ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে হিসেব করলে তো নাটক-সিনেমা সবই হারাম। সেই নাটক সিনেমা দেখে আবার অন্য ধর্মাবলম্বী অভিনেতাকে নিজের ধর্মের পথে ডাকাটা কি হিপোক্রেসি নয়?

সেলিব্রেটি বুলিং ব্যাপারটা সারাবিশ্বেই খুব কমন। কোন সেলিব্রেটিকে দলবেঁধে আক্রমণ করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ট্রল করা- এরকমটা হরহামেশাই ঘটে। ভারত-পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ কিংবা ইউরোপ-আমেরিকা অথবা জাপান-কোরিয়া, সর্বত্রই এমন নজির দেখা যায়। মাঝেমধ্যেই নিজেদের বিতর্কিত কাজকর্মের কারণে, বা কোন নির্দিষ্ট পক্ষাবলম্বনের কারণে নেটিজেনদের আক্রমণের মুখে পড়েন সেলিব্রেটিরা। 

তবে এসব আক্রমণের মূল কারণ হয়ে থাকে ব্যক্তির কাজ। হয়তো কোন সেলিব্রেটির গান বা অভিনয় দর্শকের ভালো লাগেনি, তার ব্যবহার কিংবা তার দেয়া কোন বক্তব্য কারো মনোঃপুত হয়নি, সেক্ষেত্রে সেই সেলিব্রেটিকে ট্রল করতে দেখা যায়। ক্ষেত্রবিশেষে ব্যাপারটা নোংরামির দিকেও গড়ায়, সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ পেলে বাইরের দেশগুলোতে পুলিশ তড়িৎ অ্যাকশনও নেয়। একারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময় সতর্ক থাকতে হয় সবাইকে। 

বাংলাদেশ খুব বিচিত্র একটা দেশ। এখানে সেলিব্রেটিদের গালাগালি করার জন্য কোন সুনির্দিষ্ট কারণের দরকার হয় না। আজ শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে, যাই, জয়া আহসানের ছবির নিচে দুটো গালি দিয়ে আসি। ঘুম আসছে না, যাই, কার বিয়ে হচ্ছে, কে কাকে ডিভোর্স দিচ্ছে, সেসব নিয়ে ছিদ্রান্বেষণ করে আসি। মাঝরাতে প্রিয় দল চ্যাম্পিয়ন্স লিগে হেরে গেছে, মন ভালো করার জন্য মিথিলার পোস্টে গিয়ে তাকে নোংরা সম্বোধনে অভিহিত করি- এই হচ্ছে আমাদের মানসিকতা। আমরা ভেবে নেই, এসব করে দেশ ও জাতির বিরাট উন্নয়ন সাধন করে ফেলেছি বুঝি, একুশে পদক পাওয়াটা এখন কেবল সময়ের দাবী! 

গতকাল মা দিবস পালিত হয়েছে গোটা বিশ্বজুড়ে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মায়ের সঙ্গে ছবি দিয়ে দিনটিকে উদযাপন করেছেন। ফেসবুকের নিউজফিড ভর্তি হয়ে ছিল মা আর সন্তানের ছবিতে। কেমন অপার্থিব একটা অনুভূতি! অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও বাদ যাননি এই তালিকা থেকে। অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীও। নিজের মায়ের সঙ্গে একটা ছবি আপলোড দিয়েছিলেন তিনি ফেসবুকে। আর সেই ছবি নিয়েই নোংরামির উৎসবে মেতে উঠেছে কিছু অকালকুষ্মাণ্ড।

চঞ্চল চৌধুরীর আপলোড দেয়া সেই ছবিতে তার মায়ের কপালে সিঁদুর দেখা যাচ্ছে। হিন্দু রমণীর পরিপাটি বেশভূষা। আর এটি দেখেই গায়ে আগুন ধরেছে কিছু লোকের। তাদের দাবী, তারা নাকি জানতো না চঞ্চল চৌধুরী যে হিন্দু ধর্মাবলম্বী। না জেনে তারা চঞ্চলকে পছন্দ করেছে, কিন্তু চঞ্চলের ধর্মীয় পরিচয় পেয়ে ক্ষেপে উঠেছে তারা। শুরু করেছে উগ্র আস্ফালন, যেন এই বঙ্গে হিন্দু হওয়াটা কোন অপরাধ, শাখা-সিঁদুর পরাটাও অপরাধ! 

ব্যক্তি আক্রমণের পর চঞ্চলের প্রতিক্রিয়া

চঞ্চল পেশাদার অভিনেতা, তাকে কেউ পছন্দ করলে তার অভিনয়ের জন্য পছন্দ করবে। চঞ্চল হিন্দু নাকি মুসলিম- এটা তো তাকে পছন্দ বা অপছন্দ করার প্যারামিটার হতে পারে না। যারা এভাবে কাউকে পছন্দ বা অপছন্দ করে, তারা উগ্র সাম্প্রদায়িক। এমন মানুষ যে চারপাশে অজস্র, সেসবের নজির হরহামেশাই দেখা যায়। মা দিবসে চঞ্চলের এই ছবির কারণে আরও একবার চোখে পড়লো। নইলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো যে, মা দিবসে নিজের মায়ের সঙ্গে ছবি আপলোড দিয়েও কাউকে গালি হজম করা লাগতে পারে! 

এরা ফেসবুকে বসে নিজেদের পছন্দমতো ধর্মের বয়ান দেয়, নায়ক-নায়িকার পোস্টে গিয়ে রেখে আসে নোংরামির নজির। সব ধর্মই পরমত সহিষ্ণুতা শেখায়, শেখায় অন্যের ধর্মকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতে। অথচ ধর্ম পালনের নামে এরা অন্যের ধর্মকে আক্রমণ করে, ছোট করে, 'আমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ ধর্ম' টাইপের একটা অন্ধ অহমিকায় ভোগে এরা। ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে হিসেব করলে তো নাটক-সিনেমা সবই নিষিদ্ধ। সেই নাটক সিনেমা দেখে আবার অন্য ধর্মাবলম্বী অভিনেতাকে নিজের ধর্মের পথে ডাকাটা কি হিপোক্রেসি নয়? নিজের নামাজ, নিজের প্রার্থনার ঠিক নেই, এরা পড়ে আছে অন্যকে নিজের ধর্মের পথে ডেকে শর্টকাটে স্বর্গলাভের আশায়। 

এই অস্থির সময়টা কিন্তু এক-দুইদিনে তৈরী হয়নি। এর গ্রাউন্ড প্রস্তুত হয়েছে অনেকটা সময় ধরে, অনেকগুলো বছর ধরে। মোশাররফ করিম যখন ধর্ষণের পেছনে নারীর পোষাকের কোন দায় নেই বলে ধর্মান্ধদের আক্রোশের মুখে পড়েছিলেন, তখন তার পাশে আমরা দাঁড়াতে পারিনি। মোশাররফ করিমকে তখন নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই ক্ষমা চাইতে হয়েছিল, কোন ভুল না করেও। 

সাফা কবীর যখন পরকালে বিশ্বাস করেন না বলে তোপের মুখে পড়েছিলেন, সেটাকে তার ব্যক্তিগত অভিমত হিসেবে সমর্থন না দিয়ে আমরা বরং চুপ থেকেছি, আক্রমণকারীরা ভেবেছে, মাঠ তো খালি, প্রতিপক্ষ নেই কেউ, কেউ বাধা দেবে না। এসব ভেবে তাদের আরও বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। গত কয়েক বছরে জয়া আহসান থেকে মিথিলা কিংবা অন্য কোন সেলিব্রেটিকে যখনই এভাবে দলবেঁধে নোংরাভাবে ব্যক্তি আক্রমণ করা হয়েছে, আমরা আক্রান্তদের সমর্থন দিতে পারিনি, মৌনব্রত গ্রহণ করেছি, তারকা হলে এসব উপদ্রব সামলাতে হবেই- এমনটা ভেবে নিয়েছি। আজকের এই অবস্থা তৈরির পেছনে আমাদের দায়টাও তাই কম নয়। 

একদল লাইফলেস মানুষ, ব্যক্তিগত জীবনে যাদের কোন অর্জন নেই, অন্যকে গালি দেয়া, ফালতু কমেন্ট করে লাইক কামানোটাকেই যারা অর্জন ভাবে, দিনমান যারা হতাশায় ভোগে, আর সেই হতাশা উগরে দেয় কোন সেলিব্রেটির পোস্টে গিয়ে- এই লোকগুলোর মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন। ইন্টারনেট ব্যবহার ওবং ফেসবুক একাউন্ট খোলার জন্য যে শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং মানসিক পরিপক্কতার একটা মাপকাঠি থাকা প্রয়োজন, সেটা এদেরকে দেখলেই বোঝা যায়।

চঞ্চল তার মায়ের সঙ্গে ছবি দেয়ায় যাদের মনোবেদনা হয়েছে, তাদেরকে স্পষ্ট করে কিছু কথা জানিয়ে দেয়া দরকার। এই দেশ যতটা মোশাররফ করিমের, ততটাই চঞ্চল চৌধুরীর, ততটাই পার্থ বড়ুয়ার, এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর। এমনকি যারা ধর্ম মানেন না, তাদেরও সমান অধিকার প্রাপ্তির কথা নিশ্চিত করেছে এদেশের সংবিধান। এই অধিকার কেড়ে নেয়ার অধিকার কারো নেই, অন্যের ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করার অধিকারও কারো নেই। যারা এই কাজটা করার চেষ্টা করবে, তাদের জায়গা মুক্ত পৃথিবীতে নয়, বরং জেলখানার চৌদ্দ শিকের ভেতরে। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা