যারা 'মিরাজ' দেখেননি এবং যারা বলিউডের টেমপ্লেটে ভালো থ্রিলার দেখতে চান, তাদের জন্যে 'দোবারা' একটা ভালো অপশন। যদিও, এ থ্রিলারেও বিস্তর ত্রুটি আছে। তবে, তা থাকা সত্বেও, এ সিনেমা যা অফার করছে, তা খারাপ না। সে হিসেবে 'দোবারা' পাশমার্কই পায়।

সিনেমা বোঝেন এমন একজন দর্শক যখন অনুরাগ কাশ্যপের সিনেমা দেখতে বসেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তিনি শুধু সিনেমা দেখতে বসেন না। বিশেষ সে সিনেমায় কিছু এক্সপেকটেশনসও থাকে তার। থাকাটা স্বাভাবিকও। যে নির্মাতা 'গ্যাংস অব ওয়াসিপুর', 'আগলি' কিংবা 'ডেভ ডি' এর মত সিনেমা বানিয়েছেন... তাকে নিয়ে প্রত্যাশা থাকাটা উচিতও। এবং সে কারণেই হয়তো, প্রত্যাশাজনিত অপ্রাপ্তিতে খুব বাজেভাবে হতাশ করে অনুরাগ কাশ্যপের সাম্প্রতিক সিনেমা 'দোবারা।' স্প্যানিশ ফিল্ম 'মিরাজ' এর বলিউডি রিমেক হিসেবে খুব যে প্রত্যাশা ছিলো 'দোবারা' নিয়ে, তাও না। কিন্তু ডিরেক্টর'স চেয়ারে 'দ্য ফিল্ম ফ্যানাটিক' অনুরাগ কাশ্যপের উপস্থিতিই খানিকটা আশা জোগাচ্ছিলো। কিন্তু সিনেমা শেষে উপলব্ধি হয় এটুকুই- নিষ্পাপ আশার গুড়েও পড়েছে একগাদা বালি।

তবে, গুড়েবালির সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বলে রাখা সমীচীন- স্প্যানিশ 'মিরাজ' এর সাথে এ সিনেমার তুলনা না করাই উচিত। যদিও 'দোবারা'র বেসিক স্কেলেটন 'মিরাজ' থেকেই নেয়া, তবুও তুলনা না করার কারণ, ওরিওল পাওলো'র বিখ্যাত  সিনেমার সাথে 'দোবারা'কে পাশাপাশি বিশ্লেষণে অসঙ্গতিটুকু আরো দৃষ্টিকটুভাবে প্রকট হবে। তারচেয়ে যদি 'দোবারা'কে অরিজিন্যাল ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্ডিয়ান ফিল্ম হিসেবে কল্পনা করে এরপর বিশ্লেষণের চেষ্টা করা যায়, সেটাই হবে বরং সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। ফেয়ার জাস্টিস। 

টিভির সূত্রেই অতীত-ভবিষ্যতের সম্পর্ক! 

'দোবারা'র ঘটনাক্রম শুরু হয় 'পুনে'র এক শহরে প্রচণ্ড দৈবদুর্বিপাকের সময়ে। ক'দিন থেকেই আকাশে মেঘ। ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা। থেকে থেকে ঝোড়ো হাওয়া। আবহাওয়া অফিসের দাবী- প্রচণ্ড এক জিওম্যাগনেটিক স্টর্ম এ শহরে এসে আঘাত করবে কিছুদিনের মধ্যে। এরকমই এই টালমাটাল প্রাকৃতিক ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ সময়ে এই শহরের পুরোনো এক বাড়িতে বাসিন্দা হিসেবে আসেন এক নার্স ও তার পরিবার। আসার কিছুদিন পরে, জিওম্যাগনেটিক স্টর্মের অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক কারিকুরির চক্করে, পুরোনো এক টিভির মাধ্যমে এই নার্সের সাথে সংযোগ হয় অতীতে ঠিক এই বাড়িতেই বসবাস করা এক ছেলের। যে ছেলেটি এক দূর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা গিয়েছিলো বহু বছর আগে! 

গল্প এগোয়। পাকেচক্রে, এই নার্স একদিন সুযোগ পায় অতীতের এই ছেলেটিকে বাঁচানোর। বলাই বাহুল্য, সে ছেলেটিকে বাঁচায়ও। কিন্তু, এই কাজ করতে গিয়ে যা হয়, আচমকা প্যারালাল এক ইউনিভার্স খুলে যায়। ভাগ্যাহত ছেলেটির পাশাপাশি পালটে যায় নার্সের নিজের ভাগ্যও। এবং পালটে যাওয়া এই ভাগ্যে সে হারিয়ে ফেলে নিজের পরিবারকে, নিজের ছোট মেয়েকে। ঠিক তখনই শুরু হয় তার চেনাপরিচিত ইউনিভার্সকে খুঁজে বের করার সংগ্রাম। নিজের মেয়েকে খুঁজে পাবার লড়াই। 

খুব একটা কনভিন্সিং লাগেনা তাপসী পান্নুর এ জার্নি! 

এবার, এই যে বিজারে থ্রিলার গল্প, এ গল্প শুধু এটুকুই না। এখানে নানারকম সাবপ্লট আছে। খুন আছে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক আছে, প্রেম আছে, বিচ্ছেদ আছে, হুটহাট সাসপেন্স আছে। সবমিলিয়েই মোটামুটি এক পটবয়লার। মূল গল্পের সাথে ঠিকঠাক সহাবস্থানেও তারা আছে। সেখানে সমস্যাও নেই। কিন্তু, সমস্যা অন্যখানে। যে সমস্যার নাম- বিশ্বাসযোগ্যতা। 'দোবারা'র যে মূল গল্প, সেখানে ফিউচারের সাথে পাস্ট এর যে কানেকশন, এবং সেখানে ক্যারেক্টারদের যে ইমোশনাল অ্যান্ড পিকুলিয়ার জার্নি, প্যারালাল ইউনিভার্সে তাদের যে মেন্টাল কনফ্লিক্ট, সেটা দর্শককে যেভাবে আলোড়িত করা উচিত,  সেভাবে করে না। প্রোটাগনিস্ট 'তাপসী পান্নু'র চরিত্রের উপর গল্পের অবলম্বন থাকে অনেকটুকু। গল্পকে সাপোর্ট দেবার সে দায়িত্ব ঠিকঠাক পালনেও ব্যর্থ হন তিনি। বাকিরা চরিত্রের বিন্যাসে যদিও মোটামুটি উতরে যান। কিন্তু প্রত্যাশার মাপকাঠিতে মোটেও পর্যাপ্ত হয়না তা। 

পাশাপাশি, অনেকটুকু প্রত্যাশা থাকে অনুরাগ কাশ্যপের উপরেও। কিন্তু সিনেমার পুরো সময়জুড়ে বারবারই সে প্রশ্ন আসে মাথায়- এ সিনেমা সত্যিই কি অনুরাগ কাশ্যপ বানিয়েছেন? এ প্রশ্ন মাথায় আসার সঙ্গত কারণও আছে। রুটেড ফিল্ম এর এক্সিলেন্স এর কথা যিনি বরাবর বলেন, 'সিনেমা'র ভিজ্যুয়াল বিউটির নানা ডাইমেনশন নিয়ে যিনি গভীরভাবে ভাবেন এবং সে কথা ও ভাবনার পুরোটুকুই যেভাবে অনুপস্থিত থাকে এ সিনেমায়, বিস্ময়বোধ হয় সেখানেই। 'দোবারা' দেখতে দেখতে তাই বারবার 'মিরাজ' এর কথাই অনুরণিত হয় মস্তিষ্কে। অ্যাডাপ্টেশনেও যে নতুন কোনো বিষয় ইনকর্পোরেট করা যায়, কোনোকিছুকে রেপ্লিকেট করলেও যে সেখানে ইউনিক বিষয় আনা যায়, অনুরাগ কাশ্যপের কাছ থেকে সেরকম অনুষঙ্গ প্রত্যাশিত থাকলেও তিনি সে পথে হাঁটেন না। জনপ্রিয় ফিল্ম ক্রিটিক অনুপমা চোপড়া 'দোবারা'র রিভিউতে বলছিলেন-

অনুরাগ কাশ্যপ বোধহয় এ সিনেমা অটোপাইলট মোডে থেকে বানিয়েছেন! 

দুঃখজনক এটাই, সিনেমাটা দেখার পরে কথাটাকে ঠিক উড়িয়েও দেয়া যায় না।

তবে, পাশাপাশি এও ঠিক, যারা 'মিরাজ' দেখেননি এবং যারা বলিউডের টেমপ্লেটে ভালো থ্রিলার দেখতে চান, তাদের জন্যে 'দোবারা' একটা ভালো অপশন। যদিও এ থ্রিলারে বিস্তর ত্রুটি আছে, সিরিয়াস মোমেন্টে অনর্থক গান ঢুকিয়ে মেজাজ খিচড়ে দেয়া আছে, ইমোশনাল জার্নির সাথে কানেক্ট না হতে পারার আক্ষেপও আছে। তবে, সে সব সত্বেও, এ সিনেমা যা অফার করছে, তা খারাপ না। সে হিসেবে 'দোবারা' পাশমার্কই পায়। কিন্তু, মুদ্রার ওপাশে, যারা 'মিরাজ' দেখেছেন এবং অনুরাগ কাশ্যপ এখানে কেমন করলেন তা পরখ করার জন্যে 'দোবারা' দেখার পরিকল্পনা করছেন, তাদের উদ্দেশ্যে কথা এটুকুই- এ সিনেমা দেখার পরিকল্পনা বাতিল করাই সমীচীন। কারণ, যে পরিকল্পনায় আশাহত হবার সুযোগ বিস্তর, দিনশেষে তা উপেক্ষা করাই শ্রেয়৷ 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা