শুরু থেকেই তাদের হাঁটতে হয়েছে স্রোতের বিপরীতে। জনরোষের রক্তচোখের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে তারা বরাবরই শুনিয়েছে সমাজ পাল্টানোর বার্তা। এই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের কারণেই 'বিটিএস' পরিনত হয়েছে সাম্প্রতিককালে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যান্ডে...

সব সফল প্রতিষ্ঠানেরই শুরুর দিকের বেশ ক্লান্তিকর একটা যাত্রার গল্প থাকে। এই দমবদ্ধ, অনিশ্চিত সময়টা অতিক্রম করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এবং যারা সেটা খুব ভালোভাবে করতে পারে, তাদের রূপান্তরটাও হয় সেরকম মনে রাখার মতন। এই কথার সাপেক্ষে জ্বলজ্যান্ত এক উদাহরণ দেয়া যায় খুব পরিচিত একটা ব্যান্ডকে নিয়ে। তাদের নামটা এখনই বলছি না৷ ক্রমশ প্রকাশ্য। 

আজ থেকে বেশ কিছু বছর আগে, যখন তারা শুরু করে তাদের পারফরম্যান্স, স্রেফ উপেক্ষিত হয়েছে সবখানে। নিজেদের কনসার্টের টিকেট বিক্রি হতো না। লোকবল না থাকায় নিজেদের শো এর লিফলেট নিজেরাই বিলি করেছে রাস্তায়। এদিকে জনস্রোত তাদের শুধু উপেক্ষাই করেনি, সময়ে-অসময়ে তাদের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে হাসিঠাট্টা, বিদ্রুপ, অপমানসূচক বাক্য। গণমানুষের ব্যঙ্গবিদ্রূপ করা যত বেড়েছে, ব্যান্ডের এই মানুষগুলোর  চোয়াল হয়েছে ঠিক ততটাই শক্ত। মনে মনে বলেছে, 

একটু দাঁড়াও, এখন তো বিদ্রুপ করলে। এই তোমরাই, কিছু বছর পরে আমাদের মাথায় তুলে নিয়ে নাচবে! 

এরপরই শুরু হয় এই ব্যান্ডের অসাধ্যসাধন করার গল্প। টিমের সাত জন সদস্য নাওয়াখাওয়া ভুলে ঘন্টার পর ঘন্টা গানের লিরিক্স, স্ক্রিপ্ট, কনসেপ্ট নিয়ে নিয়ে পড়ে থাকা শুরু করে। পাগলের মত দিনে ১৫-১৬ ঘন্টা পারফরম্যান্সের জন্যে রিহার্সাল করতে থাকে তারা। সমালোচনার যাপিত সব তীরকে অদম্য মনোবলে পালটে ফেলে দারুণ অনুপ্রেরণায়। এতকিছুর যোগফলে দাঁড়ায় একটিই শব্দ 'বিটিএস।' অথবা বাংতান বয়েজ। অথবা, বাংতান সোনিয়োদনা। ইংরেজিতে- বুলেটপ্রুফ বয় স্কাউটস। 

'ব্যান্ড' বলতে আমরা যেখানেই ধরেই নিই- সঙ্গীতের এই জনরা শুধুমাত্র তরুণ প্রজন্মের একচেটিয়া বিষয়, সেখানে 'বিটিএস' দেখায় বৈপরীত্য৷ তাদের অডিয়েন্স বিচিত্র। দশ বছরের শিশু থেকে ষাটোর্ধ্ব বয়স্ক মানুষও এই 'বিটিএস' এর ফ্যান। 

একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে কোরিয়ান এই ব্যান্ডটি কেন এখন বিশ্বের অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী ব্যান্ড, সেটার পেছনেও আছে কারণ। ইতিহাসের চার-চাকায় সওয়ার হয়ে যেতে হবে সামান্য পেছনে। 'কে পপ' অথবা কোরিয়ান পপ কালচার নব্বই এর দশক থেকে শুরু হলেও এটা মূলত বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পায় সাই এর 'গ্যাংনাম স্টাইল' এর পর থেকে। মোটামুটি তখন থেকেই পৃথিবীব্যাপি এশিয়ার এই স্পেসিফিক মিউজিক জনরা নিয়ে বেশ আলোচনা তৈরী হয়৷ ইন্টারেস্টিং গান, ফ্যান্সি ড্রেস আর জমকালো ড্যান্স... কে পপ এর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে আবির্ভূত হয় শ্রোতা ও দর্শক মহলে। 

২০১০ সালের কথা। এ বছরে 'বিটিএস' নাম নিয়ে সাতজন যুবকের যাত্রা শুরু হয়। 'কে পপ' জনরাকে অবলম্বন করে তাদের এ আত্মপ্রকাশের প্রথম দিকের গল্পটা বেশ মানবেতর। যা নিয়ে আগেই বলেছি। যাত্রা শুরুর তিন বছর পরে অর্থাৎ ২০১৩ সালের দিকে বিটিএস 'বিগ হিট এন্টারটেইনমেন্ট' এর ব্যানারে তাদের অ্যালবাম প্রকাশ করে। 'টু কুল, ফোর স্কুল' নামের তাদের এ অ্যালবাম মুখ থুবড়ে পড়ে। খুব একটা ব্যবসা হয় না। 

এই সময়টাই কষ্টের। এমনিতেও 'কে পপ' জনরা খুব একটা সমাদৃত না, এরপরে 'বিটিএস' নিয়ে তখন থেকে শুরু হয় নানা সমালোচনাও। এরা সুর চুরি করে, লিরিক্স চুরি করে, অর্থহীন নাচানাচি, মেয়েলি চেহারার পুরুষ, হিজড়াদের মতন চকচকে পোশাক পড়ে... অভিযোগের নোংরা ও কদর্য সব ভাষা ধেয়ে আসতে থাকে ক্রমাগত। অন্যান্য অনেক নতুন ব্যান্ডের চেয়ে ঢের বেশি প্রতিবন্ধকতা নিয়ে পথচলা শুরু হয় তাদের 

এদিকে সমালোচনা চলছে। কিন্তু বিটিএস সদস্যরাও বসে নেই একবিন্দু। তারা বানিয়ে চলছে একের পর এক অ্যালবাম। কোনোটাই সেভাবে হিট হচ্ছেনা। আন্তর্জাতিক মার্কেটে জায়গা করে নেয়া হচ্ছেনা। ওদিকে মানুষজনের ট্রোলও দিনদিন ছাড়িয়ে যাচ্ছে সভ্যতা-ভব্যতার সীমা। কী করা যাবে! এরকম এক সময়েই হুট করে কাটে অচলাবস্থা। ২০১৬ সালের কথা। 'উইংস' নামে  তাদের একটি অ্যালবাম বের হয়। বাকিটা হয়ে যায় ইতিহাস। এই অ্যালবাম মিলিয়ন কপিরও বেশি বিক্রি হয়। এর পরবর্তী এক বছরের মধ্যে 'বিটিএস' আস্তে আস্তে গ্লোবাল মার্কেটের বিগেস্ট ফেনোমেনন হয়ে দাঁড়ায়। এক বিশাল ভক্তশ্রেণী গড়ে ওঠে তাদের। যাদের ডাকা হয় 'বিটিএস আর্মি।' 

'বিটিএস আর্মি' ব্যান্ড বিটিএস এর সবচেয়ে বড় প্রেরণা-শক্তি! 

'বিটিএস' এর এরপরের গল্প সাফল্যের। তাদের প্রতিটি অ্যালবামই ভাংচুর করেছে অজস্র রেকর্ড৷ বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড 'বিটলস' এর পরে তারাই দ্রুততম দ্বিতীয় ব্যান্ড, যারা এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে টানা চারটি ইউএস নাম্বার ওয়ান অ্যালবাম বের করেছে। টপচার্টের শীর্ষস্থান দখল করেছে। এছাড়া 'বিটিএস' এর প্রত্যেক সদস্যেরই ব্যক্তিগতভাবে প্রাপ্তি রয়েছে অনেক, দলগত পুরস্কারও কম নেই তাদের ঝুলিতে। 'বিলবোর্ড গ্লোবাল টু হান্ড্রেড' এবং 'বিলবোর্ড হট হান্ড্রেড' এ তারা আধিপত্য ধরে রেখেছে সাউথ কোরিয়ান একমাত্র ব্যান্ড হিসেবে! এশিয়ান ব্যান্ডগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র বিটিএস-ই বিশ্বের বড় পাঁচটি মিউজিক মার্কেট দখল করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, জাপান এর মিউজিক টপচার্টগুলোতেও বিটিএস এর তীব্র আধিপত্য। 

এই করোনাকালে যেখানে শিল্প-সংস্কৃতি জগতের কাজকর্ম থেমে গিয়েছে অনেকটা, সেখানেও বিটিএস একমেবাদ্বিতীয়ম। মহামারীর বছরে রিলিজ করা তাদের 'ডায়নামাইট' গান এবং 'বি' অ্যালবাম তাদেরকে মুখোমুখি করেছে অসাধারণ এক রেকর্ডের। ইতিহাসের প্রথম ব্যান্ড হিসেবে বিলবোর্ডের টপচার্টের হট-১০০ এবং অ্যালবামের তালিকায় শীর্ষ স্থান দখল করে তারা, তাও মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে! অনলাইনে তাদের ভার্চুয়াল কনসার্ট করার ঘোষণায় ১০ লাখ টিকেট বিক্রি হয়ে যায় নিমেষে। যেটাও এক রেকর্ড! এভাবেই করোনার মধ্যেও থেমে নেই তাদের জয়রথ। তাদের কাজের মাধ্যমেই বিশ্বব্যাপী তাদের ভক্তদের সাথে যুক্ত থাকছেন তারা৷ নিয়মিত। 

লেখার এই পর্যায়ে সজ্ঞানেই 'বিটিএস' এর পুরস্কার-প্রাপ্তির ফিরিস্তি বন্ধ করছি। 'বিটিএস' এর সদস্যদের যে জিনিসটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাদের গানে তারা তাদের সমসাময়িক বিষয়গুলোকেই বেছে নিয়েছে বরাবর। কলকাতায় গানের একটি জনরা বেশ জনপ্রিয়, জীবনমুখী গান। অনেকটা সেরকমই 'বিটিএস', তাদের গানের মধ্যে উঠিয়ে এনেছে তাদের স্ট্রাগলের গল্প। সমাজের নানা অসঙ্গতির গল্প।

এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতেও তারা বরাবরেই সরব। ২০১৮ সালে তারা ইউনিসেফের সাথে যুক্ত হয়ে #BTSLoveMyself' ক্যাম্পেইন শুরু করে। শিশুদের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করার বার্তা দেয়াই ছিলো এই ক্যাম্পেইনের মূল উদ্দেশ্য। নিজেরা এই ক্যাম্পেইন প্রমোট করার পাশাপাশি ফিনান্সিয়াল হেল্পও করে তারা৷ এই ক্যাম্পেইন ২০১৮ সালে ইউনিসেফের 'বেস্ট ইন্সপিরেশন অ্যাওয়ার্ড' পায়।

বর্ণবাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলো তারা! 

OIAA (One in an Army) ইনিশিয়েটিভ এর মাধ্যমে তারা কোরিয়ায় শিক্ষাবৃত্তি ও দুস্থ শিশুদের নিয়ে কাজ করে। রেসিজম, এলজিবিটি মুভমেন্ট, এনভায়রনমেন্ট ইস্যু... এগুলোতেও নিয়মিত দেখা যায় আরএম, জিন, সুগা, জে-হোপ, জিমিন, ভি, জুং কুক...বিটিএস এর এই সপ্তর্ষিমণ্ডলকে। 


বিশ্বব্যাপী বিটিএস এর পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি-কুযুক্তি-অযুক্তির অন্ত নেই। বিটিএসের বিপক্ষে যেমন কিছু সাইকোপ্যাথ বরাবরই লেগে আছে। 'বিটিএস আর্মি' ফ্যানবেইজেও আছে কিছু ফ্যানাটিক। এদের নিয়ে আলাদা আলোচনা করারও কিছু নেই। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বিটিএস যে বার্তাটা দেয়ার চেষ্টা করে তাদের গানের মাধ্যমে, সেটা। তাদের প্রথম প্রকাশিত গান 'নো মোর ড্রিম' এ কোরিয়ার সামাজিক নানা অসঙ্গতি নিয়ে তাদের প্রতিবার জানায় তারা। 'সোশ্যাল অ্যাওয়ারনেস' এর এই স্টাইল থেকে তারা বের হয়নি এখনও। নিজেদের ফলোয়ার কমার ভয়ে বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে যখন বড় বড় ব্রান্ডদের, ব্যান্ডদের, সেলিব্রেটিদের চুপ করে থাকতে দেখি , সেখানে 'বিটিএস' ভিন্নস্রোতের পথচারী। তাদের বড় ফ্যানবেইজকে তারা চেষ্টা করে সমাজের 'সুস্থ স্রোত'এর সাথে যুক্ত রাখার। সে সাথে তারা তাদের প্রতিশ্রুতিকেও মেনে চলছে প্রথম থেকেই। যখন তাদের কেউ চিনতো না, তারা সমাজ সংস্কারের পক্ষে ছিলো সরব। এখন বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় হওয়ার পরেও তারা একইভাবে আছে। শূন্য থেকে শুরু হয়ে শীর্ষস্থান দখল করার পরেও তারা তাদের কর্তব্য ভোলেনি। সে সাথে স্রোতেও গা ভাসায়নি।

'বিটিএস' এর সপ্তর্ষিমণ্ডল! 

'বিটিএস' এর চমৎকারিত্ব ও ক্যারিশমা এখানেই। মোরাল ক্রাইসিস এ তারা তাদের দায়িত্বপালন করতে পিছপা হয়না। তাদের এ স্বকীয় যোগ্যতাই তাদের নিয়ে যাবে বহুদূর, সে আশা করাই যায়।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা