বলা হচ্ছে, এই নাটকের জনরা 'থ্রিলার।' কিন্তু নাটকটিকে 'থ্রিলার' হিসেবে না বিবেচনা করে 'সামাজিক গল্প' হিসেবে বিবেচনা করাই প্রাসঙ্গিক। হয়তো বাস্তবে নাটকের গল্পের মতন এমনটা হয় না। কিন্তু যদি হতো, তাহলে কেমন হতো, সে আগ্রহ থেকেই গৌতম কৈরীর এ নির্মাণটি দেখা যেতে পারে...

জাপানে বলা হয়ে থাকে, একজন মানুষের তিনটি মুখোশ থাকে৷ একটি মুখোশ সে বাইরের মানুষদের দেখায়। আরেকটি মুখোশ সে রাখে কাছের মানুষদের জন্যে। তৃতীয় অর্থাৎ সর্বশেষ যে মুখোশ, সেটি সে সযত্নে আগলায় নিজের জন্যে। অর্থাৎ, তৃতীয় মুখোশটি সে ব্যক্তির একান্তই নিজস্ব মুখোশ।

এই তিনশ্রেনীর মুখোশ বাদ দিলেও আমাদের চারপাশে আরো নানারকম মুখোশ দেখেছি আমরা। ব্যাটম্যানের মুখোশ দেখেছি, দেখেছি ফ্যান্টমের মুখোশও। স্পাইডারম্যান কিংবা ওদেশের 'কৃষ'এরও মুখোশ আছে। কিংবা হালের 'লা কাসা দে পাপেল' এর ডাকাতদেরও আছে চকমকে মুখোশ। ব্যক্তিগত মালিকানার মুখোশ ছিলো আমাদেরও। ছোটবেলায় মেলায় গেলে আমরা আর কিছু কিনতাম বা না, মুখোশ কিনতাম সবার আগে। হরেক রকম মুখোশ। দত্যিদানো-ভূতপ্রেতের মুখোশ, বাঘ-সিংহের মুখোশ। খুব সহজলভ্য এবং নিমেষেই পালটে ফেলা মুখের আদল...এই দুই কারণই ছিলো আমাদের মুখোশপ্রেমের অন্যতম প্রধান প্রভাবক। 

আমাদের মুখোশ ও সুপারহিরোদের মুখোশের মধ্যে ভীষণ বৈপরীত্যও ছিলো। তারা মুখোশ পরতেন মানুষকে সাহায্য করার নিমিত্তে। অথচ ডেঁপো আমরা মুখোশ পরে নিরন্তর দৌরাত্ম্য করতাম৷ দৌরাত্ম্যের প্রকোপে অধর্মের মাত্রা যখন চরম উঠতো, একদিন টুপ করে মুখোশের পেছনের সুতো ছিঁড়তো, টিকটিকির লেজের মতন খসে পড়তো মুখের নকল আদল। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া সেই একাকী মুখোশকে আমরা ভুলে যেতাম খুব তাড়াতাড়ি। ভুলতাম সে সাময়িক অবয়বকেও। 

মুখোশ নিয়ে এত প্রলাপ বকার পেছনের কারণে ফিরি এবার। গতকাল 'চরকি'তে আসা 'বাঘের বাচ্চা' নাটক দেখার পরেই শৈশবের 'মুখোশ' চলে এলো স্মৃতিপটে। এই নাটকের অধিকাংশ কুশীলবই নাটকের সিংহভাগ সময়ে মুখে সেঁটে রইলেন বাঘের মুখোশ। যে মুখোশ ক্ষণেক্ষণে বৈশাখীমেলার মুখোশকেই মনে করালো। বুঝলাম,  'মুখোশ' এ নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র। এবং দিনশেষে এ অভ্রান্ত ধারণা নিয়েই সমাপ্ত করলাম নাটক। 

এই গল্পের প্রোটাগনিস্ট- মুখোশ! 

'বাঘের বাচ্চা'র গল্প জটিল কিছু না। গল্পের প্রেক্ষাপট এক মফস্বল শহর, যেখানে অত্যাচারী শাসক আছে, আছে নিগৃহীত শোষিতেরাও। সেই গ্রামে একদিন আবির্ভাব হয় একদল ডাকাতের, যারা নিজেদের পরিচয় দেয় 'বাঘের বাচ্চা' নামে। বিশেষ এক ধরণের পোশাক এবং মুখে বাঘাকৃতির বিশেষ মুখোশ...এটাই তাদের মূখ্য অঙ্গসজ্জা।

মানুষজন তাদেরকে 'রবিনহুড'ও ডাকে। 'রবিনহুড' ডাকার কারণ তারা অত্যাচারীদের থেকে ধনরত্ন লুটপাট করে এনে তুলে দেয় তৃণমূল মানুষের হাতে। এভাবেই চলছিলো। দুষ্টের দমন করতে করতে একদিন তারা আক্রমণ চালায় সেই মফস্বলের অত্যাচারীদের শিরোমণি চেয়ারম্যানের বাড়িতে। এবং সেখান আক্রমণের পর থেকেই নাটকের গল্প নানা দিকে ইতস্তত ঘুরতে থাকে। বানের জলের মতন গল্পের স্রোত ঢুকতে থাকে অপ্রত্যাশিত সব সড়কে। 

লীলা মজুমদারের গল্প আমরা যারা পড়েছি, তারা জানি, প্রখ্যাত এই লেখকের গল্পগুলোর প্রধানতম বৈশিষ্ট্য, গল্প শুরু হয় মাঝখান থেকে। আচমকা এক ঘটনা দিয়ে শুরু হয় ভূমিকা, এবং সেই ঘটনার ডালপালা ক্রমশই প্রসারিত হতে হতে গল্পের চরিত্রগুলোর ঠিকুজিকোষ্ঠী খোলাসা হয়। গল্প বলার বিশেষ এ ভঙ্গি লক্ষ্য করি 'বাঘের বাচ্চা' নাটকের ক্ষেত্রেও। ঘটনার ঘনঘটার মাঝখান দিয়ে শুরু হওয়া গল্পে ক্রমশ আসে প্লট, সাবপ্লট, টুইস্ট, সাসপেন্স।

তবে শেষদিকের যে চমক, তা খুবই নিরীহ গোছের। একটু সতর্ক দর্শক হলেই ধরতে পারা যাবে তা। মাত্র উনত্রিশ মিনিটের জীবনকাল হওয়ায়, নাটকের চরিত্রগুলোর বিকাশও অতটা সন্তুষ্টির না। ফলাফলে, গল্পটাও খুব একটা খোলতাই না। তবে যা হলো, সেটিকে ঠিক 'অন্তরে অতৃপ্তি রবে'গোছের বাক্যবাণেও জর্জরিত করা ঠিক হবে না। বরং বলা যেতে পারে, যা হয়েছে মন্দ না। তবে আরেকটু বেশি হলে বেশ হতো।

'বাঘের বাচ্চা'য় কুশীলব তালিকায় বাঘা বাঘা মানুষজনই ছিলেন। বাংলা নাটকের শক্তিমান অভিনেতা শহিদুজ্জামান সেলিম ছিলেন। ছিলেন তরুণ অভিনেতা খায়রুল বাসার। আরো ছিলেন দীপক সুমন, জাহাঙ্গীর আলম সহ অনেকেই। তাদের অভিনয় মন্দ না। চলনসই। অনবদ্য, দুর্দান্ত, তুখোড় বলার সুযোগ নেই। তবে যতটুকু যা করেছেন সবাই ছিমছাম, প্রাসঙ্গিক।

সাবলীল ছিলেন শহিদুজ্জামান সেলিম! 

বলা হচ্ছে, এই নাটকের জনরা 'থ্রিলার।' কিন্তু নাটকটিকে 'থ্রিলার' হিসেবে না বিবেচনা করে 'সামাজিক গল্প' হিসেবে বিবেচনা করাই প্রাসঙ্গিক। হয়তো বাস্তবে নাটকের গল্পের মতন এমনটা হয় না। কিন্তু যদি হতো, তাহলে কেমন হতো, সে আগ্রহ থেকেই গৌতম কৈরীর এ নির্মাণটি দেখা যেতে পারে। কাহিনীর বয়ানে হয়তো নতুনত্ব খুব একটা নেই। তবে আছে সুন্দর এক গল্প। এবং সে গল্পের পরিশীলিত উপস্থাপন। সেটুকুর জন্যে হলেও 'বাঘের বাচ্চা' সার্থক। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা