'ব্রহ্মাস্ত্র'র যে গল্প, এই গল্প শুনে আপনার মার্ভেল, ডিসি, হ্যারি পটার, স্ট্রেঞ্জার থিংস- বহুকিছুর কথা মনে পড়ে যেতে পারে। এবং অবাক লাগলো এটাই, এই গল্প নাকি অয়ন মুখার্জী পাঁচ বছর ধরে ডেভেলপ করেছেন! এরকম দীর্ঘ সময় ধরে লেখা গল্পের এহেন নমুনা দেখে, তীব্র হতচকিত হওয়া ছাড়া উপায়ও রইলো না...

রাজামৌলির 'আরআরআর' এর ভিজ্যুয়াল এফেক্টস সুপারভাইজার ছিলেন ভি শ্রীনিবাস মোহন৷ 'আরআরআর' এর ভিএফএক্স এর কাজ শুরুর দিনেই মোহন'কে রাজামৌলি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন- সিজিআই'তে এমন কোনো বাড়াবাড়ি করা যাবে না, যাতে করে মূল গল্পটা আড়ালে চলে যায়। ভিএফএক্স চোখধাঁধানো হোক, সমস্যা নেই। কিন্তু গল্পের চেয়ে তা বড় হতে পারবে না। রাজামৌলির যে কথাতেই মূলত 'আরআরআর' এ দুর্দান্ত সব আর্টিফিশিয়াল শটস দেখলেও, সেসব মেইন ন্যারেশনকে আউট পারফর্ম করেনা৷ গল্পের বাঁধন এতটাই ঠিকঠাক, সাজানো এসব দৃশ্যপটকেও গল্পের অংশ মনে হয়। এই যে কম্বিনেশন, গল্পকে প্রায়োরিটি ও রিয়েলিস্টিক টাচ দিয়ে বাকিসব কিছু নিয়ে এগোনো, এই বিলিভিবিলিটি 'কেজিএফ' কিংবা 'বাহুবলী'রও সম্পদ। যদি ভিএফএক্স এর গিমিক আর প্রচণ্ড অর্থোডক্স গল্প নিয়ে কেউ সিনেমা বানাতে চান, সে সিনেমা হয়তো ব্যবসাসফল হবে, 'ওয়ান টাইম ওয়াচ' হিসেবে মানুষ সে নির্মাণ দেখবেও। কিন্তু অমরত্বের বিচারে সেসব সিনেমা যে মুখ থুবড়ে পড়বে, সন্দেহ নেই সেখানেও। ঠিক যেটাই হতে দেখি 'ব্রহ্মাস্ত্র'র এর ক্ষেত্রে। 

কোনো এক মূল্যবান বস্তু তিন টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে ভারতের নানা স্থানে, যে টুকরোগুলোকে খুঁজে পেতে চায় শত্রুপক্ষ, এদিকে শত্রুরা যদি এই মূল্যবান টুকরোগুলো খুঁজে পায় তাহলে পৃথিবীর মহাবিপদ, অগত্যা পৃথিবীকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্যে আদাজল খেয়ে নামে একদল মহৎপ্রাণ মানুষ, শুরু হয় ভালো-খারাপের লড়াই... এই যে গল্প, এ গল্প শুনে আপনার মার্ভেল, ডিসি, হ্যারি পটার, স্ট্রেঞ্জার থিংস... বহুকিছুর কথা মনে পড়ে যেতে পারে। এবং এরকমই বহু পরিচিত মসলার কাসুন্দি ঘেঁটে যে গল্প, সে গল্পেরই নাম- ব্রহ্মাস্ত্র (পার্ট ওয়ান)। এ গল্প নাকি অয়ন মুখার্জী পাঁচ বছর ধরে ডেভেলপ করেছেন। এরকম দীর্ঘ সময় ধরে লেখা গল্পের এহেন নমুনা দেখে, তীব্র হতচকিত হলাম! বিস্ময়ও জাগলো! 

যদিও এটাও ঠিক, নানাকিছু বেটে-ঘেঁটে বানানো 'ব্রহ্মাস্ত্র'র শুরুর খানিকটা অংশে মাসালা মুভির আদর্শ কিছু উপাদানও ছিলো। শাহরুখ খানের ক্যামিও, নাগার্জুনের অ্যাকশন, রনবীর-আলিয়ার ক্যামেস্ট্রি, দারুণ কিছু ভিএফএক্স... গল্প খুব একটা জুতের না হলেও বাকিসব কারণে খারাপও লাগেনি সে সময়টুকু। কিন্তু সেসব সামান্যই৷ গল্পের পরের দিকে এসে এত এত চরিত্র, এত ঘটনা-দুর্ঘটনা, ভিএফএক্স এর এত হম্বিতম্বি...অনেকটাই একঘেয়েমি ভর করলো যেন। এবং 'ব্রহ্মাস্ত্র' দেখে বারবার মনে হলো এটাই- এক যুগ আগে আমরা যেরকম টিপিক্যাল বলিউডি সিনেমা দেখতাম, এ সিনেমা সেটাই। নতুনত্ব বলতে- সিজিআই। যেন চকমকে মোড়কে রদ্দিমালের পসরা!

গল্পটাই কেন যেন জমলোনা! 

'ব্রহ্মাস্ত্র'র আরেকটা বড় সমস্যা- বিলিভিবিলিটি। গল্পের প্রোটাগনিস্ট শিভা (রনবীর কাপুর), প্রেমিকা ইশা'কে (আলিয়া ভাট) ভালোবাসেন, তার জন্যে করতে পারেন সব। অর্থাৎ, মোদ্দা কথা, তাদের প্রেমটা বেশ গভীর৷ কিন্তু কেন গভীর, সে প্রশ্নের উত্তর এ সিনেমায় নেই। যে শিভা-ইশার মধ্যবর্তী রসায়ন এ গল্পের অন্যতম অনুষঙ্গ, সেটারই কোনো ঠিকঠাক বিল্ডআপ নেই গল্পে। যে ক্যামিও ক্যারেক্টারগুলো দেখি গল্পে, যে গুরু (অমিতাভ বচ্চন) সিনেমার অনেকটুকু জুড়েই আছেন, তাদের কোনো ব্যাকস্টোরি নেই। কেন নেই? সেগুলো কি এই অস্ত্রাভার্স এর দ্বিতীয় পর্বে আসবে? যদি ধরেও নিই, দ্বিতীয় পর্বে সমস্ত ঠিকুজিকোষ্ঠী আমরা পাবো, তবুও কি এ পর্বে গল্পের ফান্ডামেন্টাল বিষয়গুলো ক্লিয়ার করার দায় ছিলোনা নির্মাতার? তাছাড়া শিভা, ইশা, গুরু, গুরুর আশ্রম, ব্রহ্মাস্ত্র'র টুকরোটাকরা... সবকিছু যে ইন্ডিয়ানা জোনস থেকে শুরু করে প্রফেসর জেভিয়ার, স্পাইডার ম্যান, অ্যাভেঞ্জারস কিংবা জাস্টিস লীগ'কে মনে করালো, এখানে এসেও তাই প্রশ্ন জাগে মনে- নতুনত্ব কোথায়? 'ব্রহ্মাস্ত্র' এমন কি আহামরি অফার করছে, যেটা অন্য সিনেমায় নেই? এসবের পাশাপাশি সেট ডিজাইনেও যেসব বিষয় ইনকর্পোরেট করা হয়, সেসবও যেন প্রচলিত পৃথিবীর সাথে ক্ল্যাশ করে। রিয়েলিটি চেকে এ সিনেমা যেখানে খানিকটা ব্যাকল্যাশের মুখোমুখিও হয়! 

শিভ-ইশার গল্পেও নেই নতুনত্ব

অয়ন মুখার্জী 'অস্ত্রাভার্স' এর প্রথম পর্ব 'ব্রহ্মাস্ত্র'কে ঠিক কিভাবে প্রেজেন্ট করতে চেয়েছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত নই। তবে যদি মাসালা গল্প, যে গল্প দেখে সিনেমাহলে সিটি বাজবে, মানুষজন ঝাড়া হাত-পা হয়ে পৌনে তিন ঘন্টার এ মোচ্ছব দেখবে, সিজিআই এর গিমিকে গল্পের দূর্বলতা বেমালুম বিস্মৃতপ্রায় হবে... উদ্দেশ্য হয় এটাই, তাহলে তিনি সফল। কিন্তু নির্মাতা যদি চেয়ে থাকেন ইন্ডিয়ান মিথোলজির রুটেড গল্পে এমন এক ইউনিভার্স তিনি বানাবেন, যা মানুষ মনে রাখবে বহুদিন, তাহলে খুব আক্ষেপের সাথেই বলতে হচ্ছে- সে চাওয়া পূরণে তিনি পুরোপুরিই ব্যর্থ। কারণ, যে স্ট্রাকচারে পুরো গল্প এবং সে গল্পের যে পলকা বন্ধন, ওটিটি'র এই স্টোরি-ড্রিভেন কন্টেন্ট আর কনশাস অডিয়েন্সের যুগে সে দূর্বলতা ধরতে পারার জন্যে শার্লক হোমস হবার দরকার নেই। তিন গোয়েন্দা হলেই যথেষ্ট। এবং দূর্বলতার সে অংশটুকু ধরা গেলে, ম্যাজিক আর ম্যাজিক থাকেনা। হয় প্রতারণা। মূলত যে প্রতারণাই 'ব্রহ্মাস্ত্র'র সবচেয়ে বড় ত্রুটি। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা