আর কোনোদিন নতুন গান না গাইলেও অর্ণব বেঁচে থাকবেন- প্রেমে পড়া কারও কাছে ফুলগুলো সব লাল না হয়ে কেন নীল হলো সেই প্রশ্নে, 'আজ এ ঝড় এসে' শুনে বুকের ভেতর চেপে থাকা কষ্ট কান্না হয়ে বের হয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে, বোকা চাঁদের হাহাকারে হারিয়ে না ফেলার, হারিয়ে না যাওয়ার প্রার্থনাতে...

গত বছর কিশোর আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অর্ণব এসেছিলেন গান গাইতে। অর্ণব আসবেন, সামনাসামনি শোনা হবে তার গান- শুধুমাত্র এ কারণে প্রচন্ড উত্তেজনা নিয়ে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে অপেক্ষা করছিল মাথার ওপর চওড়া রোদ উপেক্ষা করেও। অর্ণব এলেন, গান গাইলেন, সবাইকে মাতালেন, মুগ্ধ করলেন, আবেগে ভাসালেন। ছেলে-মেয়েগুলো অর্ণবের সাথে গলা মিলিয়ে গান গাইছিল আর পাগলের মতো কাঁদছিল। কাঁদবে নাই বা কেন! মানুষটা যে শায়ান চৌধুরী অর্ণব, যার গানের সাথে মিশে আছে আমাদের আবেগ, অনুভূতি, কান্না-হাসি, প্রেম-বিরহ... তাকে সামনাসামনি দেখতে পেয়ে, সরাসরি তার গান শুনতে পেয়ে আবেগের বাধ না মানাটাই তো স্বাভাবিক।  

ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে পড়তেন অর্ণব। বাবা-মা দুজনেই শান্তিনিকেতনের আর্ট স্কুলে পড়েছেন, সে সূত্র ধরেই মায়ের সাথে একবার শান্তিনিকেতনে বেড়াতে যান। গিয়ে সেখানকার পরিবেশের প্রেমে পড়ে যান সেই ছোটবেলাতেই। বাবা-মায়ের কাছে আবদার করেন শান্তিনিকেতনেই পড়বেন তিনি। অর্ণবের কথামতো বাবা-মা তাকে ক্লাস থ্রিতে শান্তিনিকেতনের পাঠ্যভবনে ভর্তি করে দেন। শুরু হয় তার শান্তিনিকেতনের পথচলা।

চিত্রশিল্পী বাবা স্বপন চৌধুরীর মতোই ছবি আঁকায় ভাল ছিলেন অর্ণব। শান্তিনিকেতনের নিয়ম হলো- যে যে সেক্টরে ভাল, তাকে সেখানেই রেফার করে দেওয়া হয়, একাডেমিক কোনো লেভেলের জন্য অপেক্ষা করা হয় না। অর্ণবকেও তাই ক্লাস টেনের পর আর্ট কলেজে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। সেখান থেকেই ভিজ্যুয়াল আর্টে মাস্টার্স করেছেন তিনি। 

শায়ান চৌধুরী অর্ণব

ক্লাস সেভেন এইটে পড়েন তখন। আঁকাআঁকিতে ভাল হলেও শান্তিনিকেতনের পরিবেশের কারণে গানটাও তাকে টানতো ভীষণ। ততদিনে কবীর সুমন, অঞ্জন দত্তরা বাংলা গানের জগতে নতুন এক মাত্রা সৃষ্টি করেছেন। ভিন্নধর্মী এই গানগুলো গতানুগতিক গানের চাইতে সহজ ছিল গাওয়া, তাই অঞ্জন দত্তের গান গেয়েই প্রথম গিটার শেখা অর্ণবের। ছুটি পেলে শান্তিনিকেতন থেকে যখন ঢাকায় নিজ বাড়িতে আসতেন, মামাতো বোন মিথিলা-মীমদের সাথে নিয়ে সে গানগুলোই প্র‍্যাকটিস করতেন। টুকটাক গান লেখার চেষ্টাও করতেন তিনি। সাহানা বাজপেয়ীর 'একটা ছেলে মনের আঙিনাতে' গানটা ছিল স্টুডিওতে রেকর্ড করা অর্ণবের প্রথম গান। ঈদে সালামীর টাকা জমিয়ে প্রথমবার যখন ঢাকায় রেকর্ড করেছিলেন, সেবার কন্ঠ দিয়েছিল মিথিলা, মীম, আর অর্ণবের বড় বোন মিলিতা। 

এভাবেই ধীরে ধীরে বড় হওয়া, শান্তি নিকেতনের বন্ধুদের সাথে নিয়ে তৈরি করলেন ব্যান্ড 'বাংলা'। চমৎকার কিছু গান উপহার দেন এই ব্যান্ডের সাথে কাজ করে। তবে শান্তিনিকেতনের সাধারণ অর্ণব 'জনগণের অর্ণব' হয়ে ওঠেন মূলত 'সে যে বসে আছে' গান দিয়ে। সাহানা বাজপেয়ীর লেখা আর অর্ণবের সুর ও কন্ঠে গাওয়া এ গানটি ব্যবহৃত হয় অফবিট নামের এক নাটকে, এরপরই তা প্রচুর জনপ্রিয়তা পায়। এরই মধ্যে সাহানা বাজপেয়ীকে বিয়ে করে ঢাকায় চলে আসেন অর্ণব, বাংলা ব্যান্ড ছেড়ে দিয়ে শুরু করেন নিজের সোলো এলবামের কাজ। ২০০৫ সালে তার প্রথম এলবাম 'চাইনা ভাবিস' রিলিজ পেলো। এরপর একে একে প্রকাশিত হলো হোক কলরব, ডুব, রোদ বলেছে হবে, আধেক ঘুমে, খুব ডুব- এলবামগুলো।  

অর্ণব নিজেই বলেন- গান করার ক্ষেত্রে তিনি অনেক বেশি নির্ভরশীল। শান্তিনিকেতনে পড়াকালীন সময় থেকেই বন্ধুদের কাছে মনের মতো লিরিক খুঁজতেন সুর বাধার জন্য। সমমনা সঙ্গীদের সাথেই কাজ করায়ই কমফোর্ট ফিল করেন তিনি। এ কারণেই হয়তো ছোটবেলার সঙ্গী সাহানা বাজপেয়ীর সাথে করা গানগুলো সবার কাছে এত জনপ্রিয়তা পায়। অর্ণবের গাওয়া অনেকগুলো গানই সাহানার লেখা। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি গানের একটি তো উল্লেখ করেছি- সে যে বসে আছে, আরেকটি হলো মধ্যরাতে তরুণদের মনে হাহাকার তৈরি করা, তাদের হারিয়ে যাওয়া থেকে ফিরিয়ে আনা গান- 'হারিয়ে গিয়েছি, এইতো জরুরি খবর...'

অর্ণব-সাহানার প্রেমকাহিনীটাও ছিল চমৎকার। ক্লাস থ্রিতে পড়াকালীন সাহানাকে দেখে অর্ণব তার এক বন্ধুকে বলেছিলেন, 'বড় হয়ে আমি একে বিয়ে করব, দেখিস!' সাহানা রেগেমেগে প্রিন্সিপালকে বলে দিলেন, প্রিন্সিপাল তখন অর্ণবকে ডেকে নিয়ে শাসিয়েছিলেন আচ্ছামতো৷ 'এখানে তোমরা সবাই ভাই-বোনের মতো, এসব কথা মাথাতেও আনবে না'- প্রিন্সিপালের এ কথাটি বেমালুম ভুলে গিয়ে পরবর্তীতে বন্ধুত্ব, মন দেওয়া-নেওয়া হয় অর্ণব-সাহানার। বিয়ে অবধি গড়িয়ে যদিও সম্পর্কটির শেষ সুখকর হয়নি, ২০০৮ সালে বিচ্ছেদের মাধ্যমে এত বছরের একসাথে চলা রাস্তা আলাদা হয়ে যায় দুজনার। কিন্তু তার আগেই গানের মাধ্যমে মানুষের কাছে এক অন্যরকম উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিলেন তারা। যে প্রজন্মের বেশীরভাগের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত ছিল বোরিং, পুরোনো গান, সেই তরুণ প্রজন্মকেই রবীন্দ্রসঙ্গীতে পুনরায় মুগ্ধ হতে বাধ্য করেন অর্ণব-সাহানা, কম্পোজিশন আর গায়কীতে নতুনত্ব এনে।

ডিভোর্সের পর দীর্ঘদিন আড়ালে ছিলেন অর্ণব। যদিও 'আহা', 'জাগো', 'মনপুরা'- এই সিনেমাগুলোতে মিউজিক কম্পোজ করেছেন, আয়নাবাজিতে 'এই শহর' গান দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেছেন, তবুও প্রত্যাশিতভাবে তাকে ঠিক পাচ্ছিল না অর্ণবভক্তরা। কে জানে, তিনি হয়তো নিজেকে হারিয়ে খুঁজছিলেন! অবশেষে খুঁজেও পেলেন নিজেকে, সেই শান্তিনিকেতনেই।

অর্ণব-সুনিধি

বিশ্ব ভারতীর এক অনুষ্ঠানে গান শুনতে গিয়ে সুনিধি নায়েকের কন্ঠে রবীন্দ্রসংগীত শুনে মুগ্ধ হোন অর্ণব। তার নির্ভরশীলতা বৈশিষ্ট্যের কারণেই হয়তো সুনিধিকে নিজের পরিপূরক মনে হয়েছে তার কাছে। নয়তো একবেলার পরিচিত মেয়েটিকে কেন দুটি বই উপহার দেবেন এ আশা নিয়ে যে, বইগুলো পড়ে সুনিধি কিছু লিখবেন, আর সেখান থেকে গান তৈরি করবেন অর্ণব!  

সুনিধি সে বইদুটি পড়ে কিছু লিখেছিলেন কিনা জানা নেই, তবে সেখান থেকেই বন্ধুত্ব শুরু তাদের। এরপর প্রণয়, আর সে প্রণয় পরিণতি পেয়েছে গতবছর তাদের বিয়ের মাধ্যমে। একসময়ের 'প্রায় হারিয়ে যাওয়া' অর্ণব নিজেকে আবার যেন খুঁজে পেলেন, দর্শকশ্রোতাদের আক্ষেপ ঘুচিয়ে আবারও ফিরে এলেন তাদের সামনে। এখন তিনি নিয়মিত গান করছেন, সুনিধি নায়েকের সাথে করা 'তবে থাক' আর 'কেয়াফুলের আলো' গানদুটি বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

ঢাকা নাকি শান্তিনিকেতন- কোথায় থেকে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন, এ প্রশ্নের উত্তরে বরাবরই শান্তিনিকেতনকে বেছে নেন অর্ণব। তার বেড়ে ওঠা শান্তিনিকেতনে, শেকড়টা পোঁতা রয়েছে সেখানে, এটাই হয়তো এই বেছে নেওয়ার মূল কারণ। তবে যেখানে থেকেই স্বাচ্ছন্দবোধ করুন না কেন, আর হারিয়ে না গিয়ে আমাদের নিত্যনতুন গান উপহার দেবেন তিনি- এটাই প্রত্যাশা তার কাছে।

অর্ণবের নতুন গান মানেই আমাদের কাছে আশীর্বাদের মতো, তবে নতুন গান না গাইলেও অর্ণব আমাদের কাছে বেঁচে থাকবেন- নতুন প্রেমে পড়া কারও কাছে ফুলগুলো সব লাল না হয়ে কেন নীল হলো সেই প্রশ্নের মাধ্যমে, 'আজ এ ঝড় এসে, বাঁধন গেছে টুটে' শুনে বুকের ভেতর চেপে থাকা কষ্ট কান্না হয়ে বের হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে, বোকা চাঁদের হাহাকারে, নিজেকে নিজেই হারিয়ে না ফেলার, হারিয়ে না যাওয়ার প্রার্থনাতে...  

শুভ জন্মদিন, প্রিয় অর্ণব!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা