'বুলি' নামধারী এই বিষাক্ত সংস্কৃতির নানারকম ধাঁচ আছে, ছাঁচ আছে, ছন্দ আছে, প্রকার আছে। এই পাঁচটি সিনেমা দেখলে সেই ধাঁচ, ছাঁচ, স্বাদের খানিকটা আঁচ পাওয়া যাবে। উপলব্ধি করা যাবে এই বিষবৃক্ষের গভীরতাও...

এবারের 'মা দিবস' এর দিন থেকে বিনোদনজগতে মোটামুটি সোরগোল ফেলে দিয়েছেন চঞ্চল চৌধুরী। অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরেই তাকে নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে। 'তাকদীর' এর ভাইসা  অথবা 'কন্ট্রাক্ট' এর ব্ল্যাক রঞ্জু... তিনি ক্ষণেক্ষণেই হাজির হয়ে পর্দা কাঁপাচ্ছেন। তাঁর ডায়লগ আর অভিনয়ের বিশেষ বিশেষ অংশ ভাইরাল হচ্ছে নিয়মিতই।

কিন্তু এই 'মা দিবস' এ তিনি ভাইরাল হলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে। 'মা দিবস' এ শাখা-সিঁদুর পরিহিত মায়ের সাথে একটি ছবি দিয়েছিলেন তিনি। এরপরেই বুম! একদল সাম্প্রদায়িক মানুষ শুরু করলো সাইবার বুলিং। তিনি কেন হিন্দু, কেন তিনি মুসলমান না, তার অভিনয় আর ভালো লাগবে না... নানাবিধ কথা। যদিও আপামর জনসাধারণের এক বিশাল অংশ এইসব সাম্প্রদায়িক ফ্যানাটিকদের একহাত দেখে নিয়েছে। কিন্তু, এতটুকু প্রতিক্রিয়া যে যথেষ্ট না, সেটা লেখাই বাহুল্য।

সাম্প্রতিক সময়ে যদি আপনি এ দেশের তারকাদের র‍্যান্ডম যেকোনো ছবির নীচের কমেন্ট বক্স খেয়াল করেন, আপনি শিউরে উঠবেন, গা ঘেন্না করবে, গুলিয়ে উঠবে শরীর৷ এতটাই কদর্য সব কথাবার্তা সেখানে। সাইবার বুলিং এর এই বিষবাষ্পে দগ্ধ হওয়া থেকে বাদ যাচ্ছে না কোনো সেলিব্রেটিই। মাঝেসাঝে চমকে উঠি, সত্যজিৎ রায় অথবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি এ সময়ে এসে জন্মাতেন, তাহলে তাদেরকেও হয়তো সহ্য করতে হতো বুলিং এর এই ডিজিটাল রকমফের! 

গায়ের রঙ, দৈহিক আকৃতি, ধর্মবিশ্বাস... আজকাল এমন কোনো ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে সমাজের এই পঁচন এসে পৌঁছায়নি। এরকমই এক বিক্ষুব্ধ সময়ে এসে মনে হলো, বুলিং নিয়ে দেখা যেতে পারে চমৎকার ন্যারেশনের পাঁচটি সিনেমা। এই সিনেমাগুলো খানিকটা হলেও ধারণা দেবে কতটা মারাত্মক হতে পারে 'বুলি' নামক অপসংস্কৃতির ব্যাপ্তি, কতটা অতলান্ত হতে পারে এর প্রভাব! 

১. ওয়েলকাম টু দ্য ডলহাউজ (১৯৯৫)

এই গল্প 'ডন' নামের এক টিনেজ মেয়ের। যাকে নিয়ে পৃথিবীর সবার সমস্যা৷ যাকে তার বাবা-মা ভালোবাসে না। যাকে তার ভাই-বোন দেখতে পারে না৷ পরিবারের সবাই রীতিমতো উপেক্ষাই করে তাকে। স্কুলেও আরেক সমস্যা। সবাই প্রতিনিয়ত বুলি করতে থাকে তাকে। এমনিতেই সে একটু অদ্ভুতুড়ে। সেটারই সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ক্লাসমেটরা। এক ক্লাসমেট তাকে রেপ করারও হুমকি দেয়। বাদবাকিরা এড়িয়ে চলে ডনের সংস্পর্শ। 

এমনিতেই ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তি নেই। এরমধ্যেই ডন ভালোবেসে ফেলে একজনকে। প্রণয়-প্রেম-উপেক্ষা-ঘৃণা বৈপরীত্যের নানা জংশনে হেলতে দুলতে চলতে থাকে ডনের জীবনযাত্রা। 

'টিনএজ কমেডি' ফিল্ম যাদের পছন্দ, তাদের নির্ঘাত ভালো লাগবে এই সিনেমা। ক্রমশ উপেক্ষিত এক ছোট্ট মেয়ের একপশলা ভালোবাসার জন্যে বুভুক্ষু-পনা দেখার জন্যে হলেও দেখা যেতে পারে পারে টড সলনডজ এর 'ওয়েলকাম টু দ্য ডলহাউজ।' 

২.  দ্য লেক (১৯৯৮)

এ সিনেমার গল্প শুরু হয় 'জুরা' নামের এক ছেলেকে দিয়ে৷ যার বাবা খুন হয় তার চোখের সামনেই। এই ঘটনার পরে মা, জুরাকে সাথে নিয়ে ছাড়েন গ্রাম। দুইজনে চলে আসে শহরে। কিন্তু এসময়েই জুরার মানসিক কিছু বিকৃতি দেখা যায়; নানামুখী ঘটনার ক্রমাগত ডামাডোলে। 

শহরের এক স্কুলে ভর্তি করার পর সে শুরু করে বুলি করা। সহপাঠী থেকে শুরু করে স্কুলের সব শিক্ষার্থীরাই মোটামুটি তটস্থ থাকে তার ভয়ে৷ নিত্যনতুন তরিকায় ক্লাসমেটদের শায়েস্তা করা তার নেশায় পরিণত হয়। ক্লাসমেটরাও ভয়েডরে মেনে নেয় এই ভয়ঙ্কর কিশোরটির আনুগত্য। এভাবেই চলছিলো দিনকাল। হঠাৎ করে কী হয় জুরার, অন্যকে শাস্তি দেয়ার বদলে সে নিজেকেই দেয়া শুরু করে অমানুষিক সব শাস্তি। গল্প বদলে যায় ঠিক তখনই। 

বুলিদাতাকে আমরা বরাবরই দেখি  ঘৃণার চোখে৷ অথচ এটা মাথায় রাখি না, মানসিক বৈকল্য বা সংঘাতময় অতীতের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েও অনেকে শুরু করতে পারে মানসিক অসুস্থতার এ নোংরা প্রদর্শনী৷ এ গল্প তাই ভাবাবে অনেক দিন থেকে৷ সে সাথে বাবা-হারা এক সন্তানের দৈন্যদশা দর্শকের চোখকে করবে আর্দ্রও। 

৩. বুলি (২০০১) 

এ সিনেমা কিছু মায়ে খেদানো, বাপে তাড়ানো তরুন ছেলেমেয়ের। যারা পড়াশোনায় ইস্তফা দিয়ে আগ্রহী হয়েছে মদ ও নেশায়৷ বল্গাছাড়া হরিণের মত এরা ঘুরে বেড়ায় ইতস্তত। এদের মধ্যেই আমরা দেখবো দুই বন্ধুর গল্প। ববি এবং মার্টি। এরা বেস্ট ফ্রেন্ড। ববি খানিকটা উগ্র। নেশার ঘোরে থাকে বেশিরভাগ সময়। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বন্ধু মার্টিকেই সে সবচেয়ে বেশি শাপশাপান্ত করে, বুলি করে। 

যদিও এসব করার জন্যে মাঝেমধ্যে সে শাস্তি পায়। তাও কথায় আছে, স্বভাব যায় না ম'লে। সেভাবেই ক্রমাগত মার্টির উপর ববির বুলি বাড়তেই থাকে। এভাবে এগোতে এগোতে গল্পে একটা সময় আসে টার্নিং পয়েন্ট। শশাঙ্ক রিডেম্পশন সিনেমায় আমরা শুনেছি- Everyone has a breaking point. সেটারই বাস্তব দৃশ্যায়ন হয় এই সিনেমায়। সিনেমার মোড় ঘুরে যায় ঠিক তখনই। 

জিম স্কুটজ এর বিখ্যাত বই 'বুলিঃ আ ট্রু স্টোরি অব হাই স্কুল রিভেঞ্জ' অবলম্বনে ল্যারি ক্লার্ক এর এ সিনেমা দেখা যেতে পারে, বুলির ভুক্তভোগীর মনস্তত্ব বোঝার জন্যে৷ 

৪. এলিফ্যান্ট (২০০৩)

সিনেমার নাম 'এলিফ্যান্ট' কেন, সে বিষয়ে পরে জানাচ্ছি। এ সিনেমার শুরু এক সাধারণ হাইস্কুল দিয়ে। যে হাইস্কুলে একগাদা ছেলেমেয়ে। প্রচণ্ড ছটফটে। স্বাভাবিক একটা দিন। প্রকৃতিও শান্ত। আকাশে মেঘ নেই৷ থমথমে বাতাস নেই। মিষ্টি একটা আলো। ব্যাকগ্রাউন্ডে বিটোভেনের 'মুনলাইট সোনাটা।' আপাতদৃষ্টিতে সবকিছুই মনে হচ্ছে নিস্তরঙ্গ, উত্তাপহীন, চুপচাপ। কিন্তু সিনেমার পরবর্তী অংশ থেকে আমরা জানতে পারবো, এই শান্ত প্রকৃতি আদতে ঝড়ের আগমুহূর্তের প্রকৃতি। একটু পরেই আসছে মহাপ্রলয়।

অভিনব স্টোরিটেলিং যত সামনে এগোয়, আমরা দেখতে থাকি, এখানের প্রত্যেকটা ছেলেমেয়ের আছে নিজ নিজ গল্প। সে গল্পগুলো আস্তে আস্তে প্রকাশিত হয়। দেখা যায়, এখানের শিক্ষার্থীরা ক্রমাগত বুলির স্বীকার হচ্ছে। যখন তারা বুলিং এর শিকার হচ্ছে না, তখন তারা নিজেরাই বুলি করছে৷ এভাবে ক্রমশ সময় যখন এগোতে থাকে, আমরা আবিষ্কার করি, বুলিং এর আড়ালে এক অন্যরকম গল্পকে। সেখানেই চমক।

কান ফিল্ম ফেস্টিভালে 'বেস্ট ডিরেক্টর' এর পদক জেতেন সিনেমার পরিচালক গাস ভ্যান সান্ট। পাশাপাশি আরো দুটি পদক জেতে 'এলিফ্যান্ট।' সিনেমার নাম 'এলিফ্যান্ট' কেন সে তথ্য জানাই। সেই বিখ্যাত গল্পটা মনে আছে যেখানে ছয়জন অন্ধ মানুষ হাতির শরীরের ছয়টি অংশে হাত দিয়ে অনুভব করে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলো? আমাদের জীবনও অনেকটা এরকম। অন্যদের জীবন সম্পর্কে আমরা পুরোটা না জেনেই ক্রমাগত করতে থাকি একের পর এক মন্তব্য। করতে থাকি বুলি। কটাক্ষ। কটুক্তি। অন্ধের হাতি দেখার মতন অনেকটা হয়ে যায় আমাদের অবস্থা। সেখান থেকেই সিনেমার এ নামকরণ। 

৫. দ্য ক্লাস (২০০৭)

স্কুল জীবনে একটুআধটু মারামারি, গালাগালি, বুলি বোধহয় আমরা সবাই করেছি। প্রণয়জনিত রেষারেষি, পরীক্ষার হলে ঠেসাঠেসি আর ফুটবল মাঠে বল পেষাপেষি... সবই তো স্কুলজীবনের অংশ। কিন্তু বুলিং এর ফলশ্রুতিতে যে রক্তগঙ্গাও বয়ে যেতে পারে মাঠের সবুজ ঘাসে, তা কি কস্মিনকালেও কেউ কখনো ভেবেছিলো? 

যদি না ভেবে থাকেন, 'দ্য ক্লাস' সিনেমা দেখতে পারেন। পনেরোজন মানুষ মিলে এই সিনেমার গল্প লিখেছে! আর ইলমার রাগ করেছেন পরিচালনা। সিনেমার গল্পে আমরা দেখতে পাই নানা স্তরের মানুষজনকে। ছেলেমেয়েকে নিয়ে প্রচণ্ড প্রটেক্টিভ বাবা-মা; ছেলেমেয়েকে নিয়ে তীব্র উদাসীন বাবা-মা। দায়িত্বজ্ঞানহীন শিক্ষকমহল; প্রচণ্ড কর্তব্যপরায়ণ শিক্ষকমহল। স্কুলের বখে যাওয়া ছেলেমেয়ে; স্কুলের রগচটা ছেলেমেয়ে। এদের সবার যৌথ অংশগ্রহনে ভায়োলেন্সের গল্পই 'ক্লাস।' যেখানে বুলিং থেকে বন্ধুদের বাঁচাতে একপর্যায়ে সামনে উঠে আসে প্রোটাগনিস্ট একজন। গল্পের মোড় ঘুরে যায় তখনই। স্নায়ুর উপর তীব্র চাপ সৃষ্টিকারী এ সিনেমা অবশ্যই রেকোমেন্ডেড। 

বুলি, সাইবার বুলি, বডিশেইম... উত্ত্যক্ত করার এই বিষাক্ত সংস্কৃতির নানারকম ধাঁচ আছে, ছাঁচ আছে, ছন্দ আছে, প্রকার আছে। এই পাঁচটি সিনেমা দেখলে সেই ধাঁচ, ছাঁচ, স্বাদের খানিকটা আঁচ পাওয়া যাবে। সে সাথে এই বিষাক্ত সংস্কৃতির গভীরতা নিয়েও মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যাবে চিন্তার ক্ষেত্র।

'বুলি' সংস্কৃতি শুরু হয় সেই শৈশব থেকেই! 

অবশেষে শেষে এসে এই কথাই বলে যাই, বুলি করে বুক ফুলিয়ে যারা ক্রমশ জ্বাজ্জল্যমান, সেসব মানুষের বোধোহয় হোক। মস্তিষ্কে শুভবুদ্ধির উদয় হোক। কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা থাকবে তাদের জন্যে। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা