চৌদ্দ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছিলেন তিনি, বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তিটাও বেহাত হয়ে গিয়েছিল, বেঁচে থাকার তাগিদে বোম্বের রাস্তায় রাস্তায় লিপস্টিক-নেইল পলিশ ফেরি করে বেড়াতেন একটা সময়ে!

ভাই... টেনশান নেহি লেনেকা ভাই...

বলিউডের যারা নিয়মিত দর্শক, কিংবা অনিয়মিত হলেও, এই ডায়লগটা শুনলেই চিনতে পারার কথা। যারা পারছেন না, তাদের জন্যে ভূমিকাটা আরেকটু লম্বা করি। বোম্বের একটা মুসলমান পরিবারে তার জন্ম। শৈশবের আনন্দস্মৃতিগুলো কৈশোরে পা রাখার মূহুর্তে দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো হুট করেই, বাবাকে হারিয়ে এতিম হয়ে পড়েছিলেন তিনি। স্বামীর শোকে মা'ও প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন।

তার বয়স তখন মাত্র চৌদ্দ বছর। বোর্ডিং স্কুলে সব ছেলেদের বাবা-মা আসে, সপ্তাহে সপ্তাহে ওদের নামে চিঠি আসে, কিন্ত এই ছেলেটার কাছে কেউ চিঠি লেখে না। সারাক্ষণ মনমরা হয়ে ঘুরে ফেরে সে। একাকীত্ব ব্যাপারটা একদমই সহ্য হতো না ছেলেটার, নিজেকেই নিজে চিঠি লিখতো সে, তারপর কোন বন্ধুকে বলতো, চিঠিটা তার নাম আর স্কুলের ঠিকানায় পোস্ট করে দিতে, যাতে নিজেকে অন্তত স্বান্তনা দেয়া যায়, আপন বলে কেউ একজন আছে তার! 

স্কুলের বোর্ডিঙের খরচ চালানোর মতো অবস্থাও ছিল না, দুটো বিল্ডিঙের মালিক ছিলেন তার বাবা, কিন্ত ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে সেগুলো দখল করে নিয়েছিল ভাড়াটেরা, অনাথ ছেলেটা আর তার ছোট ভাইকে ঠকিয়েছিল নিষ্ঠুর কিছু মানুষ। ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়ে স্কুল ছাড়লেন, মেট্রিকুলেশন পরীক্ষাটাও দিলেন না। ফিল্ম সিটি বোম্বেতে তখন দুটো কাজে বেশ পয়সা আয় করা যায়, হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের গুন্ডা হয়ে যাও, নইলে ফিল্ম লাইনে চলে এসো।

সিনেমা দেখতে খুব পছন্দ করতেন, সিনেমায় নাম লেখানোর একটা চেষ্টা করবেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন। কিন্ত কে দেবে তাকে সুযোগ? চৌদ্দ পুরুষের কেউই তো সিনেমায় কাজ করেনি কখনও! অথচ টাকার ভীষণ দরকার, মায়ের চিকিৎসার জন্যে। কিছু একটা করতেই হবে! বেঁচে থাকার তাগিদে মুম্বাইয়ের রাস্তায় রাস্তায় লিপস্টিক আর নেইল পলিশ বিক্রি করে বেড়াতেন। বরিভেল্লি থেকে বান্দ্রা- রাস্তায় হেঁটে বেড়াতেন ঝোলা কাঁধে নিয়ে। এই এলাকাতেই ফিল্মস্টারদের ঝাঁ চকচকে সব বাংলো, রোমান্টিক গানের শুটিং হয় জুহু বীচের ধারে, মাঝেমধ্যে সামনে পড়লে হা হয়ে সেসব দেখে কিশোর ছেলেটা, বাবা মা যার নাম রেখেছিল আরশাদ।

এরমধ্যেই দুই বছর রোগে ভুগে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন আরশাদের মা, আপন বলতে ছোট ভাইটা ছাড়া দুনিয়ায় আর কেউ রইলো না তার।  মুম্বাইয়ের অন্যান্য ফেরীওয়ালাদের সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল তার, সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনীর পরে সবাই কোথাও বসে আড্ডা মারতো ওরা, কেউবা মদ গিলতো।

আরশাদ ওয়ার্সি

একটা টেপরেকর্ডারে বাজতো বলিউডি গান, সেগুলোর সঙ্গে কোমর দোলাতেন কিশোর আরশাদ। বলিউডের সাথে যোগসূত্রটা তৈরি হলো ১৯৮৭ সালে, একটা ফটো ল্যাবে পার্টটাইম কাজ করতেন, সেখান থেকে ছবি নিয়ে যেতেন মহেশ ভাটের অফিসে। অনেক অনুরোধ করে মহেশ ভাটের সহকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেলেন। ১৯৮৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'কাশ' আর 'ঠিকানা' সিনেমা দুটোয় অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে ছিলেন তিনি। দুই বছর বাদে 'আগ সে খেলেঙ্গে' নামের একটা সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড ড্যান্সার হিসেবে ক্যামেরায় চেহারাও দেখিয়ে ফেললেন তিনি, নায়ক নায়িকাদের পেছনে নাচতে থাকা শ-খানেক মানুষের একজন ছিলেন। 

নাচের প্রতি ভালোবাসাটা ছিল, নাচতে ভীষণ ভালো লাগতো তার। অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর হয়েও গানের কোরিওগ্রাফির সময় হাজির থাকতেন, এটা সেটা পরামর্শ দিতেন, এজন্যে ধমকও হজম করেছেন প্রচুর। আকবর সামী'র নাট্যদলে ভর্তি হয়ে গেলেন, মডার্ন ড্যান্স শেখার ইচ্ছেতে। সেই দলের হয়েই ১৯৯১ সালে অংশগ্রহণ করলেন ইন্ডিয়ান্স ড্যান্স চ্যাম্পিয়নশীপে, ছোটখাটো গড়নের ছেলেটা চ্যাম্পিয়নও হয়ে গেল সেই প্রতিযোগীতায়!

পরের বছর ভারতের প্রতিনিধি হয়ে গেলেন লন্ডনে, ওয়ার্ল্ড ড্যান্স চ্যাম্পিয়নশীপে অংশ নিতে। সেখানেও জ্যাজ ক্যাটাগরিতে চতুর্থ হলেন আরশাদ! ভারতে আসার পরে কয়েকটা সিনেমায় কোরিওগ্রাফি করার অফার এলো, শ্রীদেবী এবং অনিল কাপুর অভিনীত 'রূপ কি রানী চোরো কা রাজা' এদের মধ্যে একটি। তবে সিনেমাটা ফ্লপ হওয়ায় তিনি আলোচনায় এলেন না সেভাবে। 

এবার অভিনয়ের পালা। তবে অভিনয়টা কখনোই পছন্দের জায়গা ছিল না তার কাছে। অমিতাভ বচ্চনের স্ত্রী জয়া বচ্চনই তাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন সিনেমায় অভিনয়ের, সেই প্রস্তাব নিয়ে অনেকটা সময় ভেবেছেন তিনি, তারপরে হ্যাঁ বলেছেন। একটা অজানা ভয় কাজ করছিল মনের ভেতরে। অমিতাভ বচ্চনের প্রোডাকশন হাউজের প্রথম সিনেমা ছিল সেটা, নাম 'তেরে মেরে স্বপ্নে' সেখানেই অভিনেতা হিসেবে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন তিনি। প্রথম সিনেমায় অভিনয়ের জন্যে দারুণ প্রশংসা পেলেন, ভেবেছিলেন এবার বুঝি সংগ্রামের দিন শেষ হয়ে এলো। কিন্ত বাস্তবে হলো উল্টোটা, সংগ্রামের তখন শুরুই কেবল। তার মুখেই শোনা যাক সেই কষ্টের দিনগুলোর কথা- 

"প্রথম সিনেমাটা করার পরে সবাই খুব ভালো বলে পিঠ চাপড়ে দিয়েছিল। কিন্ত পরের দুই-তিনটে সিনেমা যখন বক্স অফিসে ভালো করতে পারলো না, তখন হুট করেই দেখলাম আমি বেকার হয়ে গেছি, আমার হাতে কোন কাজ নেই, কেউ আমার কাছে সিনেমার অফার নিয়ে আসছে না! তিনটে বছর আমার হাতে একটা সিনেমাও ছিল না, ফিল্মি দুনিয়ায় আমি ছিলাম পুরোপুরি বেকার একজন মানুষ। ভাগ্যিস আমার স্ত্রীর চাকুরী ছিল তখন, তাই না খেয়ে মরতে হয়নি। আমি তখন ভাবছিলাম আবার সেই লিপস্টিক-নেইলপলিশ বিক্রির ব্যবসায় ফিরে যাবো কিনা!" 

তাণ্ডব চালিয়ে একটা সময় ঝড় থেমে যায়, বৃষ্টি ঝরিয়ে আকাশের কালো মেঘগুলোও সরে যায়। মেঘ সরলো আরশাদের জীবন থেকেও, সাফল্যের ঘুড়ি হয়ে তার জীবনে উড়ে এলো 'মুন্নাভাই এমবিবিএস'! সঞ্জয় দত্তের সাথে সার্কিটরূপী আরশাদ ওয়ার্সির কেমিস্ট্রী বোধহয় বলিউডের তাবৎ জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকার জুটিকে ম্লান করে দিলো ক্ষণিকের জন্যে। রাজকুমার হিরানীর এই একটা সিনেমাই তাকে পরিচিতি এনে দিলো, খ্যাতি যোগ করলো নামের পাশে। আরশাদ ওয়ার্সি নামটা শুনলেই এখনও সবার আগে সার্কিটের চেহারাটাই চোখে ভাসে বেশীরভাগ মানুষের। 

সঞ্জয় দত্তের সাথে সার্কিটরূপী আরশাদ ওয়ার্সির কেমিস্ট্রি সিনেমাপ্রেমীদের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে

মুন্নাভাই এমবিবিএসের হাত ধরে খ্যাতি তো এলো, কিন্ত শাঁখের করাত হয়ে একটা অপকারও হয়ে গেল এতে। পরিচালকেরা আরশাদের কাছে অফার নিয়ে আসতে শুরু করলেন অপ্রধান চরিত্রের, নায়কের বন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করার প্রস্তাবের স্রোত আসা শুরু হলো। হালচাল থেকে শুরু করে গোলমাল, কিংবা সালাম নমস্তে থেকে চকলেট- তাকে মূল নায়ক বানাতে চাইলো না বেশীরভাগ পরিচালকই।

চেহারায় তার বিশেষ কিছু নেই, একদম আম আদমি টাইপের মুখাবয়ব। আলাদা স্টাইল নেই, সিক্স প্যাক অ্যাবস নেই, নেই লাখ লাখ ভক্তও। সিনেমার মূল নায়ক তিনি হলে তো সেই সিনেমা ফ্লপ- এমনটাই সবার ধারণা! এরমধ্যে মুন্নাভাইয়ের দ্বিতীয় কিস্তিতে অভিনয় করেছেন, এসেছে বলিউডের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় কমেডি সিনেমাগুলোর একটি- ধামাল। মানুষকে হাসাতে তার জুড়ি ছিল না, ধামালের সেই আদিকে দর্শক আজও ভুলতে পেরেছে কি? উত্তরটা 'না' ছাড়া আর কিছুই হবে না। 

'ইশকিয়া'তে তিনি একগুঁয়ে প্রেমিক, নাসিরউদ্দীন শাহ'র মতো মেথড অ্যাক্টরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে গেলেন পুরোটা সময়! জিলা গজিয়াবাদে ভয়ানক এক লুক নিয়ে হাজির হলেন, একদম অন্যরকম এক আরশাদ ওয়ার্সির দেখা মিললো সেখানে। তবে নিজের সেরা অভিনয়টা সম্ভবত জমিয়ে রেখেছিলেন নায়ক হিসেবে দেখানোর জন্যে। 

জলি এলএলবি নামের সিনেমাটা এলো ২০১৩ সালে, সামাজিক সমস্যা আর সংস্কার নিয়ে একটা মেসেজ দেয়ার মতো সিনেমা। নাচাগানা নেই তেমন একটা, নেই আইটেম নাম্বার। জগদীশ ত্যাগী, ওরফে জলি- জজকোর্টের এক উকিলের চরিত্রে কি প্রাণবন্ত অভিনয় তার! ছোট্ট শহর মিরাটের সেই একরোখা জেদী উকিল, শেষটা দেখে ছাড়ার প্রবল আগ্রহ যার! আপিলকে যিনি অ্যাপল লিখে রাখেন, প্রসিকিউশনকে প্রস্টিটিউশন লিখে জজের ধমক হজম করেন, কিন্ত অসহায় মানুষকে ন্যায়বিচার এনে দিতে যিনি বদ্ধপরিকর! 

জলি এলএলবি সিনেমায়

জলি এলএলবি সিনেমাটার সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল তার দুর্দান্ত অভিনয়ের। কিন্ত সেটার দ্বিতীয় কিস্তিতে জায়গা হয়নি তার। তৃতীয় কিস্তিতে অক্ষয়ের সঙ্গে আবার তিনি ফিরতে পারেন বলে গুজব শোনা যাচ্ছে। ২০২০ সালে মুক্তি পেয়েছে ওয়েব সিরিজ অসুর, দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন তাতেও। সিনেমা আসবে, সিনেমা যাবে, হাতে কাজ থাকবে অথবা থাকবে না- এর মাঝে নিজের করণীয়টা ঠিকঠাক করে যাবেন, এটাই আরশাদের পণ। তার মতে- 

"যে সিনেমায় আমি গুণ্ডার অভিনয় করি, আর আমার পেছনে আরও পাঁচটা ছেলে দাঁড়িয়ে থাকে, আমরা সবাই কিন্ত অভিনেতা। হয়তো আমার সংলাপ দু-চার লাইন বেশী, আমি ফুটেজটা বেশী পাচ্ছি। কিন্ত সুযোগ যেটুকুই পাওয়া যাক, সেটা কাজে লাগাতে হবে। যদি মেধা আর পরিশ্রম থাকে, সংলাপ ছাড়া দাঁড়িয়ে থেকেও আপনি অনেক কিছুই করতে পারেন। লোকে সেটা ভুলবে না। আর যদি না করতে পারেন, তাহলে আমার পেছনে ক'জন দাঁড়িয়েছিল, সেটাও লোকের মনে থাকবে না।" 

'হাম তুম অর ঘোস্ট' সিনেমাটা প্রযোজনা করে মোটামুটি দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিলেন একটা সময়ে, সেখান থেকে আবার ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। স্ত্রী মারিয়াকে নিয়ে সুখের সংসার, মারিয়া নিজেও কোরিওগ্রাফার। ১৯৯৯ সালে গাঁটছাড়া বেঁধেছিলেন দুজনে, জীবনের অনেকগুলো কঠিণ মূহুর্তে এই মহিলা শক্ত করে হাত ধরে ছিলে আরশাদের, সাহস যুগিয়েছেন তাকে। আরশাদের তখন কাজ ছিল না, পকেটে টাকা ছিল না, মারিয়ার আয়ে চলেছে সংসার, জ্বলেছে উনুন।চরিত্রাভিনেতা তিনি, সুপারস্টার তো নন। জীবনের সঙ্গে অজস্র লড়াই-সংগ্রাম করে আজকের এই জায়গাটায় এসে দাঁড়িয়েছেন।

বলিউড যে তাকে খুব মূল্যায়ন করেছে, এমনটাও নয়। মুন্নাভাই এমবিবিএসে সার্কিটের মতো চরিত্রে অভিনয় করেও ফিল্মফেয়ার মেলেনি, লাগে রাহো মুন্নাভাইতে সেটা তিনি পেয়েছেন, শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা হিসেবে। ইশকিয়ার জন্যেও সাপোর্টিং অ্যাক্টরের পুরস্কার পাননি, জলি এলএলবিতে সিরিয়াস ক্যারেক্টার করার পরেও আইআইএফএ- তে কমিক রোলে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন তিনি! হাস্যকর চরিত্রে বেশী পারদর্শী হওয়ায় বলিউড তাকে কমেডিয়ানের বেশী সম্মান দিতে চায়নি হয়তো। তবে দর্শকেরা তাকে ভালোবেসেছেন, ওই এক সার্কিটের চরিত্র দিয়েই মানুষের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন আরশাদ ওয়ার্সি।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা