'দামাল' এ গল্পের আড়ালে দেশপ্রেমের যে সবক, সেটা কে কতটুকু ধারণ করবেন, তা বিতর্কের বিষয়। সে বিতর্কে না গিয়ে তাই প্রাসঙ্গিক মূলত এটাই- সময়ের প্রতিনিধি হওয়া। কালের দায় মেটানো। যে কাজটিই বুদ্ধিদীপ্ত প্রক্রিয়ায় শেষতক করে 'দামাল।' যেখানেই মূলত এ সিনেমার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়। 

খেলা নিয়ে প্রবল আদিখ্যেতা আছে এরকম এক জাতিকে যদি আপনি এমন এক গল্প বলেন, যে গল্পে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে খেলার মাঠ, যে খেলার মাঠে আছে ইতিহাসের টানাপোড়েন, এবং অতি অবশ্যই আছে ইমোশনাল ও বাণিজ্যিক মালমশলার অকৃপণ উপস্থিতি... তাহলে হলফ করেই বলা যায়, সে গল্প ক্লিক করবে৷ দর্শক যেহেতু পকেটের রেস্ত খরচ করে সিনেমাহলে যায় বিনোদিত হবার জন্যে, শুকিয়ে যাওয়া অনুভূতির গাঙে খানিকটা ঢেউ পাওয়ার জন্যে এবং অতি অবশ্যই টাকা উসুল করার জন্যে... সুতরাং, মূল গল্পে যদি থাকে আদা-রসুনের ঝাঁঝ এবং খানিকটা ইতিহাসের সত্যান্বেষণ... তাহলে বিষয়টা বেশ জমে। যে জিনিসটাই মূলত আলাদাভাবে চোখে পড়ে 'দামাল' এর গল্পে। 

কিছু কিছু দৃশ্যে ছিলো মুগ্ধতা

তবে, সে গল্পে যাবার আগে প্রথমেই ডিসক্লেইমার। সেটি হচ্ছে- 'দামাল' যদিও 'স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল' এর বরাতে মুক্তিযুদ্ধের গল্পই বলেছে সিনেমার পুরোভাগে, তবুও জানিয়ে রাখা ভালো- মুক্তিযুদ্ধের এ টানাপোড়েনের গল্প বলতে গিয়ে 'দামাল' টিপিক্যাল মেলানকোলিক টোনের উপরে ভরসা রাখেনি মোটেও। আমরা যেমনটা দেখি, যুদ্ধের সিনেমা হলেই থেকে থেকে চোখ ভিজে উঠবে, ভয়ানক সাসপেন্সে গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠবে কিছু একটা, পুরো সিনেমাজুড়েই থাকবে দুঃখবিলাস... 'দামাল' সেরকম না৷ এ সিনেমার অনেক দৃশ্যেই বিষাদের অনুষঙ্গ আছে। সেসব দৃশ্য দেখে অলিন্দের ঠিকঠাক অংশে আলোড়নও হয়। কিন্তু, পাশাপাশি এও ঠিক, এ গল্পে মজুত আছে অনুভূতির অন্যান্য দিকও। আছে ক্ষোভ-রাগ-আনন্দও। সে সাথে আছে কিছু সাধারণ অথচ গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও। যুদ্ধ মানে যে শুধু অস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করাই না, পায়ে ফুটবল আর বুকে পতাকা বেঁধেও যে সামিল হওয়া যায় যুদ্ধের মঞ্চে... 'দামাল' সেটারও এক বার্তা। 'যুদ্ধ' মানে যে শুধু মুক্তিযুদ্ধ না, ঘরের বাইরে ভিন্ন কিছু করার চেষ্টারত নারীদের সংগ্রামও যে একরকমের যুদ্ধ... 'দামাল' সেটারও অসংকোচ প্রকাশ৷ 

এ বছরের শুরু থেকে যেসব বাংলাদেশি সিনেমা এসেছে প্রেক্ষাগৃহে, সেসবের নিয়মিত দর্শক হবার সুবাদে একটা বিষয় লক্ষ্য করে বেশ ভালো লাগলো- সিয়াম, রাজ, মিম, সুমী...লিড রোলে থাকা এই শিল্পীদের আগের কাজের তুলনায় 'দামাল' এ তাদের ডেলিভারি বেশ ভালো। উন্নতির গ্রাফও খুব ভালোভাবে স্পষ্ট। আলাদা করে দুজনের কথা বলা উচিত। 'দুর্জয়' চরিত্রে সিয়াম আর 'মুন্না' চরিত্রে শরিফুল রাজ। এই দুজনের উপরে গল্পের অবলম্বন ছিলো অনেকটুকু। সেই দায়িত্বটুকু তারা সামলেছেন ওয়েল ব্যালেন্সের পেশাদারিত্বে। দুজনেরই স্পেস ছিলো। স্পেস অনুযায়ী মাত্রা বুঝে তারা করেছেনও ঠিকঠাক অভিনয়। অতিরঞ্জিত  কিছু না করে গণ্ডির মধ্যে থেকেই বুঝিয়েছেন- 'লেস ইজ মোর।' বাকিরাও দারুণ। ইন্তেখাব দিনার, রাশেদ মামুন অপু, এ.কে আজাদ সেতু'রা গল্পের ডাইমেনশন বুঝে ছিলেন যথেষ্ট প্রাসঙ্গিকও। 

গল্পের অনেকটুকুই টেনে নিয়ে গিয়েছেন সিয়াম-রাজ

যদিও গল্পের ন্যারেশন বেশ স্পিডি হওয়ায় কিছু বিষয় কানেক্টেড হবার আগেই হাতছাড়া হয়েছে।  গল্প কিছুক্ষেত্রে সার্ফেস লেভেলে থেকেই মুভ করেছে অন্যত্র। সিনেমার শেষটা যেভাবে টানা হয়েছে, সেটা যদিও অডিয়েন্সের কথা ভেবেই করা হয়েছে, কিন্তু সেটা ব্যক্তিগতভাবে মনঃপূত হয়নি। টেকনিক্যাল কিছু গ্লিচ আরেকটু ভালোভাবে সামলানো যেতে পারতো বলে বিশ্বাস। সেট ডিজাইন আর সিজিআই এ আরেকটু 'ফিনিশিং টাচ' রাখার চেষ্টা থাকলে ভালো লাগতো। যে 'স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল' নিয়ে এতকিছু, তাদের জার্নিটা আরেকটু গভীর থেকে দেখালে, ইমোশনাল কানেকশনটা আরেকটু জোরালো হতো। 

ইমোশনাল কানেকশনটা আরেকটু জোরালো হলে ভালো লাগতো! 

তবে, এসবই ছোটখাটো অসঙ্গতি৷ যেসব থাকা সত্বেও দিনশেষে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার বড়সড় সুযোগ দিয়েছে 'দামাল।' সে সাথে, ভালো লেগেছে- 'বলিউড' কমার্শিয়াল আসপেক্ট এ যেভাবে তাদের রুটেড সব গল্পকে উঠিয়ে নিয়ে আসে, সেই ফর্মুলা দেশের এক সিনেমাতেও সাকসেসফুলি অ্যাপ্লাইড হওয়ার বিষয়টি।  'দামাল' সিনেমা দেখার পরে কিছু মানুষ নিশ্চিতভাবেই 'স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল' নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবেন, এবং এটাও জানবেন- পৃথিবীর ইতিহাসে এই দলটাই ছিলো প্রথম দল, যারা যুদ্ধকালীন সময়ে গঠিত হয়েছিলো। যারা মুক্তিযোদ্ধাদের সে সময়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা অর্থ সাহায্যও করেছিলেন! সর্বস্ব খোয়ানো কিছু তরুণ দেশের হয়ে করেছিলো অন্যরকম এক যুদ্ধ। যে যুদ্ধে রক্তপাত ছাড়াই তারা ছুটিয়েছিল শত্রুর কালোঘাম। বুঝিয়েছিলো- এভাবেও যুদ্ধ জেতা যায়! 

ইতিহাসের মহারণ্যে স্বেচ্ছা-নির্বাসনে থাকা এসব জৌলুশহীন তথ্য যদি ইতিহাস-বিমুখ আমাদের খানিকটা হলেও টনক নড়ায়, খানিকটা হলেও আগ্রহী করে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের শেকড় অনুসন্ধানে, এই অন্তহীন ডামাডোল সময়ে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সিনেমার গল্পের আড়ালে দেশপ্রেমের যে সবক, সেটা কতটুকু কে ধারণ করবেন, সেটা বিতর্কের বিষয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ এটাই- বার্তা প্রচার করা। সময়ের দায় মেটানো। যে কাজটিই বুদ্ধিদীপ্ত প্রক্রিয়ায় করে যায় 'দামাল।' যেখানেই মূলত 'দামাল' টিমের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা