বাংলাদেশে 'থ্রিডি অ্যানিমেশন' ক্ষেত্রটিতে ছিটেফোঁটা উন্নতিও ঘটেনি বিগত এতগুলো বছরে। সেরকম এক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে 'চিলেকোঠার সেপাই; The Smoker' আমাদের আশাবাদী করে৷ অল্প রসদ এবং সীমাবদ্ধ ক্ষমতা নিয়েও যে অসাধ্যসাধন করা সম্ভব, সেটার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায় এই কাজ...

'চিলেকোঠার সেপাই' শুনলে প্রথমে মনে পড়ে- আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বিখ্যাত উপন্যাসটির কথা। একই টাইটেলে আর্টসেল ব্যান্ডের এক দুর্দান্ত গানও আছে। কিন্তু এখন থেকে 'চিলেকোঠার সেপাই' শুনলে উপন্যাস, গানের পাশাপাশি মাথায় আসবে একটি ছোট অ্যানিমেশন ফিল্মের কথাও। গত চৌদ্দ এপ্রিলে যেটা মুক্তি পাওয়ার পরে বেশ আলোড়নই তুলেছে আশেপাশে। ইউটিউব চ্যানেল 'RnaR' সম্প্রতি এই অ্যানিমেটেড ফিল্মকে রিভিউ করার পরে আবার যাকে নিয়ে শুরু হয়েছে মাতামাতি। 

'চিলেকোঠার সেপাই (The Smoker)' বাংলাদেশে বসে নির্মান করা দারুণ একটি থ্রিডি অ্যানিমেটেড ফিল্ম। আমাদের দেশে অ্যানিমেটেড ফিল্ম/শর্টফিল্ম এর কাজ হয়ইনা বলতে গেলে। কালেভদ্রে দুয়েকটা হয়। তবে সেগুলোও এমন হয় যে, তা নিয়ে খুব বেশি মাতামাতি করার জায়গা থাকে না। তবে কিছুদিন আগে ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে দেখা 'টুমরো' নামের এক অ্যানিমেটেড শর্টফিল্ম বেশ আশাবাদী করেছিলো। বাংলাদেশের নির্মাণ ছিলো সেটি। এরপরই গত এপ্রিলে এলো 'চিলেকোঠার সেপাই।' আরেকটি মুগ্ধ হওয়ার মতন কাজ। 

এই শর্টফিল্মে দেখা যায় এক তরুণকে, যিনি বসবাস করেন ছাদের চিলেকোঠার ঘরে৷ আমরা এখান থেকেই অনুমান করে নিতে পারি, এই মানুষটিই চিলেকোঠার সেপাই। যার ঘরজুড়ে সিগারেটের অজস্র খালি খোসা। তিনি যে মারাত্মক 'চেইন স্মোকার', সেই ন্যারেশনটা পাকাপোক্ত হয়ে যায় সিগারেটের খালি খোসার প্রাচুর্যে।

যাই হোক, গল্প শুরু হয় এই তরুণের ম্যাচের কাঠি দিয়ে সিগারেট ধরানোর চেষ্টায়৷ সে ম্যাচের কাঠি দিয়ে বারবার চেষ্টা করে যাচ্ছে, কিন্তু সিগারেট ধরাতে পারছেনা; এটাই মূল গল্প। শেষপর্যন্ত সে সিগারেট ধরাতে পারে কী না, বা, সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে আরো কোনো সংকট সামনে আসে কী না, তা জানিয়েই শেষ হয় শর্টফিল্মটি। 

যারা বিশ্বের দুর্দান্ত সব অ্যানিমেশন ফিল্ম নিয়মিত দেখেন, তারা এই কাজটি প্রথমবার দেখলে বুঝতেই পারবেন না, এটা বাংলাদেশের কাজ। বিভিন্ন বিষয়ের ডিটেইলিং এত সুন্দর হয়েছে, যা দারুণ লেগেছে। এ শর্টফিল্মের ট্যাগলাইন- স্মোকিং কিলস। সেই ট্যাগলাইনকে মেটাফোরিক্যালি যেভাবে দেখানো হয়েছে, তাও অনবদ্য। যারা এই শর্টফিল্ম বানিয়েছে, অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত বন্ধু; রাহুল, রাগিব, তারেক, তারিক, সৌরভ, মারুফ, অনাদিনি...তারা এই শর্টফিল্মের কনসেপ্ট প্রথম পায় টং দোকানে চা খেতে বসে। সেখানে তাদের মধ্যে এক বন্ধু বারবার চেষ্টা করেও সিগারেটে আগুন জ্বালাতে পারছিলো না, সেখান থেকেই আসে শর্টফিল্মের অনুপ্রেরণা। 

এরা সকলে মিলেই বানিয়েছেন শর্টফিল্মটি! 

যেহেতু বন্ধুরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরুমের ডিটেইলিং তারা ব্যবহার করেছে অ্যানিমেশনের সেই তরুণের রুমের ডিজাইনে। এরপর সেটার উপরে আঁকাআঁকি, ইম্প্রোভাইজেশন... নানাবিধ অনুষঙ্গ যুক্ত হয়েছে ধাপে ধাপে। শেষপর্যন্ত নির্মিত হয়েছে 'চিলেকোঠার সেপাই; দ্য স্মোকার।'

ডিটেইলিং এর কাজ মুগ্ধ করার মতন! 

 

বেশ কিছু পুরস্কার যুক্ত হয়েছে এই অ্যানিমেশন ফিল্ম এর নামের পাশে৷ 'পুনে শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-২০২০' এ নমিনেটেড হয়েছিলো নির্মানটি। 'ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেনস ফিল্ম ফেস্টিভাল বাংলাদেশ-২০২০' এ 'ইয়াং ট্যালেন্ট অ্যাওয়ার্ড' পায় এই অ্যানিমেটেড ফিল্ম৷ 'এশিয়া সাউথ ইস্ট- শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল' এ 'স্পেশাল মেনশন' পায় চিলেকোঠার সেপাই৷ এছাড়া আরো কিছু ইন্টারন্যাশনালে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে মনোনয়ন পায় বাংলাদেশের এ শর্টফিল্মটি। 

বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে সময়ের ফেরে নানারকম উন্নয়ন হলেও এই 'থ্রিডি অ্যানিমেশন' ক্ষেত্রটিতে ছিটেফোঁটাও উন্নতি ঘটেনি বিগত এতগুলো বছরে। সেরকম এক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে 'চিলেকোঠার সেপাই; The Smoker' আমাদের আশাবাদী করে৷ অল্প রসদ এবং সীমাবদ্ধ ক্ষমতা নিয়েও যে দারুণ কাজ করে অসাধ্যসাধন করা যায়, সেটার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তই স্থাপন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাতজন শিক্ষার্থী;  দুর্দান্ত কাজটির মাধ্যমে। আশা করি, এরকম কাজ হবে আরো৷ 'রত্নগর্ভা' বাংলাদেশের সন্তানেরা চাইলেই সব হয়। তাদের মাথায় নিত্যনতুন চিন্তা আসুক আর সেগুলোর বাস্তব রূপান্তর দেশেবিদেশে সমাদৃত হয়ে এ মানচিত্রই আরেকটু ভাস্বর হোক দীপ্তিতে, এটাই তো চাওয়া। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা