ট্রেলার দেখে 'আতরাঙ্গি রে'র গল্প যতটুকু বোঝা গেলো, সে গল্প উপমহাদেশের দর্শকের কাছে খুবই পরিচিত। একই প্যাটার্ণের গল্পে উপমহাদেশে এর আগে অগুনতি সিনেমাও হয়েছে। একঘেয়ে গল্প, জাঁকালো আলোকসজ্জা, কিছু শ্রুতিমধুর গান আর টিপিক্যাল কমেডি-সাসপেন্স... বহুপরিচিত এক আবর্তেই যেন আটকে রইলো এ সিনেমা!

নির্মাতা আনন্দ এল রায়ের মুক্তির অপেক্ষায় থাকা নবতম নির্মাণ 'আতরাঙ্গি রে'র ট্রেলার দেখে প্রথমেই মনে এলো বহু পুরোনো সেই প্রবাদবাক্য- নতুন বোতলে পুরোনো মদ। চকচকে সব তারকায় ঠাসা 'জিরো' সিনেমার ভরাডুবির পরে ভদ্রলোক এমনিতেই বিস্তর চাপে ছিলেন। সে চাপ থেকে মুক্তির জন্যে তিনি যে 'আতরাঙ্গি রে'তে সওয়ার হলেন, সেটি শেষপর্যন্ত আরেক বিপর্যয়ের মুখোমুখি করে কী না, সে নিয়ে চাইলে খানিকটা গবেষণা করতেই পারেন যে কেউ। যদিও ট্রেলার দেখে পুরোদমেই মনে হচ্ছে, এ নির্মাণ নিয়েও ভয় পাওয়ার উপকরণ আছে বিস্তর। 

ট্রেলার দেখে 'আতরাঙ্গি রে'র গল্প যতটুকু বোঝা গেলো, সে গল্প উপমহাদেশের দর্শকের কাছে খুবই পরিচিত। একই প্যাটার্ণের গল্পে উপমহাদেশে এর আগে অগুনতি সিনেমাও হয়েছে। আদ্যিকালের সেই সূত্র মেনে এ সিনেমার গল্প শুরু হয় কোনো এক মফস্বল এলাকার চটপটে মেয়ে রিঙ্কুকে দিয়ে, যার হুট করে 'বিষ্ণু' নামের একজনের সাথে হয়ে যায় বিয়ে। বিষ্ণু, রিঙ্কুকে পছন্দ করে না। রিঙ্কুও বিষ্ণুকে পছন্দ করে না। দুজনে মিলে তাই সিদ্ধান্ত নেয়, বিয়ের পরে দিল্লী গিয়ে দুইজন হয়ে যাবে আলাদা, চলে যাবে যে যার রাস্তায়। যদিও পরবর্তীতে তাদের আর ভিন্ন রাস্তায় যাওয়া হয় না। ক্রমশ বিষ্ণু আর রিঙ্কুর মধ্যবর্তী সম্পর্ক গাঢ় হয়। দুইজনেই দুজনের প্রেমে পড়ে। সম্পর্ক জমাট হয়। 

ঠিক এইসময়েই গল্পে আসে টুইস্ট। দৃশ্যপটে হাজির হয় সাজাদ নামের একজন। যার সাথে রিঙ্কুর আগে থেকেই ছিলো প্রণয়। সেই সাজাদ হাজির হয় বিষ্ণু ও রিঙ্কুর মাঝখানে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতিতে রিঙ্কু পড়ে বিস্তর দোটানায়। একদিকে সে সাজাদকে ভালোবাসে, অন্যদিকে বিষ্ণুকেও অল্প অল্প ভালোবাসতে শুরু করেছে সে। রিঙ্কু কাউকেই ছাড়তে চায় না। দুজনকেই রাখতে চায় সাথে। ক্রমশই গল্পে আসে ক্রাইসিস। সাসপেন্স। 

বিষ্ণু-রিঙ্কুর সম্পর্কের মাঝখানেই দৃশ্যপটে আসে সাজাদ! 

মোটাদাগে গল্প এটাই। কিন্তু এই যদি হয় গল্পের নমুনা, তাহলে সে গল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান হবার যথেষ্ট কারণ যে আছে, তা যে কেউই বুঝবেন। বহুবার বহুরকমভাবে ট্রেলার দেখেও এ গল্পের নতুনত্ব ঠিক কোথায়, তা বিন্দুমাত্রও বোঝা গেলো না। সেট ডিজাইন, কালার গ্রেডিং কিংবা এ আর রহমানের মিউজিক কম্পোজিশন... সবই হয়তো ভালো। কিন্তু মেইন কোর্স ভালো না হলে সালাদ আর ডেজার্ট দিয়ে পেট কতক্ষণ ভরবে, সেটাও বেশ বড়সড় এক প্রশ্ন! তাছাড়া, 'রোমান্টিক কমেডি' জনরার গল্পে চাইলে অজস্র সব সাসপেন্স, এলিমেন্টস যোগ করা যায়। বেশিদূরে যেতে হবেনা, কোরিয়ান ইন্ডাস্ট্রির 'রমকম' দেখলেই তো বুঝতে পারার কথা, চাইলে প্রেমের গল্পেও কিভাবে আনা যেতে পারে নতুনত্ব। সেদিক বিবেচনায় ট্রেলার দেখে বিস্তর হতাশই হলাম।

আনন্দ এল রায়ের সিনেমার এই প্যাটার্ন খুব কমন, তার সিনেমার অধিকাংশ নায়িকারাই মফস্বল শহরের মারদাঙ্গা মেয়ে হয়। এ প্রসঙ্গে 'তানু ওয়েডস মানু' কিংবা 'তানু ওয়েডস মানু রিটার্নস' এর কথা বলা যেতে পারে সর্বাগ্রে। এবং তার সিনেমায় মফস্বল থেকে উঠে আসা নায়িকার পোর্ট্রেয়ালও বেশ দারুণ হয়। সেই একই প্যাটার্ন দ্রষ্টব্য এই সিনেমার ক্ষেত্রেও। 'আতরাঙ্গি রে'র সারা আলী খান (রিঙ্কু) মফস্বলের চটপটে এক চরিত্র। পানশালায় মদের বোতল ভাংচুর করতে করতে করতে নিজের গোত্র-পরিচয় দিতে যে সিদ্ধহস্ত। যদিও 'রিঙ্কু' চরিত্রটি খুব কনভিন্সিং অভিনয় যে করলো, ট্রেলার দেখে তেমনটি বলা গেলো না মোটেও। সে সাথে প্রশ্নও এলো মাথায়, এ চরিত্রটিকে এরকম টিপিক্যাল না রেখে চাইলে কি আরেকটু আনঅর্থোডক্স করা যেতো না? 

অক্ষয়, ধানুশ, সারা'তে সওয়ার হয়ে কি উতরোবে এ সিনেমা? 

আসুরান, কার্নান, জাগামে ঠাণ্ডিরাম...সিনেমাগুলোর বরাতে সুপারস্টার ধানুশ দুর্দান্ত ফর্মে আছেন এখন। তাকেও নেয়া হলো এ সিনেমায়। অবশ্য ধানুশ-আনন্দ জুটির কেমেস্ট্রি বরাবরই বেশ ভালো। এই যুগলের আগের নির্মাণ 'রানঝানা' নিয়ে কথা হয় আজও। ধানুশকে এনে তাই পুরোনো সম্পর্ক ঝালাইয়ের এই সমীকরণ ভালো লাগলো। ওদিকে বলিউডের অভিনেতাদের মধ্যে যার বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে, তিনি অক্ষয় কুমার। 'সূর্যবংশী' হল কাঁপাচ্ছে। সে সাথে প্রত্যেক মাসেই মুক্তি পাচ্ছে অক্ষয়ের একেকটি সিনেমা। সেই সুপারস্টার অক্ষয়কুমারও আছেন এ নির্মাণে। অক্ষয়, ধানুশ, সারা আলী খান...তারকার অভাব নেই 'আতরাঙ্গি রে' তে। অভাব ছিলো না 'জিরো'তেও। তবু 'জিরো' ফ্লপ। 'আতরাঙ্গি রে' কী করবে, তা সময়ই বলবে। 

তবে একটা বিষয় খুব বিরক্তির। কমার্শিয়াল সিনেমা হলেই কেন গল্পকে বস্তাপঁচা বানাতে হবে? সুন্দর কিছু গান, সিচুয়েশনাল কমেডি, শেষে এসে সাসপেন্স এবং আবেগের অত্যাচার... বলিউডের এই টিপিক্যাল কমার্শিয়াল ভেন্ডিং মেশিনে পিষ্ট হয়ে যে তরল বের হয় প্রতিবার, সেখানে না থাকে গল্প, না থাকে এন্টারটেইনমেন্ট। পুরোটাই হয় বিস্বাদ এক পানীয়। 'আতরাঙ্গি রে'র শেষে এসে এরকম আক্ষেপ না থাকুক। ট্রেলারের একেবারে শেষে এসে রিঙ্কুর বলা 'ব্লান্ডার হো গায়া হামসে'র সেই ব্লান্ডার সিনেমার সাথেও না ঘটুক। তাহলেই বাঁচোয়া। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা