মহামারীর কারণে গত দুই বছরে বলিউডের ঠাটবাট কমেছে অনেকটুকু। মার্কেট রেভেনিউ কমেছে। ভালো সিনেমাও আসছেনা সেরকম। পাশাপাশি, জেগেছে প্রশ্ন- এ বছরেরও তো ছয় মাস পেরিয়েছে। অর্ধ বছর শেষে মহামারীর ক্ষত সামলে কতটুকু শক্ত অবস্থানে আছে বলিউড? তারা কি ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে? দক্ষিণ ভারতের সাথে দ্বৈরথে তাদের অবস্থানও বা এখন কোথায়? 

ভাবতে খানিকটা অবাক-ই লাগে, যে বলিউড ছিলো ভারতীয় সিনেমার শেষ কথা (মানের দিক থেকে না হলেও ঠাটবাটের দিক থেকে), সে বলিউডকেই একরকম নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিলো মহামারী। এই বৈশ্বিক বিপর্যয় আর কিছু করুক আর না করুক, বলিউডের ফোঁপরদালালি'তে যে ভালোই বাগড়া দিয়েছিলো, তা একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই বুঝতে পারা সম্ভব। 'করোনা'র আগে যেখানে ভারতের সব ইন্ডাস্ট্রি'র মধ্যে বলিউডের রেভিনিউ ছিলো সবচেয়ে বেশি, সেখান থেকে তারা এখন বিচ্যুত। সে স্থান দখল করেছে সাউথ ইন্ডিয়া। বোধহয়, ভবিতব্যও ছিলো এটাই।

মহামারীর পরে একের পর এক বিশাল ক্যানভাসের সাউথ ইন্ডিয়ান সিনেমা এসেছে। তারা বিধ্বংসী ব্যবসা করেছে। আর.আর.আর, কেজিএফ টু, ভিক্রম... সিনেমাগুলো একের পর এক রেকর্ডও ভেঙ্গেছে। এবং, পাশাপাশি তুলনায়, বলিউড সামান্যতম প্রতিরোধ তো দূরের কথা, বলা ভালো, খুব বাজেভাবে মুখ থুবড়ে দফারফা করেছে নিজেদের। যেসব বলিউডি সিনেমা ক্লিক করার কথা ছিলো, সেগুলো করেনি। অরিজিনাল স্ক্রিপ্টের সেরকম সিনেমা আসেনি। বরঞ্চ, একের পর এক পাল্লা দিয়ে সাউথের সিনেমার রিমেক হয়েছে। এবং, সেগুলো আসলে কতটুকু কি হয়েছে, তাও সচেতন দর্শকের জানা। ফলাফল- বলিউডই যে ভারতীয় সিনেমার শেষকথা... এই ন্যারেটিভটা পাল্টেছে। এবং, ঠিক সেখান থেকেই এসেছে প্রশ্ন- গত বছরটা নাহয় ভরাডুবিতে গেলো। কিন্তু, এ বছরেরও তো ছয় মাস পেরিয়েছে। অর্ধ বছর শেষে কতটুকু শক্ত অবস্থানে আছে বলিউড? তারা কি ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে? সাউথের সাথে দ্বৈরথে তাদের অবস্থানও বা এখন কোথায়? 

এ বছরের প্রথম ছয় মাস বলিউডের খুব যে আহামরি কেটেছে, এমনটা বলার সুযোগ নেই মোটেও। জানুয়ারির প্রথম দিকে 'কোভিড' এর আরেকটা ওয়েভ আসায়, অনেকগুলো বাঘা বাঘা সিনেমার মুক্তি স্থগিত করতে হয়েছে। বিগ প্রোডাকশনের কিছু সিনেমা সব আয়োজন করেও শেষমেশ পিছিয়ে এসেছে। আস্তে আস্তে মহামারীর শঙ্কা কাটার পরে সিনেমাহলে যদিও সিনেমা এসেছে, কিন্তু, সেখানেও আয়রনি। যে সিনেমাগুলো বলিউডকে ট্রাকে ফিরিয়েছে, তারা সবাই সাউথের সিনেমা! শ্রেষ্ঠাংশে দু'জন- আরআরআর, কে.জি.এফ- টু। এদিকে, মুক্তি পাওয়া বলিউডের যে সিনেমা সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করেছে, সেখানেও আছে চমক। সিনেমাটির নাম- দ্য কাশ্মীর ফাইলস। নো শাহরুখ খান। নো সালমান খান৷ নো অ্যাকশন। নো অনসম্বল কাস্ট। কিছুই নেই। তবুও, বিবেক অগ্নিহোত্রীর সিনেমা করেছে বাজিমাত! সর্বসাকুল্যে ২৫ কোটি বাজেটের এ সিনেমা আয়ও করেছে চক্ষু ছানাবড়া অঙ্কের অর্থ; ৩৪০ কোটি রূপি! অথচ, 'সম্রাট পৃথ্বীরাজ', 'যুগ যুগ জিয়ে' কিংবা 'শামসেরা'র মত সিনেমা বেশ নিদারুণভাবেই হোঁচট খেয়েছে। এবার, এই উদাহরণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কেউ যদি বলতে চান, 'মহামারী'র বদৌলতে স্টারডম ফুরিয়েছে...  তাহলে সেটা অন্য বিতর্কের বিষয়৷ সে বিতর্কে যাওয়া এখনই ঠিক হবেনা৷ 

তবে, এটা ঠিক, 'স্টারডম' থাকলেই সিনেমা হিট হবে... এই ন্যারেটিভে খানিকটা হলেও ধাক্কা এসেছে। সালমান খানের 'রাধে'র ভরাডুবি হয়েছে। 'আতরাঙ্গি রে' কিংবা 'সম্রাট পৃথ্বীরাজ'ও নাম লিখিয়েছে ফ্লপের খাতায়। 'লাল সিং চাড্ডা'র বরাতে ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছেন পারফেকশনিস্ট আমির খানও৷ পাশাপাশি, বলিউডের যে আরেক সিগনেচার জনরা- 'স্মল টাউন সোশ্যাল কমেডি'... এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় এই জনরাও এখন বেশ ফিকে হতে শুরু করেছে। গত বেশ কিছু বছরে এই জনরায় কাজ করলেই সাফল্য আসছিলো। বলিউডও তাই 'সিওর সাকসেস' এই ক্যাটাগরিকে এত বেশি ব্যবহার করেছে, শেষে এসে পুরো বিষয়টিই তেতো হয়ে গিয়েছে৷ ফলশ্রুতিতে, এই জনরাও এখন দর্শকদের মনোযোগের স্থান থেকে খসে পড়ছে নীচে। গত বছরের 'চণ্ডীগড় কারে আশিকী' কিংবা এ বছরের 'আনেক', 'জায়েশভাই জোরদার'... কেউই খুব একটা ব্যবসা করতে পারেনি। যদিও, এই একই জনরার 'বাধাই দো' আশ্চর্যজনকভাবে আবার ভালো রিভিউ পেয়েছে। সে কি, এই সিনেমার স্পিরিচুয়াল বড়ভাই 'বাধাই হো'র কারণে, নাকি, গল্পের অস্থিমজ্জায় থাকা 'এলজিবিটিকিউ' এর কারণে... তা নিয়ে খানিকটা প্রশ্ন চাইলে করা যেতেই পারে। তবে, পাশাপাশি এও জানিয়ে রাখা ভালো, এই জনরার এখানেই যে সমাপ্তি, লিখতে হবে এপিটাফ... এমনটাও বলার উপায় নেই। কারণ, দর্শকের রুচি জিলিপির প্যাঁচ। আগে থেকে প্রেডিকশন করাটা তাই বোকামি।

যদিও দুই বছর ধরে আটকে থাকা 'শামসেরা' এবং আমির খানের 'লাল সিং চাড্ডা' নিয়ে বিস্তর আশা ছিলো, কিন্তু তারা হতাশ করেছে৷ অক্ষয় কুমারের 'রক্ষা বন্ধন'ও হয়েছে ফ্লপ। আবার, এরই মাঝে 'ভুল ভুলাইয়া'র সিক্যুয়েল 'ভুল ভুলাইয়া টু' হয়েছে জনপ্রিয়। হিট-ফ্লপের অদ্ভুত এক দড়ি টানাটানিই চলছে যেন বলিউডে। সে সাথে- প্রোপাগান্ডা, বয়কট ক্যাম্পেইন, নেগেটিভ প্রমোশন, 'অ্যান্টি ন্যাশনাল' ট্যাগ দেওয়াতো আছেই! 

এসব কম-ভালো মিলিয়ে-মিশিয়ে খেলার প্রথমার্ধে যে সাউথ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি অনেকটাই ক্লিয়ার মার্জিনে এগিয়ে, সেখানেও নেই যদি-কিন্তুর সুযোগ। তবে, এও ঠিক, দ্বিতীয়ার্ধে 'খেলোয়াড়' হিসেবে মাঠে নেমে কিছু বলিউডি সিনেমা এখনও পালটে দিতে পারে সমীকরণ। এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে- অয়ন মুখার্জির 'ব্রহ্মাস্ত্র'র কথা। তিনশো কোটি বাজেটের যে সিনেমা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা অনেকটাই তুঙ্গে। টিজার, ট্রেলারেও যেরকম হাইপ তৈরী হয়েছে, এ সিনেমা যে বেশ ভালোই ব্যবসা করবে, সেই আশার ভস্মে ঘি ঢালারও মানুষ তাই কম নেই মোটেও। 'আন্ধাধুন' এর পরে শ্রীরাম রাঘবন ফিরছেন 'মেরি ক্রিসমাস' নিয়ে। যেখানে অভিনয় করবেন বিজয় সেথুপতি, ক্যাটরিনা কাইফ। আবার, 'ভিক্রম ভেদা'র হিন্দি রিমেক নিয়ে ফিরছেন হৃত্বিক রোশনও। যেটার বেশ প্রমিজিং এক টিজার বেরোলো সম্প্রতি। 

'ব্রহ্মাস্ত্র' নিয়ে প্রত্যাশা আছে অনেকটুকুই

অর্থাৎ, এটা বোঝা যাচ্ছে, দ্বিতীয়ার্ধের খেলোয়াড়েরা বেশ আটঘাট বেঁধেই নামবে মাঠে৷ তাছাড়া, প্রথাও এটাই, বলিউডের বিজনেস সাধারণত বছরের শেষদিকেই হয়। যেহেতু, সিনেমাগুলোর রিলিজ বিশেষ দিনের সাথে মিলিয়ে করা হয়, আর বিশেষ দিনগুলো, যেমন- ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে, দিওয়ালি, ক্রিসমাস... এগুলো ক্যালেন্ডারের শেষাংশেই থাকে, তাই পাইপলাইনে সিনেমাগুলো এ সময়ের জন্যেই মজুদ থাকে। আর, সে প্রথা বিবেচনায়, এবারেও বোধহয়, খানিকটা প্রত্যাশা রাখাই যায়৷ এ সিনেমাগুলোর সুবাদে শেষদিকে ঘুরে দাঁড়ালেও দাড়াতে পারে বি-টাউন। কে জানে! 

'বলিউড বাদশাহ' কি ফেরাতে পারবে বলিউডের সুদিন? 

আর, এসবেও যদি কাজ না হয়, তাহলে ২০২৩ তো রইলোই। ২০২৩ কেন রইলো? কারণ, ২০২৩ এ আসবে এমন একজন মানুষের টানা তিনটি সিনেমা, যে মানুষটিকে রূপোলী-পর্দায় দেখার জন্যে বহু মানুষ বহুদিন ধরে বসে আছে হাপিত্যেশ করে। যে মানুষটির ফিল্মোগ্রাফি গত কিছু বছর ধরেই শোচনীয়। যে মানুষটি নিজেও ফিরতে মরিয়া। আশা করি, সে মানুষটি, যাকে ভালোবেসে ডাকা হয় 'বলিউডের বাদশাহ', তিনি সদর্পে ফিরবেন। সাথে ফেরাবেন বলিউডকেও। প্রত্যাবর্তন তখনই হবে রাজকীয়। কাম্য সেটাই। বাকিটুকু দেখা যাক। সেটুকু নাহয় মহাকালই বলুক। 

তথ্যসূত্রঃ ফিল্ম কম্প্যানিয়ন 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা