ফ্যাক্ট, ট্রিবিউট, মেটাফোরের মিশেলে 'অপরাজিত' বেশ ছিমছাম এক সিনেম্যাটিক এক্সপেরিয়েন্স৷ এক গুণী মানুষের কাছ দিয়ে হাঁটা। তার প্রবল পরাক্রমশালী উত্তাপের আঁচ গায়ে লাগা। তৃপ্তিতে খানিকটা উদ্বেল হওয়াও...

নির্মাতা হিসেবে অনীক দত্ত বরাবরই এক ভরসার নাম। ভূতের ভবিষ্যৎ, আশ্চর্য প্রদীপ কিংবা মেঘনাদবধ রহস্য... নিজের বানানো প্রত্যেক সিনেমাতেই এমন কিছু খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে তিনি ডিল করেন, এমন কিছু এক্সপেরিমেন্ট তিনি ইনকর্পোরেট করেন... বাংলা সিনেমার সাপেক্ষে যা বিরল এক বিষয়। মূলত এ কারণেই, খুব কম সিনেমা বানিয়েই ঢের বেশি ভরসার জায়গায় চলে গিয়েছেন তিনি। এবং যখনই জানা গেলো, সেই অনীক দত্তই, বিশ্বজয়ী নির্মাতা 'সত্যজিৎ রায়' এবং সত্যজিৎ রায় এর প্রথম সিনেমা 'পথের পাঁচালী'কে হোমাজ দেবার কথা ভাবছেন, এবং, সে সিনেমার প্রোটাগনিস্টের চেহারাও প্রস্থেটিকের গুণে অবিকল সত্যজিৎ রায়ের মতই, তখন সিনেমাটা নিয়ে আশাবাদী হওয়া এবং সিনেমা মুক্তির সময় নিয়ে ক্ষণগণনা করা ছাড়া আর কোনো উপায় রইলো না৷ অনীক দত্ত, সত্যজিৎ রায়ের অনেক বড় ভক্ত জানা ছিলো। ট্রিবিউট'টাও তিনি বেশ দারুণভাবে দেবেন, তাও বোধগম্য ছিলো। কিন্তু, প্রেজেন্টেশন কিরকম হবে, মূলত সেখানেই ছিলো প্রশ্ন। 

এবং তৃপ্তি সেখানেই, ট্রিবিউটের পাশাপাশি প্রেজেন্টেশনেও খুব দারুণ চমৎকারিত্ব দেখালেন অনীক দত্ত৷ রেডিও'র এক ইন্টারভিউতে কথোপকথনের টুকরো টুকরো শব্দের ইটে গাঁথা হলো এক সিনেমার আখ্যান৷ যদিও অনীক দত্তের এ সিনেমায় 'সত্যজিৎ রায়' হয়েছেন 'অপরাজিত রায়', 'বিজয়া' হয়েছেন 'বিমলা', 'সর্বজয়া' হয়েছেন 'সর্বমঙ্গলা', 'পথের পাঁচালী' হয়েছে 'পথের পদাবলী'... তবুও এসব টুকরোটাকরা বৈসাদৃশ্য 'পথের পাঁচালী' নির্মাণের পেছনের গল্পটুকু শোনার ক্ষেত্রে সেরকম প্রতিবন্ধকও হয়নি।  যারা বিজয়া রায়ের 'আমাদের কথা', সত্যজিৎ রায়ের 'প্রবন্ধ সমগ্র' কিংবা 'একেই বলে শুটিং' পড়েছেন, তারা এ সিনেমার সিংহভাগ গল্পের সাথে হয়তো আগে থেকেই পরিচিত। তবে, এও ঠিক, সেসব জানা গল্পের ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন যেটা হলো, সেটা নিয়ে ভুল ধরার এবং সন্তুষ্ট না হওয়ার সেরকম জায়গা রইলো না মোটেও। 

ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশনে খুব দারুণভাবেই উতরে যায় 'অপরাজিত'

বিজ্ঞাপনী সংস্থায় চাকরির সময়ে বিভূতিভূষণের 'আম আঁটির ভেঁপু' পড়তে পড়তে স্কেচ করা, লন্ডনে গিয়ে ভিত্তরিও ডি সিকা'র 'দ্য বাইসাইকেল থিভস' দেখে নিও-রিয়্যালিজম সিনেমার প্রেরণা পাওয়া, সিনেমা বানানোর শুরুতে নানা জাতের প্রোডিউসারের দুয়ারে দুয়ারে ঘোরা, তাদের অদ্ভুত সব আবদারের মুখোমুখি হওয়া, সিনেমার কাজ নানা বিপত্তিতে পণ্ড হওয়া, স্ত্রী'র গয়না বন্ধক রেখে সিনেমার শুটিং করা, সাদা কাশবন আর কয়লার কালো ধোঁয়ার অ্যাম্বিভ্যালেন্সে দুই ভাই-বোনের শৈশবের পোর্ট্রেয়াল, বোরেল গ্রামের সেই বৃষ্টি, পুকুরের জলে মিঠাইওয়ালার প্রতিবিম্ব, সিনেমা বিদেশে সাড়া পেলেও দেশের তাবড় বুদ্ধিজীবীদের নাক সিঁটকানো তাচ্ছিল্য, পরে আবার তাদেরই ভোল পালটে যাওয়া... 'পথের পাঁচালী'র সাথে অনেক ইতিহাস ও আয়রনির আশ্চর্য সহাবস্থান। এবং, এসব মিলিয়ে-মিশিয়েই এ সিনেমা 'পাথ ব্রেকিং।' 'অপরাজিত' সিনেমায় 'পথের পাঁচালী'র এ অবিস্মরণীয় দিকটা তো উঠে আসেই, পাশাপাশি, এ সিনেমা বলে একজন বিশ্বসেরা নির্মাতার আত্মপ্রকাশের গল্পও। ফলাফল- দুই গল্পই এগোয় আশ্চর্য সহাবস্থানে। 

'অপরাজিত' এক নির্মাতার আত্মপ্রকাশের গল্পও

'পথের পাঁচালী'র নানাবিধ নষ্টালজিয়া, যে নষ্টালজিয়ায় ইন্দির ঠাকরনের শ্মশান-যাত্রা আছে, আছে সর্বজয়ার কান্নার সাথে বেহালার সুরের সঙ্গতও... তা যেভাবে রিবার্থ নেয় 'অপরাজিত' সিনেমায়... মুগ্ধ হতেই হয়। বাংলার সিনেমায় টেকনিক্যাল দিক নিয়ে খুঁত ধরার জায়গা বরাবরই থাকে। কিন্তু মনোক্রোমিক টেমপ্লেটে এই যে সিনেমা... এখানে সেরকম ভুল ধরার জায়গা তো নেই-ই, বরং থাকে মুগ্ধ হওয়ার একাধিক অনুষঙ্গ। সুপ্রতীম বোলের ব্রিলিয়ান্ট সিনেম্যাটোগ্রাফী, কিংবা দেবজ্যোতি মিশ্রের মিউজিক কম্পোজিশন; যেখানে সত্যজিৎ রায়ের 'পথের পাঁচালী'র আইকনিক সুর ছুঁয়ে মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট পৌঁছে যাচ্ছে অন্য পর্যায়ে, তা নষ্টালজিয়া আর অ্যাসথেটিকস এর অদ্ভুত এক মিশ্রনেই যেন বুঁদ করে রাখে। 

তবে, এও ঠিক, এ সিনেমার টেকনিক্যাল দিকে ভুল ধরার জায়গা না থাকলেও, খানিকটা ত্রুটি আছে সত্যবয়ানে। অনীক দত্ত নির্মাতা কিংবা মানুষ হিসেবে বরাবরই সাহসী। কিন্তু 'অপরাজিত' দেখতে গিয়ে কোথাও যেন মনে হয়, তিনি সসম্ভ্রমে একটা দূরত্ব থেকেই দেখাচ্ছেন সত্যজিৎ রায়কে। খুব বেশি কাছে ঘেঁষছেন না তাঁর। রিস্ক নিচ্ছেন না। আটপৌরে সত্যজিৎ আমাদের কাছে তাই হাজির হচ্ছেন না। যিনি আমাদের সামনে আসছেন তিনি সেই সত্যজিৎ, যাকে আমরা আগে থেকেই চিনি। কোনো এক সিনেমার বরাতে একজন শিল্পীর নতুন একটা দিক উন্মোচন করা... এ সিনেমা খানিকটা হলেও সেখানে এসে হতাশ করে। আবার, সিনেমার কিছু তথ্যগত বিভ্রাটও খচখচানি বাড়ায়। বিশেষ করে- 'পথের পাঁচালী'র 'দূর্গা'কে খুঁজে পাওয়ার যে ঘটনা পরম্পরা এ সিনেমায় আমরা দেখি, তা সত্য তো নয়ই। বরং, পুরোপুরিই আরোপিত। অপ্রয়োজনীয়ও বোধহয়। 

তবে, এই আক্ষেপ আবার কেটে যায় জিতু কামালের অভিনয়ে। 'অপরাজিত' সিনেমার আগে খুব যে আহামরি কাজ করেছেন তিনি, তা তো না৷ অথচ পুরো সিনেমায় তিনি এমন এক মানুষের ম্যানারিজম'কে ধারণ করছেন, যাকে মানুষ 'দেবতুল্য' পর্যায়েই রাখে বরাবর। যে মানুষটি প্রচণ্ড গুণী, শিরদাঁড়া সোজা, চোখেমুখে যার বরাবরই উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস। এরকম এক চরিত্রের পোর্ট্রেয়াল করা যে মোটেও সহজ কিছু না, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু জিতু কামাল যেভাবে পুল অফ করেন এই চরিত্রকে, তা দেখবার মতন। যেসব দৃশ্যে তিনি আছেন, সেসব দৃশ্যে সত্যজিৎ রায়কে ভেবে খানিকটা ভ্রমও হয়। যার অনেকটা কৃতিত্ব মেকআপ আর্টিস্ট সোমনাথ কুন্ডুরও। সাথে চন্দ্রাশীষ রায়ের কন্ঠ। এবং, এভাবেই হুবহু সত্যজিৎ রায়কে প্রতিষ্ঠা করার সৌকর্যই মূলত এ সিনেমার ক্রেডিবিলিটি'কে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। 

'সত্যজিৎ'রূপী জিতু কামাল

সত্যজিৎ রায় যে সময়ে 'পথের পাঁচালী' বানিয়েছেন, সে সময়ের সাপেক্ষে এরকম সিনেমা বানানো শুধু যে দুঃসাহসী সিদ্ধান্তই ছিলো, তা না। ছিলো প্রচলিত কাঠামোকে প্রশ্ন করার আপ্রাণ ইচ্ছেও। এই সিনেমার পেছনে সংকটও কম ছিলোনা মোটেও। এবং সবরকম প্রতিবন্ধকতাকে টপকে যেভাবে 'পথের পাঁচালী'র জন্ম, এ সিনেমা যেভাবে 'সিনেমা'র সংজ্ঞা উপেক্ষা করে অতিক্রম করে বহুদূরের দূরত্ব, বাংলার কেষ্টবিষ্টুদের দ্বিচারিতাকে করে প্রকট, সে সাথে এই ন্যারেটিভকেও করে বাস্তব- সিনেমার মত সিনেমা বানালে তা সফল হবেই... সেসব সাপেক্ষে এ সিনেমার টাইটেল হিসেবে 'অপরাজিত'ই হয় সবচেয়ে সুন্দর। মেটাফোরিক্যাল। 

ফ্যাক্ট, ট্রিবিউট, মেটাফোর... বিশেষ এ উপাদানগুলোর মিলিত মিশেলে তাই 'অপরাজিত' বেশ ছিমছাম এক সিনেম্যাটিক এক্সপেরিয়েন্স হয়ে দাঁড়ায়৷ এক গুণী মানুষের কাছ দিয়ে হাঁটার সন্তুষ্টিও হয়। তার প্রবল পরাক্রমশালী উত্তাপের আঁচ গায়েও লাগে খানিকটা। তৃপ্তিতে খানিকটা উদ্বেলও হতে হয়। মূলত, এ নির্মাণ থেকে এসবই প্রাপ্তি। এসবই মুগ্ধতার দিক।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা