যে পাকিস্তানের চক্ষুশূল ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তার সৃষ্টিকর্মকে করা হয়েছিল নিষিদ্ধ, সেই ভূখণ্ডেই ফিরেছেন তিনি আবার। পাকিস্তানের এক ধারাবাহিক নাটক 'দিল কেয়া করে'র এক পর্বে শোনা গিয়েছে রবীন্দ্রনাথের গান! যা তোলপাড় ফেলে দিয়েছে গোটা উপমহাদেশেই!

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে একটি বই পড়ছিলাম; নীরদচন্দ্র চৌধুরীর লেখা 'আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ। এ বইয়ে নীরদ চৌধুরী, রবিঠাকুরের নানা লেখা, চিঠিপত্রের উদ্ধৃতি টেনে দেখিয়েছেন, কতটা তীব্র দ্বন্দ্বমুখর এক জীবন কাটাতে হয়েছে জোঁড়াসাকোর রবিকে! একদল লোক তাকে প্রবল ভক্তি করতো, আরেক দল লোক প্রকট ঘৃণা৷ তার জীবন নিয়ে যারাই কড়চা করেছে, তাদের খুব ক্ষুদ্র অংশই নিরপেক্ষ ছিলো। এক পক্ষ তাকে নিয়ে আবেগের আতিশয্যে অতিশয়োক্তি করেছে। আরেক পক্ষ ঘৃণা উগরেছে। সাম্যাবস্থার মধ্যবিন্দুতে আসেননি কেউই। এরকম টানাপোড়েনে অন্য কেউ হলে হয়তো দমে যেতেন। মেনে নিতেন পরাজয়। কিন্তু মানুষটি ভানুসিংহ। এত এত সব নিন্দা, ঈর্ষা, ষড়যন্ত্রের জমাটি সব মেঘের মাঝখান থেকেও ঠিক রবি-কিরণ ছড়িয়েছেন। নিজের আলোয় আলোকিত করেছেন মানুষকে। এই আপামর উপমহাদেশকে।  বাঙালিয়ানাকে। 

এই আধুনিকতার চরম পরাকাষ্ঠার সময়ে এসেও তিনি ঘোরতর প্রাসঙ্গিক। এই প্রাসঙ্গিকতা থাকবে শিল্প-সংস্কৃতির রগড় যতদিন থাকবে, ঠিক ততদিন। ভাবলে অবাকই হতে হয়, এই উপমহাদেশের সাহিত্য ভান্ডারে যে পরিমাণ চুনি-পান্না-হিরে-মানিক দান করে গিয়েছেন তিনি, সে দানের ত্রিসীমানাতেও নেই আর কারো নাম। তবু আশ্চর্য এই যে, এই উপমহাদেশের মানুষজনই জীবদ্দশায় ক্রমাগত আক্রমণ করে গিয়েছেন তাকে। তিনি রেহাই পাননি মৃত্যুর পরেও। অপমান, কুৎসা তো ছিলোই। নানারকম ষড়যন্ত্রমূলক কুৎসার মধ্যমনিও করা হয়েছে তাকে বহুবার।

দ্বন্দ্বমুখর এক জীবনই কাটিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর! 

সাতচল্লিশের দেশভাগের পরে এই নির্মম চর্চাটি যেন আরো প্রকট আকার ধারণ করে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ৷ বলা বাহুল্য, পাকিস্তান ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী৷ তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রচণ্ড উন্মাসিক। দেশভাগের পরপরই তারা ধুনো তুললো- পাঠ্যবই, সাহিত্যকর্ম সবখান থেকে হিন্দু লেখকদের বর্জন করতে হবে। সে বর্জন কীরকম প্রকট ও হাস্যকরভাবে শুরু হয়েছিলো, এক উদাহরণ দিলে তা বুঝতে সুবিধে হবে৷ মদনমোহন তর্কালঙ্কারের 'আমার পণ' কবিতাটি আমরা শৈশবে সবাই পড়েছি৷ সেই কবিতার প্রথম দুই লাইন ছিলো- 

সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি ,
সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।

এই কবিতাটিকে পালটে 'ইসলামিক' করার চেষ্টা করা হলো। সেই চেষ্টা হলো অনেকটা এরকম-

সুবেহ সাদেকে উঠে দিলে দিলে বলি, 
হররোজ আমি যেন ভালো হয়ে চলি।

এই যখন অবস্থা, তখন বিদ্বেষ সবচেয়ে বেশি তীব্র হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপরে। যদিও তাঁর ধর্ম ব্রাহ্ম। তবে ধর্মান্ধদের কাছে তা বড় বিষয় নয়। 'মালাউন কবি' রবীন্দ্রনাথের কোনো কিছুই তারা রাখবে না, এটাই তাদের ঐকান্তিক ইচ্ছে। সেজন্যে রবীন্দ্রনাথের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করিয়ে পাদপ্রদীপের তলে আনা হলো নজরুল এবং ইকবালকে। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী পালনে পাকিস্তান সরকারের গড়িমসি দৃষ্টিকটু এক দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো। ১৯৬৫ সালে ভারত- পাকিস্তান যুদ্ধের পরে রবীন্দ্রনাথকে পাকিস্তান ভূখণ্ডে অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ করা হলো। ৬৭'তে করা হলো লিখিতভাবে নিষিদ্ধ! 

কিন্তু মানুষটি রবীন্দ্রনাথ। সমাজের এক অংশ, সে যত ক্ষুদ্রই হোক, আড়ালে-আবডালে রবীন্দ্রনাথের চর্চা করতে লাগলেন। একাত্তরের যুদ্ধেও রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা প্রেরণা দিলো অনেককে। যুদ্ধ হলো। পূর্ব পাকিস্তান হলো বাংলাদেশ। তবে সদ্যগঠিত বাংলাদেশে কেন যেন আবার উল্টে গেলো সমীকরণ। নজরুলকে আবার টেনে এনে রবীন্দ্রনাথকে আড়ালের চেষ্টা চালানো হলো ক্রমশই। কিন্তু তবুও রবীন্দ্রনাথকে ম্লান করা গেলো না। 

এই বিশদ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে আনার পেছনে প্রধানতম উদ্দেশ্য এটিই, রবীন্দ্রনাথকে যে দমন করে রাখা যায় না, সেটা বোঝানো। বাংলাদেশ ও ভারতে রবীন্দ্রনাথ এখনো প্রবলভাবে চর্চিত একজন মানু্ষ। তাকে নিয়ে ভিন্নমত এখনো আছে। তা থাকবেও আজীবন। তবে তিনি 'ব্রাত্য' হননি মোটেও। স্বমহিমাতেই দাপটের সাথে টিকে আছেন; শিল্প-সংস্কৃতির নানা প্রকোষ্ঠে। তবু, এতসবের ভীড়েও কোনোদিন দূরতম কল্পনাতেও আশা করিনি, ভারত, বাংলাদেশের পাশাপাশি খোদ পাকিস্তানের শিল্পনির্মাণেও দেখবো রবীন্দ্রনাথকে! 

হ্যাঁ, এরকমই এক ঘটনা ঘটেছে পাকিস্তানে। যে পাকিস্তানের চক্ষুশূল ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সেই ভূখণ্ডেই ফিরেছেন রবীন্দ্রনাথ। পাকিস্তানের এক ধারাবাহিক নাটক 'দিল কেয়া করে'র এক পর্বে শোনা গিয়েছে রবীন্দ্রনাথের গান! যদিও এ পর্বটি প্রকাশিত হয়েছিলো দুই বছর আগে। সে সময়ে এই বিষয়টি নিয়ে সেরকম আলোচনা হয়নি। কারণ, অনেকেরই অগোচরে ছিলো বিরল এ ঘটনাটি। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে জানা যায় বিষয়টি। নাটকের সেই বিশেষ দৃশ্যে রবীন্দ্রনাথের 'আমারও পরান যাহা চায়' গানটি গাচ্ছিলেন নাটকের এক চরিত্র। মূল গানটি গেয়েছিলেন 'শর্বরী দেশপাণ্ডে' নামের যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ভারতীয় এক শিল্পী। ভাবতে একটু কষ্ট হলেও, এই কাজটিই হয়েছে। এই ঘটনাতে রবীন্দ্রনাথ কী 'গানের ওপারে' থেকে সবার অলক্ষ্যে মুচকি একটু হাসলেনও? জানা নেই কারো। 

'দিল কেয়া করে' নাটকের সেই বিশেষ দৃশ্য! 

মাত্র এক মিনিট দুই সেকেন্ডের দৈর্ঘ্যের গানের এ অংশ দোর্দণ্ডশাসনে ঘুরে বেড়াচ্ছে অন্তর্জালে। আপাতদৃষ্টিতে একে মহাকালের সাপেক্ষে খুব ছোটখাটো ঘটনা মনে হলেও, এর তাৎপর্য মোটেও সামান্য নয়। 'দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ' হয়ে এই অসাধ্যসাধনটি যারা করলেন, তাদের এ কাজের পেছনে মূল প্রেরণা জানা নেই, তবে নিঃসন্দেহে এ এক যুগান্তকারী ঘটনা। সঙ্গীতের যে কোনো কাঁটাতার হয় না, গুণী শিল্পীকে যে শত অপচেষ্টাতেও দমিয়ে রাখা যায় না, তারই যেন এক অমোঘ দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো গানের এই টুকরো অংশ। 

আশা করি, কাঁটাতার-ধর্ম-বর্ণ ভুলে শিল্পসংস্কৃতির এরকম উদার চর্চা ক্রমাগতই হবে। এই ঘটনাটুকু সেই আশাবাদের মুমূর্ষু পালেই যেন দমকা বাতাস দিয়ে যায়।আশাবাদী হয়ে এ লেখা শেষ করি রবীন্দ্রনাথের নিজের লেখা একটি লাইন দিয়েই। যে লাইনটিই আজকের পুরো লেখার সারসংক্ষেপ। যেখানে তিনি বলেছেন-

তোমরা রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতে পারো, ঘৃণা করতে পারো, কিন্তু উপেক্ষা করতে পারো না৷ 

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এরচেয়ে প্রাসঙ্গিক, অপাপবিদ্ধ সত্যকথন আর হতে পারে না। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা