'শিরোনাহ' নামের যে ফিকশনাল মফস্বলকে দেখানো হয়েছে এই নির্মাণে, সেই স্থানের সিনেম্যাটিক অ্যাসথেটিকস এতটাই অনবদ্য, চোখের পলক পড়ছিলোনা যেন। কাঠের ছিমছাম বাড়ি, সেসব বাড়ির পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল সবুজ উপত্যকা, ওপাশে বিস্তীর্ণ পাহাড়, মাঝখান দিয়ে 'রূপোলী বিছে'র মতন সর্পিল সব রাস্তা, গভীর গহীন জঙ্গলের সারি সারি চিরহরিৎ বৃক্ষ, বৃক্ষের পাতার ফাঁক দিয়ে ভোরের সূর্যকিরণ... শুধুমাত্র কালার গ্রেডিং এবং সিনেম্যাটোগ্রাফীর জন্যে হলেও 'আরণ্যক' দেখা যায় একাধিকবার! 

ওপার বাংলার কালজয়ী লেখক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বলতেন-

যেকোনো গল্পের শুরুর চেয়েও শেষটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 

যদিও চারপাশে নিয়মিতই দেখছি, গড়পড়তা লেখকেরা কোনো গল্পের প্রারম্ভিক অংশ নিয়ে যতটা উদ্যোগী থাকেন, তাদের সে উদ্যোগের অনেকটুকুই ফিকে হয়ে যায় শেষাংশে পৌঁছাতে পৌঁছাতে। এবং ঠিক এরকম ক্ষেত্রগুলোতেই নির্মাণ তার আবেদন হারিয়ে ফেলে ক্রমশই রূপান্তরিত হয় নির্জীব এক বিষয়ে। শেষে এসে খেই হারিয়ে অনেক নির্মাণই বাধ্য হয় 'ধামাচাপা' কিংবা 'জগাখিচুড়ি'র আশ্রয় নিতে। এবং হয়তো ঠিক এ কারণেই 'শেষ ভালো যার, সব ভালো তার' কিংবা 'শেষপাতে দই' নামক শব্দগুচ্ছ দিয়ে শেষকে গুরুত্ববহ করার চেষ্টা হয়েছে চিরকাল। 

নেটফ্লিক্সের সাম্প্রতিক টিভি সিরিজ 'আরণ্যক' শেষ করার পরে প্রাতঃনমস্য শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উক্তিখানি মনে পড়লো প্রথমেই। কেন মনে পড়লো, সে বিশ্লেষণে একটু পরে আসি। প্রথমে শুরু করি 'আরণ্যক' দিয়ে। 'আরণ্যক' নামক বিশেষ এ শব্দের সাথে বাঙ্গালী পাঠকের স্মৃতিকাতরতার যে কতখানি যোগ, তা বাঙ্গালীমাত্রই জানেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার 'আরণ্যক' এ যেভাবে অরণ্যকে জ্যান্ত করে নিয়ে এসেছিলেন বইয়ের পাতায়, তা এখনও চোখে অমলিন, স্থির। যে পাঠক একবার 'আরণ্যক' পড়েছে, তিনি যে নির্ঘাতভাবেই অরণ্যের সে জগতে আটক হয়েছেন যাবজ্জীবনের জন্যে, তা একরকম নির্দ্বিধায়ই বলা যায়। সেই 'আরণ্যক' নামটিকেই যখন নেটফ্লিক্সের এক ওয়েব সিরিজের টাইটেল করা হলো, পাশাপাশি বাঙ্গালী তুখোড় অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়কে নেয়া হলো প্রোটাগনিস্ট ক্যারেক্টারে... তখন নড়েচড়ে বসাটাই ছিলো প্রাসঙ্গিক। এবং ওভার দ্য টপ, রাভিনা টেন্ডন। যেখানে সুস্মিতা সেন 'আরিয়া'র লিড রোল হয়ে দুর্দান্ত অভিনয়ে সবার টনক নড়িয়েছেন, সেখানে রাভিনার অভিষেক টিভি সিরিজ নিয়ে খানিকটা বাজি ধরার মধ্যে বোধহয় বাড়াবাড়ি কিছু ছিলোও না অতটা। পাশাপাশি বহুদিন পরে গুণী অভিনেতা আশুতোষ রানার প্রত্যাবর্তন। একটা নির্মাণ জমানোর জন্যে আর কী লাগে! 

মূল গল্পটাও চমৎকার। গল্প শুরু হয় হিমাচল প্রদেশের অজ্ঞাতকুলশীল পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে থাকা 'শিরোনাহ' নামের ছোট্ট শহরে৷ এই পাহাড়ি মফস্বলের পুলিশ স্টেশনে এক সকালে উপস্থিত হন নতুন স্টেশন হাউজ অফিসার অঙ্গার মালিক। তিনি দায়িত্ব নেয়ার কিছুক্ষণ পরেই থানায় আসেন এক বিদেশি ভদ্রমহিলা। যিনি জানান, তার মেয়ে গত রাত থেকে নিখোঁজ। পরবর্তীতে পুলিশি তদন্তে জানা যায়, মেয়েটিকে কে বা কারা ধর্ষণ করে লাশ ঝুলিয়ে রেখেছে শিরোনাহ এর গহীন বনে! চমকে যাওয়ার মত এ ঘটনার ফলশ্রুতিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে দেয় জোরেসোরে। যদিও এলাকাবাসীর বিশ্বাস, এটি নর তেন্দুয়া (চিতা-মানব) এর কাজ৷ এই জনপদের মানুষজন বিশ্বাস করে, 'শিরোনাহ' এর জঙ্গলের গহীনে এক পিশাচের বসবাস, যে পিশাচ অল্পবয়সী মেয়েদের ধর্ষণ করে হত্যা করে ঝুলিয়ে দেয় বনের বিশাল সব গাছের মগডাল থেকে। যদিও ধর্ষণ-হত্যার এই নারকীয় ঘটনা কোনো এক অতীতে নিয়মিত ঘটলেও মাঝের উনিশ বছরে পিশাচের এই শিকার-যজ্ঞ স্তিমিত ছিলো পুরোপুরি। কিন্তু জঙ্গলের গভীরের দীর্ঘকায় বৃক্ষ-দেহের সাথে লম্বালম্বি ঝুলতে থাকা অষ্টাদশী এই মেয়ের লাশ দেখার পরে গ্রামবাসী বুঝতে পারে, আবার ফিরে এসেছে সেই পিশাচ। নর তেন্দুয়া। এ ঘটনায় আচমকা থমথমে অস্বস্তি ফিরে আসে জনপদে। 

নতুন অফিসার থানার দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এরকম এক বড়সড় কেস পাওয়ায় সন্তুষ্ট হতে পারেননা এই স্টেশনের আগের মহিলা অফিসার কস্তুরি দগরা। অফিশিয়ালি অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে না পারলেও, আড়ালে-আবডালে তিনিও শুরু করেন তদন্ত। অনুসন্ধান৷ যে অনুসন্ধানে ক্রমশই যুক্ত হয় রাজনীতি, গুম, খুন, তথ্য লোপাট, মিথ এবং সাসপেন্স! 

গল্প এটুকু থাকলেও হতো৷ কিন্তু এ গল্পের গিজগিজে সাবপ্লটের এখনও অনেক বাকি। গল্পের প্রোটাগনিস্ট দুইজনেরই মানসিক সব টানাপোড়েন ক্রমশ খোলাসা হয়। দর্শক পরিচিত হয় অঙ্গার মালিকের দুঃসহ অতীতের সাথে,  যে অতীতে তিনি হারিয়েছেন তার সন্তানকে, ভালোবাসার স্ত্রী'র সাথে হয়েছে বিচ্ছেদ। আরেক প্রোটাগনিস্ট কস্তুরি দগরার পরিবারেও ভাটার টান। স্বামীর সাথে আত্মিক টান নেই তার। নিজের কিশোরী মেয়েরও লুকোছাপার কোনো এক ইতিহাস আছে। কর্মক্ষেত্রেও খুব যে সুবিধে করতে পারছিলেন কস্তুরী, এমনটাও না।

অঙ্গার এবং কস্তুরি... লিড রোলের দুই চরিত্র যখন এভাবেই বাস্তব জীবনে ক্রমশই নাকানিচোবানি খাচ্ছে, এমন এক সময়ে 'নর তেন্দুয়া'র এই কেস হয়ে দাঁড়ায় তাদের আশা-ভরসার একমাত্র বাতিঘর। মরিয়া হয়ে এই কেসকে আঁকড়ে ধরেন তারা। নেশা, মোহ, কাম, সন্দেহের একাধিক সর্পিল বাঁকের বিপজ্জনক এ গল্পে ক্রমশই ডুবে যেতে থাকেন এই দুই মানব-মানবী। মফস্বল শহর 'শিরোনাহ' এর 'আরণ্যক' এভাবেই ক্রমশ প্রবেশ করতে শুরু করে গভীর থেকে গভীরের আখ্যানে! 

অঙ্গার এবং কস্তুরী... এই দুই চরিত্রের দিকেই ছিলো আকর্ষণ! 

গল্পের এটুকু পড়েই বুঝতে পারার কথা, এ গল্প নিয়ে করা যেতো বহুকিছু, যাওয়া যেতো বহুদূর। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এটাই, শেষতক এসে বিনাশ হয়েছে সকল সম্ভাবনাই। পাশাপাশি, গল্পের যে প্রধানতম আকর্ষণ, সেটিকে শেষাংশে এসে যেভাবে 'খেলো' করা হয়েছে, তাতে খানিকটা বিরক্তই হয়েছি। অবশ্য নির্মাতার করার কিছু ছিলোও না৷ তিনি এত অজস্র চরিত্র, এত অজস্র ডাইমেনশন, এত অজস্র সব লুপহোল রেখেছেন, শেষে এসে জট ছাড়াতে গিয়ে তিনি খেই যে হারিয়ে ফেলবেন, তা একরকম নিশ্চিতই ছিলো। হয়েছেও সেটি৷ লেখার শুরুতেই নমস্য লেখক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই অমোঘ উক্তি এখানে এসেই প্রাসঙ্গিক হয়েছে। খুব সম্ভাবনার এক গল্পের আবহ দিয়ে শেষটা যেখানে হয়েছে, সেটাই হতাশ করেছে পুরোপুরি।

গুণী নির্মাতা সত্যজিৎ রায় একটা কথা বলতেন-

সিনেমায় কোন অংশ রাখতে হবে এবং কোন অংশ বাদ দিতে হবে, সেটা বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

'আরণ্যক' ঠিক এখানে এসেও খানিকটা ঝুলিয়েছে৷ 'স্ক্রিনপ্লে' বলতে আমরা যা বুঝি, এ নির্মাণের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা ছিলো সেখানেই৷ হুটহাট দৃশ্য ঢুকে যাচ্ছে, হুটহাট বেরিয়ে যাচ্ছে৷ কোন দৃশ্যের কতটুকু রাখতে হবে, কতটুকু করতে হবে ছাঁটাই, কোন শটের পরে কোনটি আসবে, সেই ঘটনা-পরম্পরার সামঞ্জস্য... এসবে ছিলো অযত্নের ছাপ। পাশাপাশি প্রোটাগনিস্ট দুই ক্যারেক্টারেরই ব্যাকস্টোরি ততটুকু ডেভেলপ করা হয়নি, যতটুকু করলে দর্শক তাদের যাপিত গল্পের সাথে একাত্ম হতে পারতো। যে 'নর তেন্দুয়া' নিয়ে এত ভীতি, সেই নর-তেন্দুয়ার ব্যাকস্টোরি কী, কেন সে এত ভয়ঙ্কর, এরকম 'মানুষ-বাঘ' মিথের উৎপত্তি কী, সেটারও কোনো ইঙ্গিত নেই গল্পে। এ প্রসঙ্গে গত বছরের ভারতের অন্যতম দুর্দান্ত টিভি সিরিজ 'অসুর' এর কথা মনে আসে ক্রমশ। 'অসুর' এ যেভাবে অ্যান্টাগনিস্ট এর ব্যাকস্টোরি ডেভেলপ করা হয়েছে, তার ছিঁটেফোঁটাও এখানে পেলে বর্তে যেতাম। 

ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টে রয়ে গিয়েছে বিস্তর খামতি! 

পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, রাভিনা টেন্ডন, আশুতোষ রানা... মূখ্য চরিত্রে থাকা এই তিনজনের অভিনয় ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ বোধকরি কারোরই নেই। তারা খারাপ অভিনয় করেছেন, তেমনটি বলারও সুযোগ নেই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটাই, তারা এর চেয়েও ভালো অভিনয় করতে পারেন। ভালোর মাপকাঠিতে তাই তাদের 'ফুল মার্কস' দেয়া গেলোনা মোটেও। বাকিরা ঠিকঠাক। মারাত্মক অভিনয় করেছেন, এমন কারো নিদর্শন এই নির্মাণের অন্তত ক্ষেত্রে খুঁজে পাইনি। 

তবে, এতসব অসন্তোষের ভীড়েও 'আরণ্যক' এর সবচেয়ে বড় গুণ-  এর লোকেশন। 'শিরোনাহ' নামের যে ফিকশনাল মফস্বলকে দেখানো হয়েছে এই নির্মাণে, সেই স্থানের সিনেম্যাটিক অ্যাসথেটিকস এতটাই অনবদ্য, চোখের পলক পড়ছিলোনা যেন। কাঠের ছিমছাম বাড়িঘর, সেসব বাড়িঘরের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল সবুজ উপত্যকা, ওপাশে বিস্তীর্ণ পাহাড়, মাঝখান দিয়ে 'রূপোলী বিছে'র মতন সর্পিল সব রাস্তা, আচমকা পাহাড়ি বাঁশির টান, গহীন জঙ্গলের বিশাল চিরহরিৎ বৃক্ষ, সে বৃক্ষের পাতার ফাঁক দিয়ে ভোরের সূর্যকিরণ... শুধুমাত্র কালার গ্রেডিং এবং সিনেম্যাটোগ্রাফীর জন্যে হলেও 'আরণ্যক' দেখা যায় একাধিকবার! 

নেটফ্লিক্সের স্ট্রাটেজি অনুযায়ী, অবধারিতভাবেই এই সিরিজের দ্বিতীয় সিজন আসবে, এবং যতদূর যা মনে হলো, দ্বিতীয় সিজনের মুলো ঝুলিয়ে রাখার জন্যেই প্রথম সিজনকে এরকম আধাখেঁচড়াভাবে শেষ করা হয়েছে৷ যদিও দর্শককে হুক করে রাখার এই পরিকল্পনায় সিরিজের মান খানিকটা পড়তির দিকেই  নেমে গিয়েছে, তবুও 'আরণ্যক' এর দ্বিতীয় কিস্তি যদি আসে, অন্ততপক্ষে আমি সে কিস্তি খুব আগ্রহ নিয়ে দেখবো। কারণ এই সিজনে যেভাবে গল্পটা শেষ হয়েছে, সেটা কোনোভাবেই মধুরেণসমাপয়েৎ না। কোনোভাবেই এরকম সমাপ্তি প্রাসঙ্গিক না। এরকম সুন্দর এক গল্পের এরকম অপমৃত্যুও কাম্য না। সেজন্যেই তাই খুব করে চাওয়া, 'আরণ্যক' এর দ্বিতীয় কিস্তি আসুক। এরকম অনবদ্য এক গল্প আরেকটু সম্মান পাক। তাহলেই দর্শক হিসেবে খানিকটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারবো। সেরকম এক সমাপ্তিরই এখন প্রত্যাশা!  


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা