'থ্রি'র মতন সিরিয়াস গল্পতেও ধানুশ থাকেন, থাকেন 'দ্য এক্সট্রা-অর্ডিনারি জার্নি অব দ্য ফকির' সিনেমার মিষ্টি ফিকশনেও। অম্লমধুর একেক গল্পে তিনি হাজির হন। নোনাধরা দেয়াল আর ঘাম-জলের বাতাসে ভরা সিনেমাহলে তিনি দুই-তিন ঘন্টার ইন্দ্রজাল বিছিয়ে দেন দর্শকের সামনে...

অভিনেতাদের হতে হয় সাদা খাতার মতন। একেকটা নির্মাণ, সেই সাদা খাতায় অজস্র হিজিবিজি, একেকটা গল্প, পৃষ্ঠা ভরা আঁকিবুঁকি। অভিনেতা হবেন এমন একজন, যিনি নিজেকে ভাঙবেন। উল্টেপাল্টে দেখবেন। ধূসর পাণ্ডুলিপি হবে ললাটলিখন, কালো কালো অক্ষরগুলো স্রষ্টা হবে রক্তমাংসের প্রাণের। জেরার্ডিন ক্লার্ক নামের এক পরিচালক যেমন বলেছিলেন- 

That's what makes acting so attractive. You get to break all your own rules.

তবুও শুধুমাত্র সাদা খাতা হয়ে পর্দার সামনে নিজেকে সমর্পণ করে দিলে হয়তো অভিনেতা হওয়া যায়, কিন্তু নায়ক হওয়া যায়? নায়ক মানেই আমরা ধরে নিই সুদর্শন,সৌম্যদর্শন সুঠামদেহী কোনো একজন। 'আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারি' নামক ন্যারেটিভের সার্থক প্রয়োগ দেখি অভিনয়-জগতের আলোকোজ্জ্বল এ জগতে। বিশ্ব রঙ্গমঞ্চে হয়তো 'নায়ক' এর এই সঙ্কীর্ণ সংজ্ঞায়ন টেকে না। কিন্তু উপমহাদেশে 'নায়ক' মানেই বাড়াবাড়ি রকমেই  আদিখ্যেতা, বাড়াবাড়ি উপচার-অনাচার।

তবে যাপিত ধ্যানধারণার এই প্রথাকে আঘাত করেই পর্দায় বহুদিন ধরে অভিনয় করে যাচ্ছেন এক নায়ক, তাও এই উপমহাদেশেই। যার গায়ের রঙ মোটেও উজ্বল নয়, যার দেহাকৃতিও পেশিবহুল নয়। এই নায়কের ক্ষমতা শুধু অভিনয়ে। এবং সেই ক্ষমতা দিয়েই তিনি ক্রমশ আচ্ছন্ন করে রাখেন কমলালেবু গোলকের শিল্পপ্রেমী মানুষদের। যাকে নিয়ে কথা, তার নাম- ভেঙ্কটেশ প্রভু কস্তরী রাজা। যদিও এই নামে তাকে কেউ চেনার কথা না। তার আরেকটি নাম আছে। ধানুশ। যিনি পর্দার নায়ক, কিন্তু যিনি নিজেকে নায়কের চেয়েও অভিনয়-শিল্পী হিসেবেই পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। 

'রানঝানা'র কুন্দনের মুগ্ধতা কমেনা মোটেও! 

এই অভিনেতা অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক, লেখক, গীতিকার, গায়কও। 'একই অঙ্গে এত রূপ' নামের প্রবাদটিও তার ক্ষেত্রে বেশ ভালোভাবেই খাটে। কিন্তু তিনি এসবের কিছুই হতে চান নি।  হতে চেয়েছিলেন রাঁধুনি। হ্যাঁ, চমকানোর মতই এক তথ্য৷ রান্নাকে তিনি ভাবতেন সর্বশেষ্ঠ শিল্প। একদিন বাবার জন্যে রান্না করলেন সামান্য কিছু খাবার। তা নিয়ে হাজির হলেন বাবার সামনে। খাবার খেয়ে মুগ্ধ বাবা জানালেন- এরকম রান্না তিনি খেতে চান আরো। বাবার প্রশংসা পেয়ে ছেলে মনে মনে ভাবলো- রোসো, আমি এবার রান্না করবো নিয়মিত। এই শিল্পই শিখবো মনেপ্রাণে। 

রান্নার মতনই জীবনে অনেককিছু হতে চেয়েছিলেন। অনেক কিছু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিখ্যাত এই উক্তিও আমরা জানি-  Life is what happens to us while we are making other plans. ধানুশ তাই আর বাবার গুণমুগ্ধ রান্নাশিল্পী হতে পারেন না৷ পাকেচক্রে হয়ে যান অভিনেতা৷ হ্যাঁ, পাকেচক্রে বলাই সঙ্গত। কারণ, খুব বেশি তোড়জোড় বা আটঘাট বেঁধে অভিনয়ে আসেন নি তিনি৷ অনেকটা জোরাজুরিতেই আসা এই মঞ্চে। মাত্র ষোলো বছর বয়সে প্রথম দাঁড়িয়েছেন ক্যামেরার সামনে। অনেকটা নিমের পাচন গেলার মতন তিতকুটে মুখ নিয়ে ক্যামেরার সামনে যখন তিনি দণ্ডায়মান, ঠিক সেই একই ক্যামেরার পেছনে "ডিরেক্টর'স চেয়ার' এ বসে আছেন বিখ্যাত পরিচালক- কস্তুরী রাজা। যার আছে আরেকটি পরিচয়ও। তিনি ধানুশের বাবা। 

বাবার পরিচালনায় প্রথম সিনেমায় কাজ করলেন। এরপর বড় ভাইয়ের পরিচালনায় দ্বিতীয় সিনেমায় অভিনয় করলেন। 'কাধাল কোন্ডেন' নামের এই সিনেমার পেছনে খানিকটা গল্প আছে। ধানুশের বড় ভাই সেলভারগাবান একটা সিনেমা করবেন। সিনেমার গল্প কমপক্ষ দশজন অভিনেতাকে শুনিয়েছেনও তিনি। কিন্তু সমস্যা হলো, কেউই এই সিনেমায় অভিনয় করতে রাজি হচ্ছে না। গোটা ইউনিট সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। কপালে চিন্তার অজস্র ভাঁজ। ত্রাতা হয়ে এলেন ধানুশ। অনুরোধের ঢেঁকি গিলে ক্যামেরার সামনে দাড়ালেন দ্বিতীয়বার।

বাবা আর বড়ভাইয়ের এ দুই সিনেমায় অভিনয় করে তার মনে হলো, লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন-কাট এর এই জগতে তার পোষাবে না। সে তখন পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছে। ক্যামেরার সামনে অস্বস্তিকর লাগছে। মোটেও উপভোগ্য হচ্ছে না কিছুই। কিন্তু ললাটের লিখন, কে-ই বা খণ্ডাতে পেরেছে কবে? ধানুশও পারলেন না। করলেন আরো কিছু সিনেমায় অভিনয়। আস্তে আস্তে 'ধানুশ' নামটি হয়ে উঠলো জনপ্রিয়, মানুষের মনে দাগ কাটা অভিনয়ও শুরু হলো। ধানুশ বুঝতে পারলেন, মানুষজন ভালোবাসতে শুরু করেছে তাকে। ভালোবাসার এ শক্তি উপেক্ষা করা যায় না। তিনিও পারলেন না। স্পাইডার-ম্যান বলেছিলেন, 'With great power comes great responsibility.' ভালোবাসার সেই দায়িত্ববোধ থেকেই আর সরে আসা হয় না ধানুশের। 

'দ্য এক্সট্রা-অর্ডিনারি জার্নি অব দ্য ফকির' এর ধানুশও মুগ্ধকর! 

ভারতবর্ষের গুণী অভিনেতা ইরফান খান কে নিয়ে এ কথাটা প্রায়ই বলেন অনেকে; তাকে দেখলে মনে হয় না, সে অভিনয় করছেন। তাকে রিলেট করা যায় ঘরের মানুষদের সাথে। যে ঘরে এলে 'দাঁড়ান, চেয়ারটা মুছে দিই, এরপর বসুন' বলার ভদ্রতা দেখাতে হয় না। ইরফান খান আটপৌরে এক মানুষ হয়েই ক্যামেরার সংযোগসেতু দিয়ে ঢুকে যান আমাদের হৃদয়ে। এই উপমা বাস্তব ধানুশের ক্ষেত্রেও। তার অভিনীত চরিত্রগুলোকে সামান্য বিশ্লেষণ করলেই তা বুঝতে পারা যায়। 'রানঝানা'র কুন্দনকে আমরা উপলব্ধি করি আমাদের আশেপাশের সদ্য গোঁফ-গজানো প্রেমিকদের মধ্যে। 'কারনান' এর রগচটা যুবক, যে প্রতিবার দাঁড়িয়ে যায় প্রতিবাদে, সেই দুবলা-পাতলা যুবক মিশে যায় পাড়ার রোয়াকের আড্ডার মধ্যমণি সেই ডাকাবুকো যুবকটির সাথে। অবয়ব, দেহপট কিংবা অভিনয়... ধানুশ আবির্ভূত হন কাছের কোনো মানুষ হিসেবে। ঠিক এটাই তার চরিত্রের সার্থকতা, ঐন্দ্রজালিক গুণ। 

অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক হয়েছেন, তাও খুব কম বয়সে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নামটাও অদ্ভুত; উন্ডারবার৷ এ নামটি নিয়েছেন বিখ্যাত সিনেমা 'ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ডস' থেকে। সেখানে 'উন্ডারবার' শব্দটি বলা হয় বেশ ক'বার। যে শব্দের অর্থ 'ওয়ান্ডারফুল।' অপ্রচলিত কিন্তু সুন্দর এ নামটি মনে ধরে ধানুশের। রেখে দেন নামটা। তবে এই নামকরণের গল্প যতটা চমকদার, প্রযোজক হওয়ার আগের পরিচালনা শুরুর গল্প তার চেয়েও স্বকীয় ।

ধানুশ একটা জিনিস জীবনভর বিশ্বাস করেছেন, পড়ে শেখার চেয়ে করে শেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিচালক হওয়ার জন্যেই তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দোরগোড়া মাড়ালেন না। একটা তথৈবচ ক্যামেরা নিয়ে নেমে পড়লেন পথে। স্ক্রিপ্ট আগেই বানানো ছিলো। সে স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী ভিডিও শ্যুট করে আনাড়ি হাতে এডিট করা শুরু করলেন। কাজ করতে করতে, ঠেকে-ঠকে শিখলেন পরিচালনার অ-আ-ক-খ। প্রায় দশটার মতন শর্টফিল্ম বানানোর পর, ভাবলেন, এবার একটা প্রোডাকশন হাউজ খোলা দরকার। কী নাম দেয়া যায়? তখনই এলো 'উন্ডারবার' এর চিন্তা। 

নিজের বেশ ক'টি সিনেমায় হাজির হয়েছিলেন 'প্লেব্যাক সিঙ্গার' হিসেবে। গানগুলো জনপ্রিয় হলেও তাদের বলয় স্থানীয় গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু হুট করেই 'থ্রি' সিনেমার 'কোলাভেরি ডি' গান হয়ে যায় তুরুপের তাস। এই গানের বাহনে সওয়ার হয়ে ধানুশ জনপ্রিয় হন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা জমায়েতে। এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, অভিনয়-প্রযোজনা-পরিচালনায় যেরকম প্রস্তুতি ছাড়াই নেমেছিলেন তিনি, তার ব্যত্যয় হয়নি এখানেও। গান গাওয়া শুরু করেছিলেন হুট করেই। 'কোলাভেরি ডি' মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে, পরবর্তীতে গাওয়া 'রাউডি বেবি' গান করেছে আরেক ইতিহাস, ইউটিউবে ভারতবর্ষের সবচেয়ে বেশি দেখা গান হিসেবে রেকর্ড করে নিয়েছে। বিলিয়ন বিলিয়ন ভিউ হয়েছে এ গানের।

ধানুশ টলিউড, বলিউড, হলিউডে কাজ করেছেন। উপমহাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী প্রবল জনপ্রিয়তা তার। আটত্রিশ বছরের এ জীবনে পেয়েছেন চারটি জাতীয় পুরস্কার, ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড, এডিসন অ্যাওয়ার্ড সহ বহু কিছু। এত এত অর্জন থাকলে আত্মদম্ভে অনেকেরই পা মাটিতে পড়ে না। অথচ ইউটিউবে গিয়ে ধানুশের একটা ইন্টারভিউও যদি কেউ দেখেন, দেখবেন, বিনম্র এক মানুষের প্রতিবিম্ব সেখানে। খুব বেশি উচ্ছ্বাস নেই, আচরণে সংযত, মিতভাষী এ মানুষের বিনয় তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধই বাড়িয়ে দেয় অনেকটা। 

একঘেয়ে অভিনয় না, বৈচিত্র‍্যেই থাকতে চান চিরকাল! 

জাগামে ঠান্ডিরাম' এর গ্যাংস্টার সুরুলি অথবা 'আসুরান' এর 'শিভা স্বামী' কিংবা 'কোডি' সিনেমার কোডি...ধানুশ যখনই পর্দায় যে অবতারে আসুক, সে অবতারকেই করেছে বাস্তব। অভিনয়, শুধুমাত্র অভিনয় দিয়েই জয় করে নিয়েছে মানুষের হৃদয়। সে জানে, পর্দায় তার নাচ-গান-ধুমধাড়াক্কা অ্যাকশন দেখার জন্যে বসে থাকে বহু মানুষ, তবু তিনি এক গ'তের অভিনয় করেন না। টাইপকাস্ট হওয়ারও কোনো বাসনা নেই তার। শর্টকাটে 'স্টারডম' পাওয়ারও কোনো ক্ষুধা নেই তার। তিনি বাঁচেন ভালো গল্পে, ভালো অভিনয়ে।

সে কারণেই অজস্র, বিচিত্র চরিত্র, গল্পে খুঁজে পাওয়া যায় তাকে। 'থ্রি'র মতন সিরিয়াস গল্পতেও ধানুশ থাকেন, তিনি থাকেন 'দ্য এক্সট্রা-অর্ডিনারি জার্নি অব দ্য ফকির' সিনেমার মিষ্টি ফিকশনেও। অম্লমধুর একেক গল্পে তিনি হাজির হন, সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনের কষ্ট-ক্লেশ খানিকটা হলেও দূর করতে। নোনাধরা দেয়াল আর ঘাম-জলের বাতাসে ভরা সিনেমাহলে তিনি দুই-তিন ঘন্টার ইন্দ্রজাল বিছিয়ে বসেন দর্শকের সামনে। 

যে জালে ক্রমশই আষ্টেপৃষ্টে যায় দর্শক। যে জালের মোহ থেকে আর বেরিয়ে আসা হয় না কারো। আটকে থাকাই যেখানে অন্তিম নিয়তি৷ 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা