বলিউডে গত দুই দশকের জনপ্রিয় পরিচালকের নাম আসলে তার নাম প্রথম সারিতেই থাকবে। ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে পরিণত করছেন ইতিহাসের সেরা নির্মাতাদের তালিকায়।

ক্যারিয়ারে যেমন 'ব্ল্যাক' বানিয়েছেন, তেমন 'দেবদাস' এ নিজেকে করেছেন পরীক্ষিত। তারকারা উনার ছবিতে অভিনয় করার জন্য মুখিয়ে থাকেন, পরীক্ষিত অভিনয়, ঝাঁকঝমক সেট, জনপ্রিয় সব গান, নৃত্য নৈপুণ্য, চিত্রনাট্যের সুদক্ষতা, হৃদয়গ্রাহী সংলাপ, নির্মাণশৈলী মুগ্ধতা সব মিলিয়ে যেন পরিপূর্ণ সিনেমা। তিনি সমালোচক থেকে দর্শকদের অতি প্রিয় নির্মাতা 'সঞ্জয়লীলা বানসালি'।

স্বনামধন্য পরিচালক বিধু বিনোদ চোপড়ার সহকারী পরিচালক হয়ে পারিন্দা, ১৯৪২: এ লাভ স্টোরিতে কাজ করার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু করে। এরপর ১৯৯৬ সালে আসেন বলিউডের পর্দায় পরিচালক হয়ে। নানা পাটেকর, সালমান খান, মনিষা কৈরালা নিয়ে নির্মাণ করেন "খামোসি: দ্য মিউজিক্যাল"। ব্যবসায়িকভাবে সফলতা না পেলেও বেশ প্রশংসিত হয়। নানা পাটেকর ও মনিষা কৈরালার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সিনেমাটি জাতীয় পুরস্কারসহ বেশ কিছু পুরস্কার অর্জন করে।

সঞ্জয় লীলা বানসালির সিনেমা মানেই জমকালো সেট, নাচ, রাজকীয় পোশাক। এই ধারণা শুরু হয় মূলত ১৯৯৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা 'হাম দিল দে চুকে সানম' দিয়ে। মৈত্রেয়ী দেবীর উপন্যাস ন হন্যতে অবলম্বনে এটি নির্মাণ করেন সঞ্জয়লীলা বানসালি। সালমান খান, অজয় দেবগন, ঐশ্বরিয়া রাই অভিনীত এই ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে বেশ সফলতা লাভ করে। ত্রিভুজ প্রেমের এই সিনেমাটি বলিউডে রোমান্টিক সিনেমা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। সালমান খান, ঐশ্বরিয়া রাইয়ের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সিনেমাটি সেই বছর জাতীয় পুরস্কার, ফিল্মফেয়ার পুরস্কার সব পুরস্কারের আসরেই জয়জয়কার ছিল। জনপ্রিয় এই সিনেমাটি হলিউডে 'হার্ট স্ট্রেইট' নামে মুক্তি পায়।

অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে সঞ্জয়লীলা বানসালি নির্মাণ করেন সেই সময়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র 'দেবদাস'। এটি ছিল এই উপন্যাস নিয়ে বলিউডের তৃতীয় নির্মাণ, এবং প্রথম রঙ্গীন সংস্করণ। নাম ভূমিকায় শাহরুখ খানের পাশাপাশি বলিউডের অন্যতম দুই নায়িকা মাধুরী দিক্ষিত ও ঐশ্বরিয়া রাই। নৃত্যপটীয়সী এই দুই নায়িকাকে প্রথমবারের মত এক চলচ্চিত্রে দেখা যায়, এবং একটি গানের নৃত্যে অংশগ্রহণ করে আলোচনা সৃষ্টি করে, যদিও এজন্য মূল গল্প থেকে চিত্রনাট্যে কিছু পরিবর্তন হয়েছিল। নজরকাড়া পোশাক, সাজসজ্জা, চিত্রনাট্য, সংগীত, সংলাপ, সেট আরো আনুষাঙ্গিক জিনিসসহ পরিচালক খুব সুনিপুণভাবে তুলে ধরেন। বছরের সর্বোচ্চ ব্যবসাসফল এই ছবিটি সেরা জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্রসহ বেশ কিছু শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে নেয়। এছাড়া ফিল্মফেয়ারসহ সব কয়টি পুরস্কারের আসরে ছবিটির জয়জয়কার ছিল। হিন্দি ছাড়াও ছয়টি ভাষায় মুক্তি দেয়া এই ছবিটি ভারতের হয়ে অস্কারে প্রতিনিধিত্ব করে।

বলিউডের শাহেনশাহ খ্যাত অমিতাভ বচ্চনের দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ক্যারিয়ারে সেরা পাঁচ চলচ্চিত্রের তালিকা করলে যে ছবিটি অবশ্যই থাকবে সেটি হচ্ছে 'ব্ল্যাক'। সঞ্জয়লীলা বানসালির পরিচালনায় ছবিটি মুক্তি পায় ২০০৫ সালে। এই ছবিতে অমিতাভ বচ্চনের বিপরীতে ছিলেন রানী মূর্খাজি। এটি তার ক্যারিয়ারের সেরা চলচ্চিত্র। বছরের অন্যতম জনপ্রিয় এই ছবিটি জাতীয় পুরস্কার ফিল্মফেয়ারসহ সব পুরস্কারের আসরেই সেরা চলচ্চিত্রসহ একাধিক পুরস্কার লাভ করে। অমিতাভ বচ্চন এক যুগেরও বেশি সময় পর জাতীয় পুরস্কার ঘরে তোলেন। এই ছবিটিকে সমালোচকরা সঞ্জয়লীলা বানসালির সেরা ছবি হিসেবে মনে করেন।

সঞ্জয়লীলা বানসালি ২০০৭ সালে দুই নতুন মুখ রনবীর কাপুর ও সোনম কাপুর নিয়ে নির্মাণ করেন 'সাওয়ারিয়া'। যারা আজ বলিউডে সুপ্রতিষ্ঠিত। এছাড়া এই ছবিতে ছিলেন সালমান খান ও রানী মূর্খ্যাজি। গান জনপ্রিয় হলেও ছবিটিকে ব্যবসায়িকভাবে সফল হতে ব্যর্থ হয়। ফিল্মফেয়ারসহ বেশ কিছু পুরস্কারের আসরে ছবিটি পুরস্কৃত হয়।

হৃত্বিক রোশান ও ঐশ্বরিয়া রাই নিয়ে ২০১০ সালে সঞ্জয়লীলা বানসালি নির্মাণ করেন অসাধারণ সিনেমা 'গুজারিশ'। ব্যবসায়িকভাবে ফ্লপ হলেও সমালোচকদের পাশাপাশি ধীরে ধীরে দর্শকদের কাছেও প্রিয় হয়ে উঠে। হৃত্বিক রোশান ও ঐশ্বরিয়া রাইয়ের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সিনেমা এটি।

রামলীলা

রনবীর সিং ও দিপীকা পাড়ুকোন নিয়ে ২০১৩ সালে নির্মাণ করেন 'গলিয়ো কি রাসলীলা: রামলীলা'। এটি ছিল মূলত শেক্সপিয়রের অমর উপন্যাস রোমিও এন্ড জুলিয়েট অবলম্বনে। টানা দুইটি ফ্লপের পর এবার তিনি সফল।প্রথমবারের মত ১০০ কোটির ক্লাবে যোগ দেন সঞ্জয়লীলা বানসালি। জাতীয় পুরস্কার বাদে ফিল্মফেয়ারসহ সব পুরস্কারের আসরেই একাধিক শাখায় পুরস্কার অর্জন করে ছবিটি।

প্রেমকাহিনী নির্ভর সিনেমা তৈরিতে সঞ্জয়লীলা বানসালি সব সময়ই দক্ষতার প্রমাণ দেন। তারই সর্বশেষ প্রমাণ 'বাজিরাও মাস্তানি'। রনবীর সিং, দীপিকা পাড়ুকোন, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া নিয়ে নির্মিত এই ছবিটি মুক্তি পায় ২০১৫ সালে। বছরের অন্যতম জনপ্রিয় এই ছবিটি জাতীয় পুরস্কার, ফিল্মফেয়ার সব পুরস্কারের আসরেই জয়জয়কার ছিল এই ছবিটি। এর আগে ফিল্মফেয়ারে চারবার পরিচালক হিসেবে পুরস্কৃত হলেও এই ছবি দিয়ে প্রথমবারের মত জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন সঞ্জয় লীলা বানসালি। দীপিকা ও রনবীরের ক্যারিয়ারে এই ছবিটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

রাজস্থানের জয়পুরের রাজপুতানিদের কাব্য নিয়ে ইতিহাসনির্ভর ছবি 'পদ্মাবত' মুক্তি পেয়েছে গত বছর। নাম ভূমিকায় দীপিকা পাড়ুকোনের সাথে আছেন শহীদ কাপুর ও রনবীর সিং। ছবিটি দর্শকমহলে তুমুল সাড়া জাগিয়েছে, পেয়েছেন প্রশংসাও। তবে মুক্তির আগে তাকে পেরোতে হয়েছিল অনেক বাধা বিপত্তি, এমনকি মৃত্যুর হুমকিও। তবে সব কিছু ছাপিয়ে বছরের অন্যতম বক্স অফিস জয় করা ছবির তালিকায় নাম লিখেছে। রনবীর সিং এর অভিনয় ও সংগীত বিভাগ ছবিটিকে অনন্য করেছে। সংগীত পরিচালক হিসেবেও তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন যে কতটা প্রতিভাবান তিনি। শেষ তিনটি সিনেমার জনপ্রিয় গানগুলো তিনিই সুর সৃষ্টি করেছেন, উনার সাথে অরিজিৎ সিং এর জুটি হয়ে উঠে মনিকাঞ্চন যোগ। দুইজনই 'পদ্মাবত'র জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন।

পদ্মাবত

সালমান খানের সাথে ইনশাল্লাহ করার কথা থাকলেও এটি আপাতত স্থগিত রয়েছে, তবে এই ছবির নায়িকা আলিয়া ভাটকে নিয়ে বানাচ্ছেন গাঙ্গুবাঈয়ের বায়োপিক, যা এখনই দাঁড়িয়েছে আকাঙ্ক্ষিত ছবির তালিকায়। শোনা যাচ্ছে 'বিজু বাওরা' তিনি রিমেক করছেন, আজকের সময়ে এসে এই সিনেমা উনার চেয়ে ভালো রিমেক আর কেউ বানাতে পারবে না। এছাড়া অপেক্ষায় থাকবো শাহরুখ, ঐশ্বরিয়া, হৃত্বিকদের সাথে আবার উনার জুটি দেখার জন্য।

শুধু পরিচালক হিসেবে নয়, প্রযোজক হিসেবেও বেশ সফল সঞ্জয়লীলা বানসালি। নিজের পরিচালিত ছবিগুলো ছাড়াও রাউডি রাথোড, মেরি কম, গাব্বার ইজ ব্যাকের মত ব্যবসাসফল ছবির প্রযোজক তিনি। টেলিভিশন জগতে নির্মাণ করেন 'সরস্বতীচন্দ্র' এর মত জনপ্রিয় সিরিয়াল।

১৯৫৪ সালের ২৪ শে ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহন করা এই পরিচালক পার করেছেন ৬৭টি বসন্ত। শুভকামনা রইলো। প্রিয় পরিচালকের প্রতি, ভবিষ্যতে নিজেকে আরো পরীক্ষিত করবেন এই আশা রাখি।

শুভ জন্মদিন, সঞ্জয় লীলা বানশালী!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা