বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে দিনে ১৪ বার সংবাদ পরিবেশন করে বিটিভি। কিন্তু সব খবরেই বিরোধী দল গুরুত্বহীন। এর বদলে সরকারের কোন মন্ত্রী, কোথায় কী বলছেন, কী করেছেন আর উন্নয়নের জোয়ারে দেশ ভাসার তথ্যই কেবল মিলবে বিটিভিতে। শুধু এই সরকার নয়, প্রতিটি সরকারের আমলেই একই অবস্থা...

২৫ ডিসেম্বর বিকেল, ১৯৬৪। ডিআইটি ভবনের উল্টো দিকের পল্টন ময়দানে বিশাল জনসভা চলছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহ সভায় উপস্থিত। তিনিসহ বক্তারা সবাই আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের অবসানের দাবি জানিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। সভা শেষে চারদিক আইয়ুববিরোধী স্লোগানে মুখরিত। 

পল্টনে যখন এই জনসভা চলছে, ডিআইটি ভবনে তখন চলছে ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তান টেলিভিশন কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের প্রস্তুতি। সন্ধ্যা ছয়টায় কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোনেম খান। তাঁরা উদ্বোধন করে গেলেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম টেলিভিশনের। রাত আটটায় যথারীতি টেলিভিশনে প্রথম সংবাদ পরিবেশিত হলো। কিন্তু সেই সংবাদের কোথাও ফাতেমার জনসভার কোনো খবর নেই। বরং রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের নানা গল্প।

আর এভাবেই শুরু হলো গণমানুষের কাছে এ দেশের টেলিভিশনের খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর প্রক্রিয়া। সেই যে শুরু, গত ৫৬ বছরেও সেই পরিস্থিতি বদলায়নি। 

১৯৬৪ সালে যাঁর হাত দিয়ে ঢাকায় টেলিভিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই জামিল চৌধুরী তাঁর এক স্মৃতিকথায় লিখেছেন টেলিভিশনের উদ্বোধন ও ফাতেমা জিন্নাহর জনসভার সেই ঘটনা। তাঁর মতে, ‘সমালোচকেরা প্রায়ই বলেন, বর্তমান টেলিভিশন দর্শকদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ২৫ ডিসেম্বর জন্মলগ্নে আঁতুড়ঘরেই টেলিভিশন দর্শকদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। কারণ কেন্দ্রীয় তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ছিল, পাকিস্তান বেতার থেকে যে সংবাদ পাঠ করা হবে, তার বাইরে কোনো সংবাদ টেলিভিশনে পরিবেশন করা যাবে না। এত প্রতিকূলতার বিপরীতে একমাত্র পথ ছিল অনুষ্ঠানের মান উন্নয়ন।’

১৯৭৩ সালের প্রথম দিকে বাংলাদেশ বেতারে প্রতিদিন বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন বক্তব্যের নির্বাচিত কথা নিয়ে ‘বজ্রকণ্ঠ’ নামে একটা অনুষ্ঠান হতো। সে সময় একটি নীতিনির্ধারণী বৈঠকে বিটিভিতেও একই রকম অনুষ্ঠান করার জন্য সে সময়ের তথ্যসচিব নির্দেশনা দেন তাঁকে। কিন্তু জামিল চৌধুরী সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। কয়েকটি বিষয় নিয়ে কথা-চালাচালির একপর্যায়ে গণভবনে ডাক পড়ে জামিল চৌধুরীর। সেখানে গিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেন, প্রতিদিন ওই রেকর্ড বাজালে দর্শক বিরক্ত হতে পারে। বঙ্গবন্ধু সব শুনে বললেন, তাহলে ওই অনুষ্ঠান করার দরকার নেই। জামিল চৌধুরী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এখন এই কথা কোনো ক্ষমতাসীন নেতা শুনতে চাইবেন না। 

গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা সব সময়ই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলে আসছেন, স্বাধীনতার পর থেকে যখন যারা ক্ষমতায় এসেছে বিটিভিকে নিজেদের প্রচারযন্ত্রে পরিণত করতে চেয়েছে। এ জন্যই একসময় বিটিভির নাম হয়ে যায় ‘সাহেব-বিবি-গোলামের বাক্স’। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর টানা ২১ বছর ৭ মার্চের ভাষণ বিটিভিতে প্রচার করা হয়নি। এমনকি ২০০৪ সালে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার খবরও বিটিভি প্রচার করেনি। 

বর্তমানে বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে ১৪ বার সংবাদ পরিবেশন করে বিটিভি। কিন্তু সব খবরেই বিরোধী দল গুরুত্বহীন। এর বদলে সরকারের কোন মন্ত্রী, কোথায় কী বলছেন, কী করেছেন আর উন্নয়নের জোয়ারে দেশ ভাসার তথ্যই কেবল মিলবে বিটিভিতে। শুধু এই সরকার নয়, প্রতিটি সরকারের আমলেই একই অবস্থা।

‌বি‌টি‌ভির সংবাদ নি‌য়ে নানা প্রশ্ন থাক‌লেও বি‌টি‌ভির অনুষ্ঠান কিন্তু দারুণ ছিলো। বিশেষ করে আমাদের শৈশব কৈশোর তো বিটিভি দেখেই কেটেছে। দারুণ সব নাটক, ম্যাকগাইভার, ইত্যাদি, কার্টুন সবকিছু মিলিয়ে বিটিভি আমাদের শৈশব কৈশোরকে রঙিন করেছে। সংবাদের মান যাই হোক না কেন অনুষ্ঠানের জন্য আজকে জন্মদিনে বিটিভির জন্য অনেক ভালোবাসা। উন্নয়নের গল্প বলতে বলতে সাধারণ মানুষের কথাও একটু বইলেন। শুভ কামনা। যুগ যুগ জিও বিটিভি।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা