রায়হান রাফি'র 'জানোয়ার' দেখে উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম। তবে 'ডার্ক সাইড অব ঢাকা'র অনেকগুলো ইন্টারেস্টিং লেয়ার থাকা সত্বেও ফান্ডামেন্টাল কিছু বিষয়ে ঘাটতির কারণে সেভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা গেলো না...

ঢাকাকে কোনো এক সময়ে বলা হতো- তিলোত্তমা ঢাকা। পুরাণ অনুযায়ী, তিলোত্তমা নামে এক অপ্সরা ছিলেন স্বর্গরাজ্যে। তার নামেই ঢাকাকে এই বিশেষণে ভূষিত করেছিলেন যারা, তারা আজ বেঁচে থাকলে এই কাজটির জন্যে আফসোস করতে কী না, সে সন্দেহ রয়েই যাই। একটা শহরের বাসিন্দারা একত্রিত হয়ে যতগুলো দোজখনামা লেখা সম্ভব, তার পুরোটাই লেখা আছে এ শহরে৷ মাত্র তিন দিন আগে বসবাসের অযোগ্য শহরের এক তালিকা হলো। বলা বাহুল্য, সেখানে শেষ থেকে চতুর্থ অবস্থানে বহাল তবিয়তে অবস্থান করছে ঢাকা! 

ঘিঞ্জি ঘিঞ্জি ঘরবসতি এবং কুটিল-শঠ অগুনতি মানুষের এই ঢাকাকে যদি দ্বিখণ্ডিত করা হয় ভালো দিক এবং খারাপ দিকে, তাহলে কোন দিকের পাল্লা ভারী হবে, তা নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ খুব একটা নেই৷ অশুভ অন্ধকার, চাপা অস্বস্তি আর গুমোট ঘামের সেই ভয়াল নিশীথিনী ঢাকাকেই পরিচালক রায়হান রাফি বেছে নিলেন তার ওয়েব কন্টেন্ট 'ডার্ক সাইড অব ঢাকা'তে৷ 

'ডার্ক সাইড অব ঢাকা'র মোট পাঁচটি গল্প; আয়না বিবির পালা, পালাবি কোথায়, গোলাপি এখন ঢাকায়, অমানুষ,  বন্ধু আমার। এই পাঁচটি অ্যান্থোলজি আলাদা মনে হলেও এরা একে অন্যের সাথে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্কযুক্ত। ঠিক এভাবেই, ভিন্ন এক ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে, ব্যাঙের ছাতার মতন গজিয়ে ওঠা হরেক রকম অপরাধের খানিকটা উঠিয়ে এনেছেন পরিচালক, এক ঘন্টা সতেরো মিনিটের এ ওয়েব কন্টেন্টে। 

খানিকটা বলার কারণ, এত কম রানটাইমে পাঁচটি গল্প নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে কাজ করা এবং সেই কাজগুলোর স্যাটিসফ্যাক্টরি এক পোর্ট্রেয়াল করা দুরুহ কাজ। সেক্ষেত্রে স্ক্রিপ্ট অনেকটুকুই নির্মেদ এবং স্মার্ট হওয়া দরকার। যেটা এই কাজটির ক্ষেত্রে প্রকটভাবে অনুপস্থিত ছিলো। ওয়েব কন্টেন্টের পাঁচ গল্পে লোভ, ক্ষোভ, নেশা, অপহরণ, অবিশ্বাস... ক্ষণেক্ষণেই এসেছে। কিন্তু দাগ কাটার মতন কোনো চরিত্র সেভাবে আসে নি। সেটা সম্ভবও ছিলো না। এত কম স্ক্রিনটাইমে স্ট্রমবাউন্ড পারফরম্যান্স দেয়া খানিকটা অসম্ভবও।  

গল্পগুলো বাস্তব। যে পাঁচটি গল্প দেখেছি, এর প্রত্যেকটাই ঢাকা শহরে অহরহ ঘটছে। আরোপিত মনে হয়নি। চরিত্রগুলোর আচরণও যাচ্ছিলো গল্পের সাথে। এগুলো নিয়ে বলার কিছু নেই। তবে ডায়লগের ক্ষেত্রে সমস্যা লক্ষ্য করলাম। এই দিকটিতে বেশ কিছু কাজ করার সুযোগ ছিলো৷ প্রচুর স্লাং ব্যবহার করা হয়েছে ডায়লগে। কিন্তু সে অনুপাতে বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ সেভাবে ছিলো না। মানছি, আমি 'র' একটা কন্টেন্ট বানাবো। সেই কন্টেন্টের ডায়লগে প্রচুর গালিগালাজও থাকবে। সমস্যা নেই। কিন্তু, এটাও মাথায় রাখা দরকার, খিস্তিখেউড় এর পাশাপাশি প্রচুর উইটি কথাবার্তাও থাকতে হয়, ইকুলিব্রিয়াম এর জন্যে।

খুব সোজা একটা উদাহরণ দিই। আমরা জানি, 'বাইশে শ্রাবণ' এ প্রসেনজিৎ এর চরিত্র 'প্রবীর রায়চৌধুরী' পুরো সিনেমাজুড়ে দেদারসে গালিগালাজ করেছে। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, সেই গালিগুলো কোথাও গিয়ে যেন পুরোপুরিই জাস্টিফাইড। যেটা এখানে মনে হয়নি। প্রচুর গালিগালাজ চরিত্রগুলোর মুখে। কিন্তু তার সাথে ব্যালেন্স করার মতন ইন্টারেস্টিং ডায়লগ কম। 'ডার্ক সাইড অব ঢাকা'র দ্বিতীয় গল্পটি যদি ধরি, যেখানে একটি চরিত্র তার অবৈধ প্রেমিকাকে নিয়ে নারায়নগঞ্জের রিসোর্টে যেতে চাচ্ছে, যেখানে প্রেমিকা তাকে জানাচ্ছে,

নারায়নগঞ্জ যাবা? নারায়ণঞ্জের রিসোর্টে আজকাল কাবিননামা চায়। 

একটা ডায়লগ দিয়ে সেটিকে সমসাময়িক ইস্যুর সাথে কানেক্ট করে দেয়া, এরকম ডার্ক হিউমার খুঁজেছি আমি আরও। আবার এই শঠ চরিত্রটিই যখন তার স্ত্রী'র কাছে ধরা পড়ে যান, তিনি বলেন- 

আমি তোমাকে সব বুঝায়া বলবো পরে। তুমি আবার মাঝখান দিয়ে অন্য কিছু মনে কইরো না।

এই ডায়লগ শুনে হেসে উঠেছিলাম জোরেসোরেই। বর্তমানের সাথে ফিকশনের কানেকশনের এই ট্রিটমেন্ট আমি বাকি গল্পগুলোতেও চাচ্ছিলাম। পাইনি। 

এই কন্টেন্টের আরেকটি দূর্বল দিক- টুইস্টের প্রেডিক্টিবিলিটি। গল্পগুলোর প্রোটাগনিস্ট চরিত্রেরা মাঝেমধ্যেই অপ্রত্যাশিত চমক দিচ্ছিলো। কিন্তু আপনি যদি মনোযোগ দিয়ে প্রথম থেকে খেয়াল করেন, চমকগুলো আর অপ্রত্যাশিত থাকবে না। আপনি আগে থেকেই ধরে ফেলতে পারবেন সব।  'মাথা ঘুরিয়ে দেয়া টুইস্ট' বলতে আমরা যা জানি বা বুঝি, সেটার বেশ তীব্র এক অভাব অনুভব করেছি এখানে৷ খুবই নিরীহ কিছু টুইস্ট দেখানো হয়েছে। যা কোনোভাবেই 'আইট অব বক্স' না। এক্ষেত্রে মনে হয়েছে, সবগুলো গল্প একই প্যাটার্নে না রেখে দুয়েকটা এক্সপেরিমেন্টাল এক্সিকিউশন রাখলে সেটা আরেকটু ভিন্ন মাত্রা যোগ করতো। দর্শক তাহলে পরিচালকের চেয়েও এক ধাপ আগে হাঁটার দুঃসাহস করতো না। 

তমা মির্জা দারুণ অভিনয় করলেন! 

আমার কাছে সবচেয়ে ইনোভেটিভ লেগেছে, এই কন্টেন্টের আইডিয়া। পাঁচটি আলাদা আলাদা গল্প দিয়ে এক নিষিদ্ধ ঢাকাকে দেখাবো আমি, যে গল্পেরা আবার নিজেদের মধ্যে মাঝেমধ্যেই ওভারল্যাপ করে যাবে, এই চিন্তাটা প্রশংসার দাবিদার। সে সাথে, 'ডার্ক সাইড অব ঢাকা'র কালার গ্রেডিং খুব চমৎকার। গান ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর জুতসই। সবাই অভিনয়ও করেছে দুর্দান্ত। সেসব জায়গাতে খুঁত ধরার জায়গা খুব কম। ডিউরেশন, ডায়লগ ব্যালেন্স এবং স্টোরি টেলিং নিয়ে অতিরিক্ত খানিকটা প্রয়াস দেখালে মনে রাখার মত এক কাজ হতে পারতো 'ডার্ক সাইড অব ঢাকা।' 

'ডার্ক সাইড অব ঢাকা'র কালার গ্রেডিং ছিলো প্রশংসনীয়! 

এবার আসি ভিন্ন প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর বেহাল দশা কবে যাবে, আমি নিশ্চিত নই। 'আই থিয়েটার' অ্যাপে এই কন্টেন্ট দেখতে গিয়ে যে পরিমাণ বিড়ম্বনার সম্মুখীন হয়েছি, তা নিয়ে লিখতে গেলে ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে যাবে। সে প্রসঙ্গে তাই ইস্তফা দিচ্ছি। তবে এই বিষয় নিয়ে অনেকটুকুই কাজ করার আছে সংশ্লিষ্ট মহলের। দাবি জানিয়ে রাখলাম। 

রায়হান রাফি'র 'জানোয়ার' দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। একটা গল্প, সেটা ক্রমশই যেভাবে ডালপালা মেলে এক দুর্বিষহ ক্লাইম্যাক্সের দিকে গিয়ে পরিণতি পেয়েছে, তা অসাধারণ ছিলো। 'ডার্ক সাইড অব ঢাকা'র অনেকগুলো লেয়ার থাকা সত্বেও ফান্ডামেন্টাল কিছু বিষয়ে ঘাটতির কারণে সেভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা গেলো না। তবে যারা 'র' ক্রাইম থ্রিলার পছন্দ করেন, তাদের এই কাজ নিঃসন্দেহেই ভালো লাগবে। অথবা যারা অন্যরকম ন্যারেশনের এক বাংলাদেশি নির্মাণকে দেখতে চান, তাদেরও ভালো লাগবে। 

রায়হান রাফির আরো কিছু সিনেমা পাইপলাইনে আছে। সেগুলোর জন্যে শুভকামনা রইলো। আশার বিষয় এটাই,  বাংলাদেশি কন্টেন্ট আস্তে আস্তে দুর্দান্ত হচ্ছে। গত ঈদের পর থেকে যেভাবে একের পর এক দারুণ নির্মান আসছে বিভিন্ন স্ট্রিমিং সাইটে, তা এককথায় অভূতপূর্ব এক বিষয়। আশা করি, এই নির্মাণের স্রোতে সহসাই মন্দা আসবে না। খরস্রোতা বেগে এগোবে সৃজনশীলতার ফল্গুধারা। শুভকামনা! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা