অনেকেই বলেছিলেন এই ছেলে যেমন ধুমকেতুর মতো এসেছে, সেভাবে খুব দ্রুত হারিয়েও যাবে। কিন্তু তা তিনি হতে দেননি। শীর্ষ এক নায়কের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে তার সিনেমা থেকে প্রায় নিষিদ্ধই হয়েছেন ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে। সেই ধাক্কাটাও তিনি সামলে উঠেছেন...

বড়ো ইচ্ছে করছে ডাকতে,
তোর গন্ধে মেখে থাকতে,
কেন সন্ধ্যে সন্ধ্যে নামলে সে পালায়......

২০১২ সালের একেবারে শেষের দিকে রাজ চক্রবর্তীর 'বোঝে না সে বোঝে না' সিনেমার এই গান বাঙালী শ্রোতাদের হৃদয়ে ভীষন ছাপ ফেলেছিল। সিনেমার গানে সাদা পোশাক পরা নায়ক-নায়িকার পাশাপাশি গিটার কাঁধে নিয়ে কালো পোষাক পরা একজন অপরিচিত নবীন গায়ক গানটি গেয়ে যাচ্ছেন, আর শ্রোতারা মুগ্ধ হচ্ছেন। গানের জগতে এই নবীন গায়কের সফল জয়যাত্রা হলো এই গানের মাধ্যমে। 

এর কিছুদিন পরেই সাড়া ফেললো বলিউডের 'আশিকি ২' সিনেমার গান। এই সিনেমার 'তুমি হি হো' গানটির তুমুল জনপ্রিয়তার কথা একবাক্যে সবাই মেনে নিবেন। সেই সুবাদে বাংলা ও হিন্দি গানের জগতে রাজকীয় ভাবে প্রবেশ করেছিলেন সেই নবীন গায়কটি, আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত। তিনি প্রায় এক যুগ ধরে তিনি বলিউডের সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়ক, ভারতীয় বাংলা গানেও রয়েছে বেশ জনপ্রিয়তা নাম তার 'অরিজিৎ সিং'। 

ছোটবেলা থেকেই সাধনা করেছেন সঙ্গীতের, রিয়েলিটি শো 'গুরুকুল' এ সেরা ছয়ে ছিলেন। এরপর একটা সময় পর ভাগ্য অন্বেষণে মুম্বাইয়েই থেকে গেলেন। বলিউডের প্লেব্যাকের সুযোগ আসে, আবার হারিয়েও যায়। বানশালীর 'সাওয়ারিয়া' সিনেমায় তার গাওয়া গানটি প্রকাশই করা হয় নি। 

অবশেষে সুযোগ আসে মার্ডার ২ সিনেমার 'ফির মোহাব্বত' গান দিয়ে, এজেন্ট বিনোদের রাবতা, বারফির গানের পর মাহেন্দ্রক্ষণ আসে মহেশ ভাটের 'আশিকি ২' সিনেমার এলব্যাম দিয়ে। তুমুল জনপ্রিয়তা পায় এই এলব্যামের গানগুলো, বলা বাহুল্য বলিউডে এই দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমার এলব্যাম এটিই হবে। 

এরপর হিন্দি গানে শুরু হল শুভযাত্রা, একের পর এক সিনেমায় প্লেব্যাক করতে লাগলেন। সেই একই বছরেই কবিরা, কাশ্মির তু ম্যায় কন্যাকুমারী, হার কিসি কো, কাভি যো বাদল বারসের মত জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছিলেন। তবে সব ছাপিয়ে নিজেকে দারুণ ভাবে উন্মোচন করেন রাম-লীলা সিনেমার 'লাল ইশক' গানের মাধ্যমে।

অরিজিত সিং তাঁর হিন্দি গানের ক্যারিয়ারে অনেক জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। দিলওয়ালে সিনেমায় শাহরুখ খানের লিপে যেমন 'গেরুয়া' গেয়ে দারুন সাড়া জাগিয়েছিলেন, তেমনি পদ্মাবতের জিম শর্বের লিপে 'বিনতে দিল' গেয়ে সবার প্রশংসা পেয়েছিলেন। সিটি লাইটস সিনেমার 'মুসকুরানে কি ওয়াজাহ' কিংবা বাজিরাও মাস্তানির 'আয়াত' গানটার কথা বিশেষ ভাবে বলতেই হয়। করন জোহরের অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল সিনেমাটি তুমুল দর্শকনন্দিত হয়তো হয়নি, তবে এই সিনেমার অরিজিত সিং এর কন্ঠে চান্না মেরেয়া, ব্রেকআপ সং থেকে টাইটেল সং এর জন্য শ্রোতাদের কাছে অনেকদিন মনে থাকবে। 

'রয়' সিনেমা নিয়েও দর্শকদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়, তবুও এই সিনেমায় তাঁর গাওয়া 'সুরাজ ডুবা হ্যায়' গানটি শ্রোতাপ্রেমীদের কাছে বিশেষ হয়ে থাকবে। টু স্টেইটস সিনেমার 'মাস্ত মগান', জাজ্ঞা জাসুসের 'গলতি সে মিসটেক', রাজির 'অ্যায় ওয়াতান থেকে কলঙ্ক সিনেমার ফার্স্ট ক্লাস, টাইটেল সং, কেসারির মাহি, কবির সিং এর বেখায়ালি, লুডু সিনেমার হামদাম, আবাদ বরবাদ- সহ বহু গানে বিশেষ দ্যুতি ছড়িয়েছিলেন। তামাশা সিনেমায় 'তুম সাথ হো' গানে অলকা ইয়াগনিকের সঙ্গে দ্বৈত গান গেয়েছেন, শ্রেয়া ঘোষালের সঙ্গে জুটি বেশ জনপ্রিয়। 

অরিজিত সিং

অরিজিত সিং ছোটবেলা কেটেছে বাংলায়, তাই বাংলা গানের প্রতি আলাদা একটা টান থাকবে স্বাভাবিক। নিজেকে আরো বিশেষ করে তুলেছেন বাংলা গানে। বাংলায় প্রথম প্লেব্যাক করেন 'এগারো' সিনেমায়, তবে আলোচিত হন 'বোঝেনা সে বোঝেনা'র দারুন সাফল্যের পর। জিৎ এর লিপে বস সিনেমার 'মন মাঝি রে' তো তুমুল জনপ্রিয় গান, অন্যদিকে দেবের লিপে 'চাঁদের পাহাড়' গানটা যেন অরিজিতের জন্যই গড়া। 

তবে বিশেষ করে বলতে হয় কৌশিক গাঙ্গুলীর খাদ সিনেমার 'দেখো আলোয় আকাশ ভরা' গানটির কথা, দারুন সঙ্গীতায়োজন হয়েছিল গানটি, মায়াভরা কন্ঠে গানটি গেয়েছিল অরিজিত। অপুর প্যাঁচালীর গানটাও মুগ্ধ হবার মতন। বালির শহর, তোমাকে ছুঁয়ে দিলাম, এগিয়ে দে, শুধু তোমার জন্য, বরবাদ- সহ  বাংলায় আরো জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। সিনেমার গানের বাইরে শুদ্ধ সঙ্গীতের ধারক কৌশিকি চক্রবর্তীর সঙ্গে 'কিছু কিছু কথা' গানটাও বেশ শ্রুতিমধুর। বাংলা গানে অবশ্য এখন কম সময় দেন। বাংলাদেশে 'ঢাকা অ্যাটাক' ছবিতে গেয়েছেন টুপটাপ গানটি, যৌথ প্রযোজনার শিকারি ছবিতেও গান গেয়েছেন। 

অরিজির সিং যখন জনপ্রিয় হচ্ছিলেন, তখন অনেকেই বলেছিলেন খুব দ্রুত হারিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু তা তিনি হতে দেন নি। তার নিজের সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আছে, তবে তার চেয়েও বেশি সীমাবদ্ধতা এখন বলিউডের গীতিকার ও সুরকারদের। আজকাল বলিউডেই গান খুব কম জনপ্রিয় হয়, যেখানে আগে ছিল জনপ্রিয় গানে পরিপূর্ণ। অরিজিত সিং বক্স অফিসের শীর্ষ এক নায়কের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে তার সিনেমা থেকে প্রায় নিষিদ্ধই হয়েছেন ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে। সেই ধাক্কাটাও তিনি সামলে উঠেছেন। বলতে গেলে গত অর্ধযুগ ধরে তিনিই একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছেন। 

বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে সম্প্রতি 'বিনতে দিল' এর জন্য সৌভাগ্যবান হয়ে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, পরপর পাঁচবার সহ মোট ছয়বার ফিল্মফেয়ার পেয়েছেন, বলিউড জয় করা আরেক বাঙালী গায়ক কুমার শানুর রেকর্ড ছুঁয়েছেন। বাংলায় ফিল্মফেয়ারের প্রথম আসরেই পুরস্কার পেয়েছিলেন। ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন প্রেমিকা কোয়েল রায়কে, দাম্পত্যজীবনেও তিনি বেশ পরিচ্ছন্ন মানুষ। নিজের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলবেন তিনি- এই প্রত্যাশা রইলো। 

শুভ জন্মদিন, অরিজিত সিং!


ট্যাগঃ

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা