'বিকল পাখির গান' এই শহরের কিছু প্রান্তিক মানুষের জীবন ও যাপনের গল্প, যে গল্পে মিশে আছে কুসংস্কার, আছে মিরাকল আর ম্যাজিক রিয়েলিজমের চমৎকার সন্নিবেশ...

টেলিফিল্ম: বিকল পাখির গান (২০০৯)
রচনা ও পরিচালনা: নূরুল আলম আতিক
সিনেমাটোগ্রাফি: নেহাল কোরাইশি
কাস্ট: জয়া আহসান, মনিরা আক্তার মিঠু, নওহা মুনীর দিহান, গাজী রাকায়েত প্রমুখ।
রানিং টাইম: ৫২ মিনিট 

মানুষ বেঁচে থাকে কিছু না কিছুকে অবলম্বন করে। আর জীবনের সংকট মুহূর্তে আকাঙ্ক্ষা করে একটা মিরাকল ঘটার। সাধারণ মানুষ কখনো এই মিরাকলের আশায় দ্বারস্থ হয় সৃষ্টিকর্তার। কখনোবা কিছু মানুষ আশ্রয় করে কুসংস্কারকে। "বিকল পাখির গান" টেলিফিল্মটি প্রান্তিক মানুষের জীবনে সেই মিরাকলের অস্তিত্বের কথা বলে। নির্মাতা নূরুল আলম আতিক তার একটা ইন্টারভিউতে এই মিরাকলকে বলেছিলেন "বেঁচে থাকার জাদু"। 

"বিকল পাখির গান" এই শহরের কিছু প্রান্তিক মানুষের জীবন ও যাপনের গল্প। এয়ারপোর্টের পার্শ্ববর্তী একটা এলাকায় ঘিঞ্জি গলির মাঝে দাঁড়িয়ে একটা ছোট্ট দোতলা ভাড়াবাড়ি। সেই বাড়ির নোনা ধরা দেয়াল, জং ধরা টিনের ছাওনি, শ্যাওলা পড়া কলতলার পাশে ভাঙাচোরা নোংরা শৌচাগার আর উঠানের পিঠে অপর্যাপ্ত আলো। তারমধ্যেই কয়েকটা পরিবারের জীবিকা, জীবনপ্রণালী , প্রেম-পরকীয়া আর তাদের বেঁচে থাকার জাদু- ইত্যাদি সবকিছু নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই টেলিফিল্মে। চমৎকার স্ক্রিনপ্লে, রিয়েলিস্টিক সংলাপ। নিখুঁত চিত্রনাট্য আর পরিচালনা নূরুল আলম আতিককে এনে দিয়েছিল ক্রিটিক চয়েজে দুই দুটি মেরিল প্রথম আলো পুরষ্কার। 

অভিনয় নিয়ে না বললেই নয়। এই টেলিফিল্মটার ক্ষেত্রে অভিনয়টা বিশ্বাসযোগ্য না হলে সুন্দর চিত্রনাট্যটা খানিকটা অকেজোই থেকে যেত বৈ কি। অভিনেতাদের পারফরম্যান্স এত জীবন্ত ছিল, যে আমার মনে হয়েছে ফিকশন না, বরং শহরতলীর কোনো ভাড়া-বাডির সিসিটিবি ফুটেজ দেখছি। অবশ্যই এর একটা কারন হচ্ছে সংলাপে কথ্য ভাষার চমৎকার উচ্চারণভঙ্গি; বিশেষত: দিহান, জয়া আহসান আর মুনিরা মিঠু মারাত্মক অভিনয় করেছেন।

এবার আসি সিনেমাটোগ্রাফিতে। কোন অফিসিয়াল সেট ছিল না, নাটকটা শুট হয়েছে রিয়েল লোকেশনে (অন্তত দেখে তাই মনে হয়েছে) কিন্তু ওতটুক সংকীর্ণ জায়গার মধ্যে থেকে চমৎকার সব শট নেয়া হয়েছে টেলিফিল্মের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। একদম চোখ ধাঁধিয়ে গেছে। অন্যদিকে আউটডোর বলতে, শহরের ভিড় রাস্তায়, ফুটপথে বেশ কিছু দৃশ্য। তবে সেটা যতটা না পাঁচ-তারা-রেস্তোরাঁর শহর, তারচেয়ে অনেক বেশি সেটা কর্মব্যস্ত সাধারণ মানুষের পদদলিত ঘামশিক্ত ঢাকা। আমার আফসোস থেকে যাবে, কেন বিকল পাখির গানের সিনেমাটোগ্রাফি কোনো পুরষ্কার পেল না। কিভাবে পাবে? আমাদের অ্যাওয়ার্ড ফাংশনগুলিতে নাকি টিভি নাটকের সিনেম্যাটোগ্রাফির কোনো ক্যাটাগরি থাকে না!

টেলিফিল্মের নাম কেন বিকল পাখির গান?

টেলিফিল্মে আমরা দেখি, এয়ারপোর্ট এলাকায় রানওয়ে ঘেষা ঐ বাড়িটার ওপর দিয়ে দিনরাত সময়ে অসময়ে উড়ে যায় বিমান। আর হৈচৈপূর্ণ হয়ে উঠে চারপাশ। স্ক্রিনে ভেসে উঠে একফালি আকাশ। এই বিমানই এখানে বিকল পাখি। 

গল্পের আভাস ও অন্যান্য 

বিকল পাখির ক্যাকোফোনিতে কম্পমান বাড়িটার বাড়িওয়ালীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন মনিরা আক্তার মিঠু। পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া সেই বাড়ি। মৃত বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার আর ঘরজামাই স্বামীর ওপর নজরদারি করেই দিন কাটে তার। ভাড়াটিয়া দুই ধুরন্ধর পকেটমার ভাইবোন (পাতানো ভাইবোন); বোনের চরিত্রে রয়েছে জয়া আহসান। সাপ দেখিয়ে মানুষকে ভয় দেখিয়ে রুটিরুজির পায়তারা করা আরেক ভাড়াটে বেদেনীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন নওহা মুনীর দিহান। উল্লেখ্য, এই নাটকে অনবদ্য পারফরম্যান্সের জন্য দিহান ক্রিটিক চয়েজে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর ক্যাটাগরিতে মেরিল প্রথম আলো পুরষ্কার (২০১০) জয় করেন। 

অন্যদিকে বেদেনীর অকর্মা স্বামীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন গাজী রাকায়েত। আর তার হাত ধরে চিত্রনাট্যে প্রবেশ করে এক দরবেশ বাবা। তারপর থেকে আমরা টেলিফিল্মে বেশকিছু অলৌকিক ঘটনা দেখতে পাই। এই বিষয়টাকে আমরা শিল্পের 'জাদুবাস্তবতা' ম্যাজিক রিয়েলিজমকে ধর্মীয় আঙ্গিকে দেখতে পারি। বেশকিছু অলৌকিক ঘটনা থেকে একটার উদাহরণ দেয়া যাক। গল্পের বাড়িটি বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। দরবেশ বাবা দৈবশক্তিতে আগেই সেটা জানতে পারে এবং তার মুরিদকে পাঠিয়ে ঐ বাড়ির সবাইকে ম্যাজিক করে বাইরে নিয়ে আসে এবং সবার জীবন বাঁচায়। এটাইতো সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার জাদু। তারা ভেবে থাকে এমনিভাবেই তাদের দুঃসময়ে একটা মিরাকল ঘটে যাবে। মানুষের সেই (কু)সংস্কারকে ইঙ্গিত করতেই পর্দায় এই জাদুবাস্তবতার আশ্র‍য় নিয়েছেন নাট্যকার। 

আমার মনে হয়েছে, এখানে দরবেশের মুরিদ অর্থাৎ বেদেনির স্বামীর বিষয়ে একটা প্রচলিত প্রবাদ প্রযোজ্য। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের আড্ডাখানা। ভাবুন তো, দরবেশ বাবা কিন্তু অন্য কারো হাত ধরেও গল্পে অনুপ্রবেশ করতে পারত!

টেলিফিল্মটির এক পর্যায়ে আমরা দেখি বাড়িওয়ালীর ঘরজামাই স্বামীকে অজ্ঞাত কারনবশত পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে এই অংশটুকু অপ্রয়োজনীয় বলেই মনে হয়। কিন্তু বাড়িওয়ালীর জন্য বোধহয় এটার প্রয়োজন ছিল। চব্বিশ ঘন্টা যার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতো, আজকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়াতে তার জন্যই এত আহাজারি, আজকে শুধু তার ভাল স্মৃতিগুলাই মনে পড়ে। মানুষ তো এমনই। তাই না? 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা