কিভাবে চড়াই হত্যাকারীকে ধরা হবে, কেনই বা খুনি ধরে ধরে শুধু 'চড়াই হত্যা' করছে, এর পেছনে কার্যকারণও বা কি, এই প্রশ্নগুলোও 'প্রশ্নবোধক চিহ্ন' হয়ে ঝুলে থাকে ওয়েব সিরিজের পুরোটা সময়ে। এবং শেষে এসে যখন ঘটনাগুলোর সাথে খানিকটা রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক যোগাযোগ পাওয়া যায়, খানিকটা সামাজিক বার্তারও সুলুকসন্ধান আসে, উপমহাদেশের 'চড়াই' এর ইতিহাসেরও খানিকটা অনুসন্ধান আসে... সেগুলোও আশ্চর্য সহাবস্থানে মিশে যায় গল্পের সাথে!

লালবাজার পুলিশের সবচেয়ে অকর্মণ্য ডিপার্টমেন্ট- ডিপার্টমেন্ট অব আনইউজুয়াল কেসেস। যত সব বস্তাপঁচা অদ্ভুতুড়ে ঘটনা, যেগুলোর কোনো সুরাহা হয়না কিংবা যেগুলো নিয়ে কালক্ষেপণ করাকে সময়ের অপচয় বলে মনে করা হয়, সেসব কেসের শেষ স্থান হয় এখানে। আবার, যেসব পুলিশ অফিসার একটু ঘাড়ত্যাড়া, যাদেরকে খানিকটা সবক দেয়ারও প্রয়োজন, তাদেরকেও মাঝেমধ্যে হাওয়া-বদলের জন্যে পাঠিয়ে দেয়া হয় এই নাগরিক 'আন্দামান' এ। অনেকটা পিকনিকের আমেজে ঢিমেতালে চলে এখানের কাজকর্ম। এবং ঠিক এভাবেই, পুলিশ স্টেশনের একেবারে চিলেকোঠায় একচিলতে ঘর, সে ঘরের ধূলিময় আসবাব আর সেসবের মাঝখানেই মঞ্চস্থ হওয়া 'ডিপার্টমেন্ট অব আনইউজুয়াল কেসেস' এর একেকটা মন্থর দিন দিয়ে শুরু হয় 'ব্যাধ' এর গল্প।

এই অদ্ভুতুড়ে ডিপার্টমেন্টে একদিন আসে শৌভিক নামের এক তরুণ পুলিশ-কর্মী। তার সাথে পরিচয় হয় ডিপার্টমেন্টের হেড 'কানাই বাবু'র। প্রথম পরিচয় থেকে খুনসুটি, সেখান থেকে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। প্রতিদিন একই গৎয়ের অলস সময়, ছাদে বসে তাস পেটানো আর ভুলভাল খাওয়াদাওয়া- এটাই দৈনন্দিন গড়পড়তা রুটিন। এরইমধ্যে খানিকটা বৈচিত্র্য আসে। জানা যায়- পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু গ্রামে অগুনতি চড়াই হত্যা করছে কেউ একজন। যদিও খুনিকে চাক্ষুষ দেখেছে কেউ কেউ। কিন্তু তাদের বর্ণনাতেও বিস্তর দোটানা, অস্পষ্টতা। বলাবাহুল্য, খানিকটা ভিন্ন দ্যোতনার এই কেস মনোযোগ আকর্ষণ করে 'অস্বাভাবিক ঘটনা' বিভাগের। ফলশ্রুতিতে, এই কেসের সুরতহাল করতে ময়দানে নেমে পড়েন কানাই ও শৌভিক। গল্প এগোয়।

অনির্বাণ ভট্টাচার্য'কে অন্য অবতারে বেশ ভালো লাগলো! 

রাজর্ষি দাশ ভৌমিকের উপন্যাস 'চড়াই হত্যা রহস্য' অবলম্বনে নির্মিত এ ওয়েব সিরিজের শুরুতেই জানতে পারা যায়- এই চড়াই হত্যাকাণ্ডের পেছনে পালের গোদাটি আসলে কে। অর্থাৎ 'হু ডিড দিস' এর সাসপেন্সে দর্শককে না রেখেই ওয়েব সিরিজের শুরুতেই খুনীর পরিচয় খোলাসা করে দিয়েই শুরু হয় গল্প বুনোটের কাজ। যদিও প্রথমেই হন্তারকের পরিচয় খোলাসা করায় গল্পের আকর্ষণ যে মাঠে মারা যায়, এরকমও না বিষয়টা। বরং টানটান স্ক্রিনপ্লে'র জন্যে পুরো সময়টাই বেশ গতিশীল থাকে। কিভাবে এই খুনিকে ধরা হবে, কেনই বা খুনি ধরে ধরে শুধু 'চড়াই হত্যা' করছে, এর পেছনে কার্যকারণও বা কি, এই প্রশ্নগুলোও 'প্রশ্নবোধক চিহ্ন' হয়ে ঝুলে থাকে পুরোটা সময়ে। এবং শেষে এসে যখন ঘটনাগুলোর সাথে খানিকটা রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক যোগাযোগ পাওয়া যায়, খানিকটা সামাজিক বার্তারও সুলুকসন্ধান আসে, উপমহাদেশের 'চড়াই' এর ইতিহাসেরও খানিকটা অনুসন্ধান আসে- সেগুলোও আরোপিত মনে হয় না খুব একটা। বরং গল্পের সাথে পারস্পরিক এক সহাবস্থানই তৈরী হয় এই ঘটনাপুঞ্জির। 

থমথমে কুয়াশায় রহস্যের আবহ! 

এবং এই জমাটি গল্পের নির্মাণ 'ব্যাধ' এর অনেকটুকুই টেনে নেন গুণী অভিনেতা রজতাভ দত্ত। 'ডিপার্টমেন্ট অব আনইউজুয়াল কেসেস' এর বড়কর্তা 'কানাই দা' চরিত্রে তার যে অভিনয়, সে অভিনয়ে বেশ কিছু লেয়ারের উপস্থিতি ছিলো প্রবল। প্রচণ্ড হাসিখুশি রসিক মানুষ তিনি, আবার তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে একরোখা বিপ্লবীও, পাশাপাশি তার আছে কিছু ভীষণ ব্যক্তিগত গল্পও; এসব মিলেমিশে বহু চলকের যে চরিত্র, এ চরিত্রকে নিয়ে যদি পরবর্তীতে 'স্পিনওভার' করা হয়, হলফ করে বলা যায়- সেটিও বেশ জনপ্রিয় হবে। প্রচণ্ড রঙিন এই 'কানাই দা' এবং এই চরিত্রে রজতাভ দত্ত ছিলেন এই সিরিজের প্রথম প্রাপ্তি। বাদবাকি যারা অভিনয় করেছেন, তারাও কেউ খারাপ নন। অনির্বাণ চক্রবর্তীকে অন্যরকম এক চরিত্রে দেখলাম এবার। ভালো লেগেছে। খরাজ মুখার্জী অল্প সময়ের জন্যে এলেও নামের প্রতি সুবিচার করেছেন। তবে সৌমেন বোস আরেকটু ভাল করতে পারতেন। উন্নতির জায়গা ছিলো। বাদবাকি যারা ছিলেন, মোটামুটি ঠিকঠাক সবাই। কেউই খারাপ নন। 

অনবদ্য রজতাভ দত্ত! 

যদিও এই সিরিজের গল্প, স্ক্রিনপ্লে কিংবা অভিনয়ে খুব একটা আক্ষেপ নেই, কিন্তু তবুও কিছুটা আক্ষেপ আছে কয়েক জায়গায়। প্রথম আক্ষেপের জায়গা- শব্দবিন্যাস। এটা বোঝা দরকার- অনেক ক্ষেত্রে নীরবতাও খুব সরবভাবে জমিয়ে দিতে পারে গল্পকে। 'ব্যাধ' এ সেই বিষয়টি ছিলো অনেকটাই অনুপস্থিত। শব্দবিন্যাস, কুশীলবদের কথাবার্তা কিংবা বিজিএম এর প্রয়োগ- সবটাই কেমন যেন খাপছাড়া। বিক্ষিপ্ত। এখানে আরেকটু যত্নবান হওয়া বিশেষ দরকার ছিলো। দ্বিতীয়ত, ক্লাইমেক্স আরেকটু টানটান হওয়ার দরকার ছিলো। যেভাবে গল্পের যবনিকাপাত হয়েছে কিংবা মুখোমুখি দ্বৈরথে যে অ্যাকশন সিকোয়েন্সগুলো এসেছে, সেগুলোর প্রত্যেকটাই 'অ্যামেচার'টাইপ আবহ দিয়েছে। খানিকটা পেশাদারিত্ব অনুপস্থিত ছিলো এখানেও। 

বাদবাকি পুরোটুকুই উপভোগ্য। এবং সেটা প্রত্যাশিতই ছিলো। নির্মাতা অভিরূপ ঘোষের আগের কাজ অর্থাৎ- 'জম্বিস্থান' কিংবা 'রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ'এ তার পরিচ্ছন্ন পরিচালনার যে নিদর্শন, সেগুলোর পর থেকেই এই নির্মাতাকে নিয়ে বিস্তর এক প্রত্যাশা তৈরী হয়েছে। 'ব্যাধ'এ সে প্রত্যাশার খামতি তো হয়ইনি, বরঞ্চ, এ গল্পের বরাতে যে বার্তা তিনি দিতে চেয়েছেন, সেটিও বেশ সফলভাবেই দিতে পেরেছেন তিনি। সবমিলিয়ে তাই 'ব্যাধ' রেকোমেন্ডেড এক সিরিজ। খানিকটা চাপান-উতোর ও ঈষৎ আক্ষেপ বাদ দিলে, পরিচ্ছন্ন এক সমসাময়িক বার্তাবাহী ওয়েব সিরিজ হিসেবে 'ব্যাধ' প্রাসঙ্গিকও। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা