এসব শর্টফিল্মের কোনোটিরই ব্যাপ্তি পনেরো মিনিটের বেশি নয়৷ অথচ চিন্তার গভীরতায় এরা প্রত্যেকেই অতলস্পর্শী। এরা হৃদয়ের অন্দরমহলে ঢুকে এমন দাগ কাটে, যা অমোচনীয় হয়েই থেকে যায় বরাবর...

যতই দিন গড়াচ্ছে, আমাদের ধৈর্যশক্তি ঠিক ততই কমছে। প্রযুক্তির দ্রুততা, উৎকর্ষতার সাথে সাথে আমাদের ক্লেশ কমছে, আমরা আরো বেশি শ্রমবিমুখ হয়ে উঠছি। যার রেশ আজকাল পড়ছে শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রেও। ভারী বই দেখলে আঁতকে উঠছি অনেকেই,  পড়ে কুলিয়ে উঠতে পারছি না৷ নাতিদীর্ঘ বই চাচ্ছি। সিনেমার ক্ষেত্রেও একই সংকট। বিগত বছরগুলোর কমপক্ষে তিন ঘন্টা ব্যপ্তির একেকটা সিনেমা আজকাল নেমে আসছে দেড় ঘন্টার সংক্ষিপ্ত কলেবরে। শর্টকাট, ক্রাশকোর্স, কিটো ডায়েট, কুইক ট্যাকটিক্স...সহজ ও সংক্ষেপে ভরে যাচ্ছে আশপাশ। 

আজকাল তাই লেখক বা নির্মাতারাও পাঁয়তারা করেন, অল্পের মধ্যে কিভাবে দর্শককে/পাঠককে আটকে ফেলা যায় নির্মাণের মধ্যে। কাজটা কঠিন, তবে অসম্ভব যে নয়, সেটাই দেখতে পাই সাম্প্রতিককালের বিভিন্ন, বিচিত্র কাজে৷ এই যেমন শর্ট অ্যানিমেটেড ফিল্মগুলোর কথাই বলা যাক না কেন৷ চার-পাঁচ-দশ মিনিটের একেকটা অ্যানিমেশন ফিল্ম, অথচ চিন্তার গভীরে ঢুকে বেশ বড়সড় এক গাছ হয়ে গ্যাট হয়ে বসে থাকে তারা। 

সেরকমই পাঁচটি অ্যানিমেটেড শর্টফিল্ম নিয়ে কথা আজ। 

1. If anything happens, I love you

যারা সিনেমা-দুনিয়ার খোঁজ-খবর রাখেন এবং বিশেষ করে অস্কারের পাঁড়-ভক্ত, তাদের কাছে এই শর্টফিল্মের নাম অজানা হওয়ার কথা না। এ বছরে 'বেস্ট অ্যানিমেটেড শর্ট ফিল্ম' ক্যাটাগরিতে অস্কার জিতেছে এই দুর্দান্ত ফিল্মটি। টুডি অ্যানিমেশনে বারো মিনিটের এই শর্টফিল্মের জার্নির অধিকাংশ অংশই বিষাদগ্রস্ত এক উপন্যাস! 

If anything happens, I love You

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে কিভাবে সময় পার করছে সেই সন্তানের বাবা-মা, তা নিয়েই পুরো গল্প। আমাদের গল্প উপন্যাসে অধিকাংশ সময়েই আমরা দেখেছি, দৃষ্টি রাখা হয় তাদের উপরে, যারা মারা যায় অথবা যাবে। কিন্তু এই যে মানুষগুলো মারা যাচ্ছে, তাদের শূন্যস্থান আঁকড়ে ধরে তাদের প্রিয়জনেরা কিভাবে বেঁচে থাকছে, সে ক্লান্তিকর যাত্রাটা উঠে আসেনা অনেক সময়েই। ঠিক সেখানেই এই শর্টফিল্ম ছড়ি ঘোরায়। 

আর এ শর্টফিল্মের অন্তরালে ছিলো এক বাস্তব ঘটনার আধিপত্যও। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, ন্যারেশন স্টাইল এবং ডেকোরেশনের কমপ্লিট প্যাকেজে মুগ্ধ হয়েছি। বেশ কয়েকবার দেখেছি একটানা। প্রতিবারেই একেকটা নতুন বিষয় আবিষ্কার করেছি। 

2. Float

এই অ্যানিমেশন ফিল্মের শুরুতেই এক বাবাকে আমরা দেখি, যিনি তার শিশুসন্তানকে নিয়ে খেলছেন। ভেবেছিলাম, অপত্যস্নেহের আধিপত্যে খুব সহজ-স্বাভাবিক এক গল্পই শুরু হচ্ছে বোধহয়। কিন্তু সে ভুল ভাঙ্গে খুব তাড়াতাড়িই। দেখতে পাই, বাবার সাথে খেলতে খেলতে হঠাৎ করেই সেই শিশু ওড়া শুরু করলো। মনুষ্যশিশু উড়তে শুরু করেছে, এটা মেনে নেওয়ার জন্যে কেই বা প্রস্তুত ছিলো কবে? ফলে যা হওয়ার তাই, মানুষজন ভয় পেতে শুরু করলো শিশুটিকে।

Float

শিশুটির বাবা চাইলেন, তার ছেলের এক স্বাভাবিক জীবন হোক। তিনি ছেলের এই ক্ষমতাকে লুকিয়ে রাখতে লাগলেন মনুষ্যসমাজের চোখের আড়ালে। কিন্তু তাও একদিন আবার সেই ছেলেটি ওড়া শুরু করলো। এরপর?

দারুণ এক কনসেপ্ট। তার চেয়েও বেশি দারুণ ভেতরের ভাবনা। কেউ একটু অন্যরকম হলেই আমরা যে তাকে নানাভাবে দমিয়ে, আটকে, লুকিয়ে রেখে তথাকথিত সমাজের সাথে আপোষ করার চেষ্টা করি, সেই দিকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে ভুল ধরিয়ে দিয়েছে এই শর্টফিল্ম, হেট করে দিয়েছে আমাদের চিরউন্নত শির। মাস্ট ওয়াচ। 

3. Umbrella

হলুদ ছাতা, এতিমখানা, বাবার সাথে ছেলে, দারুণ সুন্দর এক প্রেমের উপাখ্যান...ভাবছেন, এইসব খাপছাড়া কথার অর্থ কী? কথাগুলো বিক্ষিপ্তভাবে পড়তে হয়তো খাপছাড়া লাগছে৷ কিন্তু আট মিনিটের এই শর্টফিল্মে সবগুলো উপাদান মিলে যখন এক অবয়ব বানাবে, সে অবয়ব আপনাকে তিন ঘন্টার এক সিনেমার তৃপ্তিই দেবে।

Umbrella

অনেক সময় এরকম তো হয়ই, কোনো একজন মানুষের ব্যবহৃত জিনিসপত্র সেই মানুষটির অবর্তমানে তাঁর অস্তিত্বের প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড়ায়। এ গল্পও অনেকটা সেরকম। সত্যঘটনার উপরে ভিত্তি করে নির্মিত অ্যাওয়ার্ডজয়ী এ শর্টফিল্মে বিচ্ছেদ আছে, সংকট আছে, বেদনা আছে, হাহাকার আছে, প্রাপ্তি আছে, প্রণয় আছে। এই সবকিছুই এসেছে আট মিনিটের টাইমলাইনে। ভাবা যায়! 

শর্টফিল্মের স্টোরি টেলিং এ আমি খুবই অবাক হয়েছি। সে সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের ব্যবহারে। এই দুটি জিনিস পুরো শর্টফিল্মকেই অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছে। 

4. Windup

প্রথমেই শুরু করতে হবে এই শর্টফিল্মের বিজিএম দিয়ে। এবং এই ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরই বলতে গেলে এই শর্টফিল্মের প্রথম এবং মূখ্য অভিনেতা। বাকিদের কথা আসবে পরে। 

'উইন্ডআপ' মূলত বাবা-মেয়ের গল্প। ছোটবেলায় মেয়ে খেলতে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়ে কোমায় চলে গিয়েছে। এই দুর্ঘটনার আগে মেয়েকে মিউজিক বক্সের এক বিশেষ শব্দ শুনিয়ে বাবা ঘুম পাড়াতো। সেই শব্দ এখনো সে শোনায় মেয়েকে। হাসপাতালের কেবিনে, লতার মত জটিল সব যন্ত্রে আবৃত মেয়ের বিছানার পাশে বসে সে সেই মিউজিক বক্স প্রতিদিন বাজায়। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই শব্দ শুনলে কোমায় থাকা মেয়ের হার্টবিট একটু হলেও বাড়ে। বাবার আশা, এভাবেই একদিন মেয়ে সুস্থ হয়ে যাবে।

Windup

কিন্তু বিধিবাম! বাবার হাত থেকে পড়ে সেই মিউজিক বক্স ভেঙ্গে যায় একদিন। আর ঠিক হয় না।  বাবা অনেক চেষ্টা করেন, মিউজিক বক্স ঠিক করার জন্যে। ওদিকে মেয়েরও হার্টবিট ক্রমশই কমছে। কী হবে এরপর?

নয় মিনিট পঞ্চান্ন সেকেন্ডের এই শর্টফিল্ম যারাই দেখেছেন, তাদের অধিকাংশের পক্ষেই চোখের জল আটকে রাখা শক্ত হয়ে গিয়েছে৷ গল্পটাই এমন। যাদের প্রিয়জনেরা নানা দুর্ঘটনায় হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে আর যারা তাদের প্রিয়জনকে ফিরিয়ে আনার জন্যে মরণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, এই শর্টফিল্ম, তাদের এই কাজের প্রতি এক ক্ষুদ্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। দারুণ এক কাজ৷ 

5. Tokri- The Basket

এ শর্টফিল্মের গল্পও মেয়ে-বাবার সম্পর্কের উপর উপজীব্য করে নির্মিত। মুম্বাই শহরের এক প্রান্তিক পরিবারের বাবা নিয়মিত সকালে হাতে ব্যাগ আর টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে কাজে ছোটেন। মেয়ে বস্তির পাশের এক স্কুলে পড়াশোনা করে। বাড়ি ফিরে মায়ের সাথে ঝুড়ি বানায়। রাতে বাবা বাড়ি ফিরলে একসাথে খেয়েদেয়ে ঠাসাঠাসি করে ঘুমিয়ে পড়ে তিন প্রানী। এভাবেই যাচ্ছিলো। 

এক রাতে মেয়ে খেয়াল করে, বাবা তার ট্রাঙ্ক থেকে কি যেন বের করে প্রতিরাতে দেখে। পরদিন বাবা অফিসে যাবার পরে কৌতূহলী মেয়ে বাবার ট্রাঙ্কের ডালা খুলে দেখতে পায়, ভেতরে যত্ন করে লাল কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা এক সোনার দম দেওয়া ঘড়ি আর একটা ছবি, যেখানে বাবা কারো থেকে এই ঘড়িটি নিচ্ছেন। মেয়ে বুঝতে পারে, বাবা হয়তো বড় কোনো কাজ করেছিলেন, সেজন্যেই এই পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। 

দেখা শেষ হলে জিনিসগুলো যখন আবার ট্রাঙ্কে রাখবে ঠিকমতো, তখনই ঘটে বিপত্তি।।মেয়ের হাত থেকে পড়ে ভেঙ্গে যায় সোনার ঘড়ি। রাতে বাবা প্রতিদিনের অভ্যাসমত যখন দেখতে যায় ঘড়ি, ভাঙ্গা ঘড়ি দেখে ধাক্কা খান। বুঝতে পারেন কার কাজ। মেয়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেন।

কী করবে মেয়ে? সে তখন শুরু করে টুকরি বা ঝুড়ি বানানো। যেগুলো বিক্রি করে সে বাবার ঘড়ি মেরামত করাবে বলে প্রতিজ্ঞা করে। কিন্তু আদৌ পারবে সে এটা করতে? এটা নিয়েই গল্প। 

Tokri:The Basket

চৌদ্দ মিনিটের এ শর্টফিল্ম একটু অন্যরকম। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরটাও খানিকটা ভিন্ন ধাঁচের। সবমিলিয়ে কেমন যেন ভালো লাগার মতই গল্পটা। তাছাড়া অন্তর্নিহিত গূঢ় বার্তাটিও দুর্দান্ত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, সহজ কথা যায় না বলা সহজে। সেটাকেই খানিকটা ভুল প্রমাণিত করে আজকাল বহু দুর্বোধ্য-সর্পিল-ঝাপসা গলিঘুঁজির বিষয়বস্তুকেও সহজ-সাবলীল করে আনা হচ্ছে নানা গল্পে, নাটকে, সিনেমায়, শর্টফিল্মে। এই অ্যানিমেটেড শর্টফিল্মগুলোই যার প্রমাণ। যারা দৈর্ঘ্যে অতিকায় নয়, কিন্তু মননে প্রত্যেকেই মহীরূহ-সমান। এখানেই এই শর্টফিল্মগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব ও অভিনবত্ব। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা