গল্প বলতে জানলে অর্থ, কুশীলব, যন্ত্রপাতির কারিকুরি মুখ্য না মোটেও। মুখ্য- গল্প বলার ইচ্ছে। মুখ্য- গল্প বলার মুন্সিয়ানা। সেজন্যেই তাই আশা রাখি, 'জাগো বাহে' দেখে অনুপ্রাণিত হবেন এদেশের বাদবাকি গুণী নির্মাতারা। যুদ্ধদিনের গল্প শুনতে চাওয়ার যে আকাঙ্খা আমাদের, সে আকাঙখা পূরণ করতে ক্রমশই এগিয়ে আসবেন তারা...

মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন কিংবা নিদেনপক্ষে ইতিহাসের কোনো নির্মাণ ভাবলেই কেন যেন আমাদের চোখে বরাবরই ভেসে ওঠে- একগাদা আদর্শবাদী চরিত্র, আন্দোলন, প্লাকার্ড-গুলি-রক্ত-যুদ্ধ। অথচ যদি জহির রায়হান, সাদাত হোসেন মান্টো, কৃষন চন্দর'দের লেখার দিকে তাকাই, দেখবো, যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেও কীসব মর্মস্পর্শী গল্প লিখে গিয়েছেন তারা! কী সব সত্যভাষণ মিশিয়ে দিয়েছেন লেখায়! তাদের লেখা সেসব গল্পের চরিত্র কি খুব বেশি? মোটেও না। ঘটনার চৌহদ্দি কি অনেক বড়? তাও না। তাহলে, তবু কেন এ গল্পগুলো ভাবায়? আলোড়িত করে? কারণ একটাই, ঠিকভাবে গল্প বলতে পারলে, নাড়িয়ে দেয়া যায় যে কাউকেই। সেজন্যে দক্ষযজ্ঞের প্রয়োজন নেই। বড়সড় ক্যানভাসের প্রয়োজন নেই। এ প্রসঙ্গে রবিঠাকুরও যেমন বলেছিলেন- 

ছোটো প্রাণ, ছোটো ব্যথা, ছোটো ছোটো দুঃখকথা
নিতান্ত সহজ সরল,
সহস্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি
তারি দু-চারটি অশ্রু জল।

এরকম দু-চারটি অশ্রু জল নিয়েই চরকি'তে এসেছিলো এক বিশেষ অমনিবাস। 'জাগো বাহে' নামের সেই অমনিবাসের সমগ্রজুড়ে তিনটি গল্প। বায়ান্ন, সত্তর, একাত্তরের গল্প। সে গল্পে লুকিয়ে রইলো কিছু অসমাপ্ত আখ্যান। মহাকালের জলাশয় থেকে আঁজলা ভরে তুলে আনা হলো সে সব আখ্যানকে। দেয়া হলো পূর্নতা। নির্মিত হলো ত্রয়ী উপাখ্যান। 'শব্দের খোয়াব', 'লাইটস, ক্যামেরা, অবজেকশন' এবং 'বাংকার বয়।' প্রথম দুই গল্প নিয়ে প্রাথমিক মুগ্ধতা কাটেনি। এরইমধ্যে আসা তৃতীয় গল্প- 'বাংকার বয়' মুগ্ধ করলো আরেক দফা। পাশাপাশি উপলব্ধি করালো সেই পুরোনো কথামালা- 

জগতের শত শত অসমাপ্ত কথা যত,
অকালের বিচ্ছিন্ন মুকুল,
অকালের জীবনগুলো, অখ্যাত কীর্তির ধুলা,
কত ভাব, কত ভয় ভুল-

'বাংকার বয়' মূলত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন এক বাংকারে আটকে পড়া শিকার ও শিকারীর গল্প। গল্পের শুরুতেই যেমন দেখতে পাই- ইতস্তত পায়ে হেঁটে যুদ্ধের এক পরিত্যক্ত বাংকারে নামে 'আকবর' নামের এক বাঙ্গালী যুবক। এবং বাংকারে নেমেই সে উপলব্ধি করে, পাকি আর্মিদের এ আশ্রয়স্থলের সব সৈন্যই হয়েছে গত। পঁচা-গলা-অর্ধগলা মৃতদেহ, মৃতদেহের উপর দিয়ে হুটোপুটি করে যাওয়া ইঁদুর আর থমথমে যুদ্ধের সরঞ্জাম দেখতে দেখতে এগোতে থাকা এ অনুসন্ধানী কিশোর আচমকা অনুভব করে, এ বাংকারে সে একা না। এখানে আছে এক জীবিত পাকিস্তানি সৈন্যও। কিছুক্ষণের মধ্যে মুখোমুখিও হয় দু'জন।  শিকার ও শিকারীর মধ্যে শুরু হয় নাটকীয়তা। টানাপোড়েন-টেনশন-সাসপেন্স। এবং শেষে এসে খানিকটা চমকও থাকে। কী সেই চমক, তা আগেই বলা সমীচীন না মোটেও। সেজন্যে দেখতে হবে নির্মাণ। 

বাংকার বয়! 

বেশ ক'বছর আগে 'নো ম্যান'স ল্যান্ড' নামে বসনিয়ান এক সিনেমা দেখেছিলাম৷ যেখানে বসনিয়ান যুদ্ধের মাঝামাঝি 'নো ম্যান'স ল্যান্ড' এ আটকে পড়ে দুই প্রতিপক্ষ সৈন্য। শিকার ও শিকারী। শুরু হয় ঘাত-প্রতিঘাত৷ সময় যত গড়ায়, পরিস্থিতি হতে থাকে ঘোরালো, দুর্বিষহ। 'বাংকার বয়' দেখার শুরুতেই 'নো ম্যান'স ল্যান্ড' এর কথা মনে পড়ে গেলেও গল্প যত সামনে এগোয়, বুঝতে পারি- বাংকারে আটকে পড়া শিকার ও শিকারীর এই দৃশ্যপট ছাড়া দুই গল্পের মিল খুব সামান্যই। 'বাংকার বয়' এর পুরোটাজুড়েই যেমন পাকিস্তানী সৈন্য ও বাঙালী কিশোরের কথোপকথন, সে কথোপকথনে ক্রমশ উঠে আসা সময়ের অভিশপ্ত দিনলিপি, কিছু বিষাদ, কিছু আক্ষেপ, কিছু প্রতিশোধ। 

এ নির্মাণে চরিত্রের ব্যাপ্তি খুব একটা নেই। সর্বসাকুল্যে দুজন মানুষই প্রোটাগনিস্ট৷ তাদের মধ্যবর্তী সংকটের গল্পও যে খুব টানটান, এমনটাও না৷ খানিকটা স্লোবার্ণ ট্রিটমেন্টের এ গল্প কিছু দর্শকের যে খুব একটা পছন্দ হবে না, সেটাও মোটামুটি নিশ্চিত। কিন্তু গল্পের 'ধীরে বহো' নীতিতে যদি কারো মাথাব্যথা না থাকে, তাহলে এ নির্মাণ শেষপর্যন্ত এসে পয়সা উসুল করবে, সেটাও হলফ করে বলা যায়। 

নির্মাতা সুকর্ন সাহেদ ধীমান শুরু থেকেই যে সাসপেন্সের চাদর জড়িয়ে দিয়েছিলেন গল্পের শরীরে, তা বজায় ছিলো শেষতক। তাছাড়া সেট ডিজাইনেও লক্ষ্য করেছি চমৎকারিত্ব। কুয়াশা-মাখানো অশরীরী স্থান, চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া, মাঝখানে শবদেহ-সজ্জিত এক বাঙ্কার...সিনেম্যাটোগ্রাফীর চমকেই মুগ্ধতা বেড়েছে প্রথমে৷ এরপর- অভিনয়৷ যদিও অভিনয় আরেকটু খোলতাই হতে পারতো। মোস্তাফিজুর নুর ইমরান যেরকম দুর্দান্ত অভিনয় করেন, সেটার পুরোপুরি এ নির্মাণে 'হাফিজ' নামের বেলুচ আর্মির চরিত্রে আসেনি, বলাই বাহুল্য। ওদিকে, আব্দুল্লাহ আল সেন্টু, 'আকবর' চরিত্রে মোটামুটি ভালো করেছেন। দু'জনের অভিনয়ই সবমিলিয়ে ভালো। তবে আক্ষেপ এটাই, 'অসাধারণ' বলার সুযোগ ছিলো না। তবে এটাও ঠিক, গল্প, সিনেম্যাটোগ্রাফী কিংবা অন্যরকম এক ক্লাইম্যাক্সের সুবাদে অভিনয়-জনিত আক্ষেপ কারো কাছে খুব একটা প্রকট হবে না বলেই বিশ্বাস। 

এই নির্মাণ দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, 'জাগো বাহে' সিরিজের কথা। যুদ্ধদিনের ডামাডোল নিয়ে নির্মাণ, অথচ কী দারুণভাবেই না সেখানে এসেছে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম জীবনবোধ, মেটাফোর, সংঘাত, প্রতিবাদ। একজন ছাপোষা চাকুরীজীবির বাংলা বলতে না পারার আক্ষেপ, একজন নির্মাতার সিনেমা বানাতে না পারার বিষাদ কিংবা এক বাঙ্গালী কিশোরের জীবন-মৃত্যু'র সংকটকে উপজীব্য করে স্বল্পদৈর্ঘ্যের বয়ান। তিনটি গল্প মেরেকেটে দেড় ঘন্টা হবে হয়তো। চরিত্রও সর্বসাকুল্যে খুব বেশি না৷ অথচ গল্পগুলোর গভীরতা? সে গভীরতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে পারস্যের কবি জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি'র সেই উক্তি-

ক্ষতই সেই স্থান, যেখান দিয়ে আলো প্রবেশ করে হৃদয়ে।

'জাগো বাহে' অমনিবাস! 

'মুক্তিযুদ্ধ' তো আমাদের যাবজ্জীবন ক্ষত। সেই ক্ষত দিয়েই যেন ভেতরে প্রবেশ করে গল্পগুলো। অন্দরমহলের আঁধারকে বিদীর্ণ করে। উপলব্ধি করায়- গল্প বলতে জানলে অর্থ, কুশীলব, যন্ত্রপাতির কারিকুরি মুখ্য না মোটেও। মুখ্য- গল্প বলার ইচ্ছে। মুখ্য- গল্প বলার মুন্সিয়ানা। সেজন্যেই তাই আশা রাখি, 'জাগো বাহে' দেখে অনুপ্রাণিত হবেন এদেশের বাদবাকি গুণী নির্মাতারা। যুদ্ধদিনের গল্প শুনতে চাওয়ার যে আমাদের আকাঙ্খা, সে আকাঙখা পূরণ করতে এগিয়ে আসবেন তারা। নির্মাণ নাতিদীর্ঘ হোক, স্বল্প গণ্ডির হোক, সমস্যা নেই। তবু 'মুক্তিযুদ্ধ' নিয়ে ক্রমাগত নির্মাণ হোক। সীমাবদ্ধতাকে টেক্কা দিয়ে গল্পের চমৎকারিত্ব হোক। তাহলেই সর্বাঙ্গসুন্দর! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা