেপনা, আবেগে ভেসে যাওয়া। 

প্রচন্ড খামখেয়ালি এ মানুষটি এখনো ঠোঁটের কোণে সিগারেট, হাতে  গিটার আর এক গ্লাস হুইস্কি নিয়ে গান গাইতে বসে যান নির্দ্বিধায়। ছেলের সাথে কারণে-অকারণে ঝগড়া করে মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে বসে থাকেন। আবার আচমকাই সবকিছু ভুলে গিয়ে একসাথে প্রিয় কোনো সিনেমা দেখতে দেখতে আবেগে ভারাক্রান্ত হয়েও যান। 'অঞ্জন দত্ত' ঠিক এভাবেই কারণে-অকারণে হয়ে থাকেন মেঘের নীচের ম্যালচত্ত্বরে গিটার নিয়ে বসে থাকা সে রঙিন মানুষ, যার গিটারভর্তি সুর, ওভারকোটের আস্তিনে গল্প আর চোখেমুখে ভর করা  অভিনয়। দার্জিলিং-অঞ্জন দত্ত... এদেরকে তাই ক্রমশই গুলিয়ে ফেলতে হয়। আলাদা করা যায়না। মেঘ- কুয়াশার মাকড়সা-জালে দার্জিলিং বরাবরই রহস্য। আর অঞ্জন দত্ত? রহস্যের খাসমহল বানাতে তিনিও কী কম পটু? দিনশেষে এদের আলাদা করা যায়ও বা কিভাবে? আলাদা করলে থাকেও বা কি? 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা