বক্স অফিস ইন্ডিয়ার মতে তার একটা সিনেমাও হিট না, তবে তার জন্মদিনে তারান্তিনোর মতো ডিরেক্টর এসে কেক কাটেন। স্করসিজির মতো ডিরেক্টর গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর দেখে মুগ্ধ হয়ে অনুরাগকে চিঠি লিখেন। রেহানা মরিয়ম নূর দেখে লেটারবক্সে সবার আগে রেটিং যিনি দেন, তার নাম অনুরাগ কাশ্যপ। কোথায় নেই তিনি? কীভাবে অস্বীকার করা যায় তাকে?

ইনবক্সে আমার কাছে ভাল সিনেমার সাজেশন চেয়েছেন আর বিনিময়ে আমি কাউকে সিনেমার সাজেশন দেইনি- এমনটা সম্ভবত এখনও হয়নি আমার জানামতে। প্রচুর মানুষ আমার সাজেশনে বিচিত্র সব সিনেমা দেখেছেন আর আমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন, আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। তবে কেউ যখন জিজ্ঞাসা করে- আমি/আমরা না হয় আপনার কাছ থেকে সাজেশন নিয়ে সিনেমা দেখি; আপনি কার কাছ থেকে সিনেমার সাজেশন পান?

এই প্রশ্নের উত্তরে আমি সবার আগে যে নামটা বলি, সেটা হলো- অনুরাগ কাশ্যপ। 

২০১৬ সাল থেকে আমি অনুরাগ কাশ্যপকে টুইটারে ফলো করি। তিনি কোন সিনেমা দেখে সেটার নাম বললে বা সেটা সম্পর্কে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলে, আমি অন্য সব কাজ বাদ দিয়ে সবার আগে সেই সিনেমার সন্ধান শুরু করি। সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার হচ্ছে, আজ পর্যন্ত অনুরাগের সিনেমার সাজেশন আমাকে হতাশ করেনি। 'Thithi', 'ভিসারানাই', 'দ্য প্ল্যাটফর্ম' কিংবা 'আমিষে'র মত সিনেমার নাম আমি সবার আগে অনুরাগ কাশ্যপের মাধ্যমেই জানতে পেরেছিলাম। 

আসামের মত একটা জায়গায় যে সিনেমা হয়, আমিষের মত কনসেপ্ট ভাবার মত আর সেটা নিয়ে সিনেমা বানিয়ে ফেলার মত মানুষ যে আসামে আছে- সেটা আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার মানুষটার নাম অনুরাগ কাশ্যপ। প্যারাসাইট দেখে আমি যখন প্রচন্ড উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি, তখনই প্রায় সেম কনসেপ্টে নির্মিত কিন্তু আরও বেশি বিভৎস ও শরীর গুলিয়ে ওঠা 'The প্লাতফরম' এর সন্ধান যিনি আমাকে দেন, সেই মানুষটার নাম অনুরাগ কাশ্যপ। 

অনুরাগ কাশ্যপ ডিরেক্টর হিসেবে কেমন বা তার সিনেমাগুলো কেমন- সেই স্তুতিগাথা করা আমার আজকের লেখার উদ্দেশ্য নয়। ফিল্মমেকার হিসেবে আমি তাকে যতটা বেশি পছন্দ করি, তার চেয়েও বেশি পছন্দ করি তার মেরুদন্ডের জন্য, তার আপোষহীনতার জন্য, তার ভোকাল আচরণের জন্য, যেকোনো ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকারের পাশে থাকার জন্য। একটা মানুষ বলতে গেলে প্রায় একাই একটা ইন্ডাস্ট্রির চিত্র পরিবর্তন করে ফেলেছেন লড়াই করে, এই ব্যাপারটা খুব একটা সোজা কথা না। 

অনুরাগ কাশ্যপ

আজকে আপনি যত এক্টর দেখেন, যত ভিন্ন ধরনের পরিচালক দেখেন, যত ভিন্ন ধরনের গল্প বলিউডে দেখেন- তার পেছনে কোন না কোনভাবে অনুরাগ কাশ্যপের নাম আপনি পাবেনই। নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি, মনোজ বাজপায়ী, রাজকুমার রাও, ভিকি কৌশাল, পঙ্গজ ত্রিপাঠি, বিক্রমাদিত্য মোটওয়ানে, ইমতিয়াজ আলি থেকে শুরু করে আরও যত ইন্টারেস্টিং নাম আপনি বের করবেন, সবার সাথেই জড়িয়ে আছে অনুরাগ কাশ্যপ নামটি। 

যেকোনো 'ভাল' কাজ, যেকোনো ভিন্নধর্মী কাজ, যেকোনো ভিন্ন ন্যারেটিভে গল্প বলা, যেকোনো ভিন্ন সিনেমার মুক্তির জন্য লড়াই করা- সব জায়গায় অনুরাগ কাশ্যাপ আছেন। সম্ভবত এই কারণেই আইএমডিবি ঘেঁটে দেখবেন, অনুরাগ কাশ্যপ যতটি সিনেমার ডিরেক্টর, তার চেয়ে বেশি সিনেমার প্রোডিউসার। ডিরেকশন দিয়েছেন ২৯ টি সিনেমার, আর প্রোডিউসার হিসেবে থেকেছেন ৬০ টি সিনেমার সাথে- অর্থাৎ সংখ্যার হিসেবে প্রায় দ্বিগুণ। 

'আমির' নামক সিনেমাতে সেকেন্ড ইউনিটের এডি হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। 'ভবেশ জোশি সুপারহিরো' সিনেমার গানও লিখেছেন, ১৯টি সিনেমার পরিচালক তাদের সিনেমার ক্রেডিটে তাকে বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়েছে- এই রেকর্ড বলিউডের আর কারো আছে বলে আমার অন্তত জানা নেই। 
অনুরাগের আরেকটা ব্যাপার নিয়ে কম আলোচনা হয়, তার অভিনয়। ভিলেন ক্যারেক্টারে তিনি যে কতটা ভয়ংকর সেটা 'আকিরা' আর 'ইমাইক্কা নদিকাল' দেখলেই টের পাবেন। কাজের প্রতি তিনি এতটাই প্যাশনেট, 'মকবুল' সিনেমাতে শুধুমাত্র একটা লাশের ক্যারেক্টারে অভিনয় করতে তিনি রাজি হয়ে যান। 

'উড়তা পাঞ্জাব' সিনেমাটাকে যখন সেন্সরে আটকে দিল আর অনেকগুলো কাটের কথা বলল, তখন সবার আগে আওয়াজ তুলেছিলেন অনুরাগ। তার দেখাদেখি করন জোহরের মত ডিরেক্টরও সর্বোচ্চ প্রতিবাদ করেছিলেন। এই যে নিজের সিনেমা না, এরপরেও সেই সিনেমার মুক্তির জন্য লড়ে যাওয়া নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে- এই ব্যাপারটার প্রশংসা না করে কীভাবে থাকি?

দশ হাজার ডিভিডির বিশাল এক কালেকশান আছে অনুরাগের

স্বভাবে ভীষণ ঘাড়ত্যাড়া এই মানুষটা কী পরিমাণ প্রোজেক্ট বা প্রোডাকশন যে ছেড়ে দিয়েছেন, সেটা আইএমডিবি ঘেঁটে দেখলে আপনার চোখ কপালে উঠবে। জানলে অবাক হবেন, 'কাল হো না হো' সিনেমার লেখক হিসেবে অনুরাগের কথা ভাবা হয়েছিল, কিন্তু অজানা কারণে তিনি সেই কাজ ছেড়ে দেন। সঞ্জয় গুপ্তা যখন 'কাঁটে' সিনেমার জন্য অনুরাগকে লেখক হিসেবে ঠিক করেছিলেন আর এরপরে যে মুহুর্তে অনুরাগ বুঝতে পারলেন এটা আসলে তারান্তিনোর 'রিজার্ভার ডগস'কে মাথায় রেখে বানানো হচ্ছে- সেই মুহুর্তে তিনি এই সিনেমার কাজ ছেড়ে দেন। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, কাঁটে সিনেমাটা খোদ তারান্তিনো পছন্দ করেছিলেন। 

তুচ্ছ ভুল বোঝাবুঝির কারণে দীর্ঘদিন মনোজ বাজপায়ীর সাথে কথা বলেননি। এরপরে যখন কথা বললেন, তখন দুজনে মিলে এমন এক সিনেমা বানালেন, যা সারাজীবন ইতিহাসে থেকে যাবে- গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর। 

ভিকি কৌশল একবার ইন্টারভিউতে বলেছিলেন- অনুরাগ হচ্ছে সবচেয়ে অদ্ভুত ফিল্মমেকার। স্ক্রিপ্ট পড়ে যে সিকুয়েন্স সম্পর্কে আপনার মনে হবে- আরে এটা করতে তো হাইয়েস্ট এক ঘন্টা লাগবে; সেটা অনুরাগ করবেন একদিন বা দুইদিন ধরে- নিজের পছন্দ না হওয়া পর্যন্ত। আর স্ক্রিপ্টের যে সিকুয়েন্স পড়ে আপনার মনে হবে- আরে এটা করতে তো পুরো দিন শেষ হয়ে যাবে, সেটা অনুরাগ শেষ করে ফেলবেন এক ঘন্টায়। 

যার সিনেমায় ভায়োলেন্স থাকবেই বেশিরভাগ সময়, সেই অনুরাগ নাকি রক্ত দেখলে ভয় পান। সিনেমার শুটিং এর সময় নিজের ব্যক্তিগত জীবনের যেকোনো ঘটনার জন্য স্ক্রিপ্টে পরিবর্তন আনা মানুষের নাম অনুরাগ কাশ্যপ। যেমন দেভ ডি সিনেমার এন্ডিং শুরুতে হ্যাপি এন্ডিং ছিল, কিন্তু নিজের পার্সোনাল লাইফের ফ্রাস্টেশনের জন্য সিনেমার মাঝে এসে সিনেমার স্ক্রিপ্ট চেঞ্জ করেন অনুরাগ। এত অদ্ভুত আচরণ, এত বিচিত্রিতার নাম হলো- অনুরাগ কাশ্যাপ। 

অনুরাগ কাশ্যপ

বলিউডের সেরা স্পোর্টস ফিল্মের নাম বললে ইজিলি লগান আর চাক দে ইন্ডিয়ার নাম চলে আসবে। তবে ট্রু ইন্ডিয়ান স্পোর্টস ড্রামা যদি আসলেই কেউ বানিয়ে থাকে সেটা হলেন অনুরাগ কাশ্যপ আর সিনেমার নাম হল মুক্কাবাজ। এই সিনেমায় ব্যবহৃত হওয়া কিছু গালির অর্থ আপনি বুঝতে পারলে, সিনেমা পজ করে অনেকক্ষণ হাসবেন তা আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি। কোন সিনেমাতে নায়ক একজন বোবা নায়িকার প্রেমে পড়েছে, এই ব্যাপার আপনি অনুরাগের সিনেমাতেই পাবেন। আগলি সিনেমার শেষদৃশ্য আপনাকে হতবিহ্বল করে দেবে, রামন রাঘবে নওয়াজউদ্দীনের ভয়ংকররুপ আপনাকে দীর্ঘদিন শান্তিতে ঘুমুতে দেবে না। এই সবকিছুর কারিগর হচ্ছেন অনুরাগ কাশ্যপ।

বক্স অফিস ইন্ডিয়ার মতে তার একটা সিনেমাও হিট না, তবে তার জন্মদিনে তারান্তিনোর মত ডিরেক্টর এসে কেক কাটেন। স্করসিজির মত ডিরেক্টর গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর দেখে মুগ্ধ হয়ে অনুরাগকে চিঠি লিখেন। আমাদের সিনেমা 'রেহানা মারিয়াম নূর' যখন কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যায়, তখন সেটি দেখে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে আমাদের চেনাজানা ডিরেক্টরদের মাঝে সবার আগে যিনি লেটারবক্সে রেটিং দেন আর নিজের ভালোলাগা প্রকাশ করেন- তিনি অনুরাগ কাশ্যপ। কোথায় নাই তিনি? কীভাবে অস্বীকার করা যায় তাকে? আরও ১০ টা বোম্বে ভেলভেট বানিয়ে ধরা খেলেও, যার বাসায় ১০ হাজারের বেশি ডিভিডি কালেকশন আর সেইসব সিনেমার ডিভিডি নিয়ে আলাপ করার সময়  শিশুদের মত তার চোখ চকচক করতে থাকে- সেই মানুষটাকে ভালো না বেসে পারা যায়? 

গতকাল অনুরাগ কাশ্যপের জন্মদিন ছিল। তার একজন ভক্ত হিসেবে আমি তাকে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা। তার মত ডিরেক্টরের আরও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকাটা খুবই দরকার, এজন্য আমি সবসময়ই তার সুস্বাস্থ্য কামনা করি। বহুবার নিজের ইন্টারভিউতে তিনি বলেছেন- শাহরুখ খানের সাথে একটা সিনেমা না বানিয়ে আমি বলিউড ছাড়ছি না। 

অন্তত সেই দিনটা দেখার জন্য আর সেই সিনেমাটা ঠিকঠাক শেষ হওয়ার জন্য এই মানুষটার আরও দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটা প্রয়োজন বলে বোধ হয় আমার!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা