ব্যোমকেশ রূপে অনির্বাণকে দেখে যারা অভ্যস্ত, তারা এক নতুন রূপে তার দেখা পাবেন এই ফুল অন এন্টারটেইনমেন্ট ছবিতে!

ব্রিটিশ পুলিশের গোয়েন্দা মহিমচন্দ্র। সুযোগ পেলেই ইংরেজি গোয়েন্দা গল্প পড়ে, আর দিবাস্বপ্ন দেখে শার্লক হোমসের মতোই জটিল সব রহস্য সমাধানের। কিন্তু বাস্তবে সে সুযোগ একেবারেই জোটে না তার কপালে। তার মতে, বাঙালিদের অধিকাংশ অপরাধই নিতান্ত নিরামিষ। খুব সহজে উদ্ঘাটন করা যায় অপরাধীর পরিচয়। তাছাড়া ইদানীং গোয়েন্দাদের অপরাধী শনাক্তের চেয়েও বেশি খাটতে হচ্ছে স্বদেশী পাকড়াও করতে, যেখানে বুদ্ধির চেয়ে গায়ের জোরই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মহিমচন্দ্রের তাই আক্ষেপ, কবে একজন মনমতো অপরাধীর সন্ধান সে পাবে, যাকে ধরতে গিয়ে তার মগজের পুষ্টি হবে।

এদিকে ঘরে মহিমচন্দ্রের নতুন বিয়ে করা বউ সুধামুখী, যার দিকে মহিমচন্দ্রের একেবারেই মনোযোগ নেই। সে জানতেও পারছে না, তার স্ত্রীর সাথে গোপন অভিসার চলছে প্রাক্তন প্রেমিক ও স্বদেশী মন্মথ'র। এবং মহিমচন্দ্র ব্রিটিশরাজের গোলামি করে বলে, মন্মথকে তার মাস্টারমশাই, বিপ্লবী অরুণাভ দায়িত্ব দিয়েছে মহিমচন্দ্রকে হত্যার। ফলে মহিমচন্দ্র যেমন মন্মথ'র মাঝে একজন প্রতিভাধর ও সম্ভাবনাময় অপরাধীর আঁচ পেয়ে তার পিছনে লেগেছে, তেমনই মন্মথও সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে মহিমচন্দ্রকে খুন করে তার কাছ থেকে নিজের প্রাক্তন প্রেমিকা সুধামুখীকে ফিরিয়ে আনার।

শেষ পর্যন্ত এই ইঁদুর-বিড়াল লড়াইয়ে জিতবে কে? মহিমচন্দ্র নাকি মন্মথ? এই নিয়েই বিংশ শতকের গোড়ার দিকে, বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে জয়দীপ মুখার্জী পরিচালিত 'ডিটেকটিভ' ছবিটির কাহিনী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ছোটগল্প 'ডিটেকটিভ' অবলম্বনে সাজানো হয়েছে এই ছবির চিত্রনাট্য, যেটি অনেকাংশে মূলানুসারী হলেও, কিছু কিছু নতুনত্বেরও সংযোজন ঘটেছে।

এই ছবির বিশেষত্ব কিংবা স্বকীয়তার জায়গাটি হলো, কাহিনীর দুইটি ট্র্যাক একদম ভিন্ন। একদিকে মহিমচন্দ্রের ট্র্যাকটিতে দেখানো হচ্ছে মনমতো কোনো রহস্য না পাওয়ায় তার হতাশা, একজন যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর অপেক্ষায় থাকা এবং নিজেকে শার্লক হোমসের মতো তীক্ষ্ণধী বলে মনে করা, আদতে যা সে নয়। এই ট্র্যাকটি নিতান্তই নিখাদ হাস্যরসে পরিপূর্ণ, যার কিছু কিছু অংশে সামান্য স্যাটায়ারের ছোঁয়াও রয়েছে। অপরদিকে মন্মথ-সুধামুখী-মাস্টার অরুণাভকে নিয়ে ট্র্যাকটিতে বারবার উঠে এসেছে নারীর অবদমন ও পরিস্থিতির শিকার হওয়া, বিপ্লবে নারীর ভূমিকা, দেশপ্রেম ও নারীপ্রেমের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, আদর্শ ও নৈতিকতার আপেক্ষিকতা জাতীয় বিষয়বস্তু, যা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সিরিয়াস।

ফলে এক দৃশ্যে মহিমচন্দ্র ও তার সহযোগী হুতাশনের কাণ্ডকারখানা দেখে যেমন দর্শকের হেসে গড়াগড়ি খাবার জোগাড় হবে, পরের দৃশ্যেই হয়তো সিরিয়াস ব্যাপারস্যাপারের অবতারণা ঘটায় তাদেরকে নিজেদের মাথা খাটিয়ে চিন্তা করতে হবে। সাধারণত পুরোদস্তুর স্যাটায়ার কিংবা ডার্ক কমেডির মাধ্যমে খুব গুরুতর সমাজবাস্তবতার প্রতীকী প্রতিফলন হয়তো হরহামেশাই দেখা যায়, কিন্তু এরকম একই ছবিতে কমেডি ট্র্যাক ও সিরিয়াস ট্র্যাকের সহাবস্থান অধিকাংশ দর্শকের জন্য একটি নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা হবে। 

পরিচালক জয়দীপ মুখার্জিকে যারা চেনেন না, তার নিজের ট্র্যাক রেকর্ডও অনেকের কাছেই এই ছবির কাহিনীর মতোই মনে হবে। তিনি ইতঃপূর্বে ঋতুপর্ণ ঘোষের সাথে জুটি বেঁধে 'গানের ওপারে' কিংবা মৈনাক ভৌমিকের সাথে 'ব্যোমকেশ' এর মতো অসাধারণ টিভি সিরিয়াল যেমন বানিয়েছেন, তেমনই আবার শাকিব খানকে নিয়ে 'শিকারী', 'নবাব', 'চালবাজ', 'ভাইজান এলো রে'-র মতো পুরোদস্তুর বাণিজ্যিক বাংলা ছবিও পরিচালনা করেছেন। অর্থাৎ আর্ট এবং কমার্শিয়াল, দুই ঘরানাতেই তার সমান দখল। তাই স্বয়ং রবি ঠাকুরের গল্প অবলম্বনে 'ডিটেকটিভ'-এ তিনি কেমন ট্রিটমেন্ট দেবেন, সেটি নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। দেখা যাচ্ছে, পুরোপুরি কোনো একটি ঘরানা বেছে না নিয়ে, এক্ষেত্রেও তিনি মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। অর্থাৎ, নিছক টাইম পাসের জন্য যারা এ ছবিটি দেখতে চাইবেন, তাদের যেমন মন্দ লাগবে না, তেমনই আবার মননশীল দর্শকের চিন্তার খোরাক জোগানোর মতো রসদেরও দেখা মিলবে যথেষ্ট পরিমাণে।

তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, কাহিনীকে আরো ভালোভাবে সাজালে ছবিটি 'ওয়ান টাইম ওয়াচ'-এর বদলে আরো শ্রেয় কিছুতে পরিণত হতে পারত। যেমন: দর্শকমনে আবেগ সঞ্চারণের যথেষ্ট জায়গা থাকলেও, কমেডি রিলিফের পরিমাণ বেশি দিতে গিয়ে ওই জায়গাটিতে ঘাটতি রয়ে গেছে। স্বদেশী আন্দোলন কিংবা দেশকে স্বাধীন করতে গিয়ে কিছু বিপ্লবীর রক্তের তৃষ্ণায় উন্মত্ত হয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপারগুলো আরো বেশি গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করা যেত। আবার পিরিয়ড ড্রামায় হুট করে সমলিঙ্গীয় প্রেমের ফ্যান্টাসি নিয়ে আসার মতো সাহসিকতা দেখানো হলেও, ওই সময়টাতে মহিমচন্দ্রের সাথে সুধামুখীর দাম্পত্যজীবন কিংবা সুধামুখীর সাথে মন্মথ'র পরকীয়ার সূক্ষ্ম দিকগুলো আরেকটু যত্ন নিয়ে দেখানো যেত।

তবে ছবির কাহিনী, চিত্রনাট্য, পরিচালনায় যত গলদই থাকুক না কেন, অনির্বাণ ভট্টাচার্যের যারা ভক্ত, তাদের জন্য এই ছবিটিকে মাস্ট ওয়াচ বলা চলে। এর আগে তাকে আমরা ব্যোমকেশ হিসেবে দেখেছি। তবে তিনি যে শুধু সিরিয়াস গোয়েন্দাই নন, কমেডি গোয়েন্দা হিসেবেও সমান শক্তিশালী, তা হয়তো অনেকেই দেখেননি, যদি না জি বাংলা অরিজিনালসে তার 'যদি বলো হ্যাঁ' ছবিটি দেখে থাকেন। তাই এই ছবিতে অনির্বাণকে একদম ভিন্নধর্মী গোয়েন্দা চরিত্রে দেখার অভিজ্ঞতাও অনেকেরই প্রথমবারের মতো হবে। ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি অসাধারণ অভিনয় করে গেছেন। তাকে ঘিরেই যেহেতু মূল কাহিনী, তাই এটি খুব দরকার ছিল।

মন্মথ হিসেবে সমানতালে অভিনয় করেছেন সাহেব ভট্টাচার্যও। তার চরিত্রে আদর্শ ও নৈতিকতা কিংবা নারীপ্রেম ও স্বদেশপ্রেমের মধ্যকার যে দ্বন্দ্বগুলো ছিল, তা মৌখিক অভিব্যক্তি কিংবা শরীরী ভাষার মাধ্যমে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। হুতাশন হিসেবে অম্বরিশ ভট্টাচার্য, বিপ্লবী অরুণাভ হিসেবে কৌশিক চ্যাটার্জি, কিংবা সুধামুখীর বিধবা ননদ স্নেহা হিসেবে তৃণা সাহা বেশ ভালো ছিলেন। কিন্তু সুধামুখীর চরিত্রে ইশা সাহার আরো ভালো করার সুযোগ ছিল।

সব মিলিয়ে ১১৫ মিনিটের 'ডিটেকটিভ' একবার দেখার মতো বেশ উপভোগ্য একটি ছবি। ছবির বাজেট আরেকটু বেশি হলে হয়তো বিংশ শতকের আবহটা সেট ডিজাইনে আরো বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা যেত। তারপরও কম বাজেটে যা হয়েছে তা মন্দ নয়, বিশেষত ছবিটি যখন হলের বদলে সরাসরি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচইয়ে মুক্তি পেল।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা