জাবুলিস্তান থেকে সোহরাব-রুস্তমের গল্প যেন চলে এলো ছেড়াদিয়ার বুকে। শাহানামার পারস্যগাঁথা প্রাণ পেলো ক্ষমতা আর রাজনীতির বলি হয়ে। শঙ্খ দাশগুপ্তের সামুদ্রিক ক্যানভাসে কখনো ওয়েস্টার্ন ফিল আসলো সিগার আর পিস্তলে, আবার কখনো উপমহাদেশীয় রাজনীতির পালাবদলের নোনতা স্বাদ (সেটা লবণ হোক বা রক্তের) এসে জিভে নাড়া দিয়ে গেল। ‘বলি’ বাংলা ওটিটির সবচেয়ে অন্যরকম কন্টেন্ট, আবার একই সাথে গল্পের দিক দিয়ে অন্যতম ক্লিশেড কন্টেন্টও।

চঞ্চল চৌধুরী-সোহেল মণ্ডল এই দুটি নামই যথেষ্ট এখন যেকোনো ওটিটি কন্টেন্টে আগ্রহ নিয়ে আসার জন্য। আর যদি দুজন একসাথে জুটিবেঁধে আসে তাহলে তো কথাই নেই। তাকদীরের পর চঞ্চল আর সোহেল দুজনকে নিয়েই দারুণ আগ্রহ ছিল দর্শকদের। আমি নিজেও দেখতে চেয়েছিলাম তারা পরবর্তীতে ভার্সাটালিটি ধরে রাখার জন্য কী কী ধরণের কাজ করেন। চঞ্চল প্রুভেন ওয়ারিয়র আর অন্যদিকে সোহেল ইন্ডাস্ট্রির নিউ ব্লাড। একদিক থেকেই দুজনের মিল আর সেটা হল তারা দুজনই অসাধারণ অভিনেতা। সোহেল এরই মাঝে বেশকিছু কাজ করেছেন যেগুলোতে তার এক্টিং চপস দেখানোর সুযোগ ছিল। চঞ্চল চেষ্টা করেছেন কিন্তু তাকদীরকে ছাড়াতে পারেন নি আর। ‘বলি’ দিয়ে চঞ্চল তাকদীরকে ছাড়িয়েছেন নিশ্চিতভাবেই। তাকদীরের সে নির্ঝঞ্ঝাট ড্রাইভার এখানে এসে হয়েছে সোহরাব কোম্পানি, ছেড়াদিয়ার নিয়ন্ত্রক। ছেড়াদিয়ার রাজনীতি উপমহাদেশীয় পলিটিক্যাল ট্রেইটসকেই ফলো করে। দুটো কোম্পানির কাছেই পালাবদল হয় ক্ষমতার। ক্ষয়িষ্ণু মজিদ কোম্পানি একদিকে ফন্দি ফিকির করতে ব্যস্ত কীভাবে ক্ষমতায় ফেরত আসা যায় আর ক্ষমতায় থাকা সোহরাব কোম্পানি ব্যস্ত কীভাবে ছেড়াদিয়াকে আরও চুষে খাওয়া যায়। সাগরপাড়ের ছেড়াদিয়ার এই দুর্দশাগ্রস্থ সময়ে সাগরই যেন নিয়ে আসে এর উদ্ধারকর্তাকে। স্মৃতিশক্তি হারানো এক যুবক, যার স্থান হয় ছেড়াদিয়ার পতিতাপল্লীতে; সে-ই হয়ে ওঠে ছেড়াদিয়ার রক্ষক, রুস্তম।

চঞ্চল চৌধুরী-সোহেল মণ্ডল জুটির দ্বৈরথ ছিল দেখার মতন

‘বলি’র গল্প অনেকটাই ক্লিশেড। এই গল্প আমরা দশকের পর দশক ধরে দেখে আসছি সিনেমা-সিরিজ-নাটকে। কিন্তু গল্পের ব্যাপার তো অনেকটা এরকমই, গল্প একই থাকে- স্রেফ শাখাপ্রশাখা বাড়ে। শাহানামার সোহরাব-রুস্তম হোক কিংবা পাশের দেশের মির্জাপুর- চাইলে মেলানো যাবে অনেক কিছুর সাথেই। কিন্তু ‘বলি’ অনন্য তার উপস্থাপনে। এমন দুর্দান্ত উপস্থাপন বাংলা কন্টেন্ট ইন্ডাস্ট্রিতে এর আগে দেখা যায় নি। সাগরের জলরাশির পাশে কল্পিত ছেড়াদিয়াকে শঙ্খ দাশগুপ্ত একদম বাস্তব করে তুলেছিলেন। তাই সেখানকার ওয়েস্টার্ন লুক এন্ড ফিল একদম মানানসই লাগে। কোম্পানি, বলি কালচার গ্রাম্য রাজনীতির প্রতিরূপই মনে হয়।

সোহেল মণ্ডল ওরফে রুস্তমকে আদতেই মনে হয় রক্ষক, দ্য মাইটি হিরো অফ ছেড়াদিয়া। এরকম হিরোইজম দেখতে ভালো লাগে। নায়ককে ইনভিন্সিবল লাগে না, সেও আঘাত পায়- রক্তাক্ত হয়। কিন্তু আবার সে উঠে দাঁড়ায়, আর যখন দাঁড়ায় তখন টের পাওয়া যায় যে এবার নায়ককে আর কেউ হারাতে পারবে না। সোহেল মণ্ডল কী দক্ষতার সাথেই না এরকম একটা ক্যারেক্টার ক্যারি করেছেন। আর অন্যদিকে চঞ্চল চৌধুরী নেগেটিভ শেডে নিজেকে ঢেলে সাজিয়েছেন। তার চোখ, ভ্রূ, চশমা, হাসি প্রত্যেকেই যেন আলাদা আলাদা অভিনয় করেছে। শুধু এই দুইজন না, সাপোর্টিং ক্যারেক্টার সবাই ছিলেন অসাধারণ। সাফা কবিরকে নন গ্ল্যামারাস চরিত্রে কাজ করতে দেখে ভালো লেগেছে। জিয়াউল হক পলাশকে দেখে রীতিমত চমকে জেতে হবে। মির্জাপুরে দিব্যেন্দু যেরকম ভাইব দিয়েছিল, পলাশও সেরকম ভাইব দিয়েছেন অনেকটা। ইরেশ যাকের, সোহানা সাবা, সালাউদ্দিন লাভলু অভিজ্ঞতার ঝলক দেখিয়েছেন পরিপূর্ণভাবে। তবে এই সিরিজে যদি কেউ ছক্কা মেরে থাকেন তিনি হচ্ছেন নাসির উদ্দিন খান। হোয়াট অ্যা জেম অফ অ্যান এক্টর! স্যালুট স্যার। বলির টাইটেল ট্র্যাক অবশ্যই ওটিটিতে এখন পর্যন্ত আসা সেরা টাইটেল ট্র্যাক, সেইম গোজ টু বিজিএম। বলি শুনেও অনেক আরাম পাওয়া যায় তাই।

চমকে দিয়েছেন নাসির উদ্দিন খান

‘বলি’ আমাকে মুগ্ধ করেছে মূলত তার উপস্থাপনে। গল্প, কন্টিনিউটি, একশনে খামতি আছে কিন্তু ক্যামেরার কাজ, অভিনয় আর প্রেজেন্টেশনে বলি একেবারেই ভিন্নমাত্রার। বলি স্যাটিসফায়িং সোহেল মণ্ডলকে ফুল ফ্লেজড একশন এভাটারে দেখতে পাওয়ার জন্য, চঞ্চলের ক্যালিবারকে ইউটিলাইজ করার জন্য, নাসির উদ্দিন খানকে তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী ক্যারেক্টার দেয়ার জন্য আর চোখ ও মনকে প্রশান্তি দেয়ার মতো টেকনিক্যালি সলিড বাংলা কন্টেন্ট দেয়ার জন্য।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা