ডিউন' নিয়ে এ পর্যন্ত যত সিনেমা, সিরিজ, ডকুমেন্ট্রি হয়েছে, সেগুলোর তুলনায় ভিলেনেভের এই নির্মাণ প্রথমেই স্বতন্ত্রতা দেখিয়েছে অভিনব এক্সিকিউশনে। প্রত্যেক হাউজের আলাদা ঘ্রাণ, আলাদা আবহ, 'আরাকিস' এর থমথমে ভয়াবহতা... সব দুর্দান্ত। পাশাপাশি হ্যান্স জিমারের মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট এবং দুর্দান্ত এক সুররিয়ালিস্টিক গল্পে সওয়ার হয়ে 'ডিউন' যে বিশ্ব কাঁপানোর জন্যেই এসেছে, তা নিয়ে সন্দেহ থাকা উচিত না মোটেও...

এ পর্যন্ত ঠিক যারাই ফ্রাঙ্ক হার্বার্টের সাই-ফাই উপন্যাস 'ডিউন'কে সিনেমায় রূপান্তরিত করতে চেয়েছেন, অদ্ভুতভাবে তারা সবাই-ই ব্যর্থ হয়েছেন। ডেভিড লিঞ্চের মতন বিখ্যাত পরিচালক ব্যর্থ হয়েছেন। পরবর্তীতে আলেজান্দ্রো জোডোরস্কিও ব্যর্থ হয়েছেন৷ জোডোরস্কি বেশ তোড়জোড় করেই নেমেছিলেন 'ডিউন' নিয়ে। পিঙ্ক ফ্লয়েড, সালভাদর দালি, অরসন ওয়েলেস... 'ডিউন' প্রজেক্টে তিনি যুক্ত করেছিলেন অনেককেই। তবুও পুরো আয়োজন মুখ থুবড়ে পড়ে। ইউটিউবে এই ব্যর্থতা-বিষয়ক ডকুমেন্ট্রিও আছে। আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন। পরবর্তীকালে 'ডিউন' নিয়ে মিনি সিরিজও করা হয়। বলাবাহুল্য, সেটিও ফ্লপ হয়।

এবং এর পর থেকেই হার্বার্টের 'ডিউন'কে খানিকটা এড়িয়েই চলে সবাই। সায়েন্স ফিকশনের বাইবেল হিসেবে যে 'ডিউন' সারাবিশ্বে সমাদৃত, সেই 'ডিউন'কে কেউ কেন সফলভাবে পর্দায় আনতে পারেন না, সে রহস্য অমীমাংসিত হিসেবেই থেকে যায়। অতৃপ্তি সঙ্গী হয় দর্শকের। সিনেমামোদীদের মাথায় নিয়মিত একই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে- 'ডিউন' কী ঠিকঠাকভাবে পর্দায় ফিরবে না কোনোদিন? 

প্রশ্ন আসতে পারে, কেন এই কালজয়ী সাহিত্যকর্মকে পর্দায় রূপান্তরিত করা সম্ভব হয়নি কখনোই? এর পেছনে বহু কারণ আছে। প্রথমত- 'ডিউন' উপন্যাসে অন্য এক পৃথিবীর চিন্তাভাবনাকে যেভাবে গভীরে প্রসারিত করেছিলেন হার্বার্ট, সেটিকে পর্দায় রূপান্তরিত করা খুব শক্ত। বিচিত্র এক গ্রহ, সেখানে বুদ্বুদের মতন ক্রমশ তড়পাতে থাকা ধর্ম-সংস্কার-কুসংস্কার...নানাবিধ বিষয়ের অতলে তলিয়েছেন হার্বার্ট। এছাড়াও উপন্যাসে তিনি কথা বলেছেন বহু আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে। সাইফাই এর মধ্যেও ডার্ক হিউমার এনেছেন। সুররিয়ালিজম এনেছেন। রাজনীতি, নৃশংসতা, আধিভৌতিক বিষয়... সবই এনেছেন লতায়-পাতায়। স্লোবার্ণ এ উপন্যাসকে তাই সিনেমাতে ট্রান্সফর্ম করলে অনেক দর্শকই যে ঠিক জুত পাবে না, সেটি ছিলো অবধারিত সত্য। 'মশলামুড়ি' সিনেমার যুগে মস্তিষ্ক খাটিয়ে ভাবনাচিন্তা কেই বা করবে? কারই বা এত দায়? এই উপন্যাসে আসা বিষয়গুলো এতটাই জটিল, 'ডিউন'কে ফ্রন্টলাইনে রেখে সাফল্য পেতে তাই কালোঘাম ছুটে গিয়েছে দুঁদে সব নির্মাতাদের। 

সেজন্যেই তাই ডেনি ভিলেনেভ যখন ঘোষণা দিলেন- 'ডিউন' বানাবেন তিনি, ঠিক ভরসা পাওয়া গেলো না৷ যদিও 'অ্যারাইভাল' কিংবা 'ব্লেড রানার' নির্মাণ করে তিনি সবারই বেশ আস্থাভাজন, কিন্তু 'ডিউন' এর যে আবহ, তা পর্দায় আনার চেষ্টা করা এবং সে নির্মাণ ব্যবসাসফল হবে সে চিন্তা করা... তা আকাশকুসুম কল্পনা। তবুও ভিলেনেভ গোঁ ধরে রইলেন। পরিকল্পনা করলেন- তিন পর্বে 'ডিউন' নিয়ে আসবেন। যার প্রথম পর্ব মুক্তি পেলো সম্প্রতি। 

মুক্তি পাওয়া প্রথম পর্বে 'ডিউন' উপন্যাসের যে অনেকটুকুই এলো, তাও জোরগলায় বলা যাবে না মোটেও। ভিলেনেভ রয়েসয়ে এগোনোর নীতিতেই যে এগোচ্ছেন, তা সিনেমায় বেশ ভালোভাবে দ্রষ্টব্য। 'ডিউন-পার্ট ওয়ান' এ তাই ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট, হিস্টোরিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড এবং 'ডিউন' এর সেই অ্যাবসার্ড পৃথিবী রইলো কেন্দ্রবিন্দুতে৷ কস্টিউম ডিজাইন, সিনেম্যাটোগ্রাফী কিংবা সেট ডিজাইনে ভিলেনেভ এমন এক পৃথিবীকে ধরতে চাইলেন, যে পৃথিবীর আকাশজুড়ে গভীর আধিভৌতিক বিষয়ের উপস্থিতি। সিজিআই এর উপরে খুব বেশি আস্থা না রেখে ভিলেনেভ ফিজিক্যালি এমন এক গ্রহকে তুলে আনলেন পর্দায়, যে গ্রহে ভয় এবং মানবিকতা চলে পাশাপাশি। সমান্তরালে।

ডিউনিভার্স! 

সিনেমার মূল-গল্প খুব যে অন্যরকম, তা বলা যাবে না। শুরুতেই দর্শক দুটি ভিন্ন শিবিরের পরিচয় পাবে। যাদের একটি- হাউজ আট্রেইডেইস। আরেকটি- হাউজ হারকোনেনস। প্রোটাগনিস্ট আট্রেইডেস এর সাথে অ্যান্টাগনিস্ট হারকোনেনস এর তুমুল বৈরীতার সম্পর্ক। হাউজ হারকোননেনস বরাবরই সহিংস। নৃশংস। অপরদিকে হাউজ আট্রেইডেস মানবিক। ন্যায়পরায়ণ। হেগেলের 'থিওরি অব কনফ্লিক্ট' মেনে দর্শক প্রথম থেকেই পক্ষ নেবে ভালো শিবিরের। অর্থাৎ, হাউজ আট্রেইডেইস এর। 

গল্প শুরু হয় পল অ্যাট্রেইডেইসকে সামনে রেখে। পল, ডিউক লিও অ্যাট্রেইডেইস এবং লেডি জেসিকা অ্যাট্রেইডেইস এর সন্তান৷ অসীম ক্ষমতাবান এ কিশোর নিজে তার শক্তি সম্পর্কে উদাসীন। মাঝেমধ্যেই বিদঘুটে সব স্বপ্ন দেখা এবং নিজের অমিত শক্তির আকস্মিক সব প্রকাশ নিয়েই পথচলা তার। পলের বাবা লিও এবং মা জেসিকারও বিশেষ কিছু ক্ষমতা আছে। সিনেমার অগ্রগতির সাথে সাথে যা জানতে পারবে দর্শক। অপরদিকে, প্রতিপক্ষ শিবিরের 'হাউজ হারকোনেনস' এর খুব বেশি চরিত্র নিয়ে জানা যায় না৷ তবে সর্বাগ্রে পাওয়া যায় ভ্লাদিমার হারকোনেন'কে। যিনি পর্দায় যতবারই উপস্থিত হয়েছেন, অদ্ভুত ত্রাস সঞ্চার করেছেন। ভয়াল চেহারা, নৃশংস আচরণ ও জঘন্য কীর্তিকলাপে তিনি বরাবরই বিষিয়ে তুলেছেন সব। 

ভ্লাদিমার হারকোনেনস! 

দুই হাউজের বৈপরীত্য দেখাতে দেখাতে গল্প ক্রমশ থিতু হয় 'আরাকিস' নামের এক ভয়াল মরুভূমিতে। এই মরুভূমিকে 'ভয়াল' বলার কারণ, অস্বাভাবিক তাপমাত্রার পাশাপাশি এখানে আছে 'স্যান্ড ওর্ম' নামের অতিকায় এক প্রাণী, মাটিতে ছন্দবদ্ধ হাঁটার শব্দ পেলেই যে নিমিষে চলে আসে গ্রাস করার জন্যে। এছাড়াও আছে নীল চোখের ফ্রেম্যান, যারা 'আরাকিস' মরুভূমির বাসিন্দা। দয়ামায়াহীন এ মানুষেরা ক্ষেত্রবিশেষে পিশাচের চেয়েও নিকৃষ্ট। পাশাপাশি জনমানবহীন রুক্ষ প্রকৃতি তো রইলোই। 

স্যান্ড ওর্ম! 

এইসব ভয়াল অনুষঙ্গে ঠাসা 'আরাকিস' মরুভূমিতে একদিন আসে হাউজ আট্রেইডেইস এর পুরো লটবহর।  উদ্দেশ্য- 'মেলাঞ্জ' নামের এক মশলা সংগ্রহ করা, যা শুধুমাত্র 'আরাকিস' এর জমিতেই জন্মায়। এবং যে 'মেলাঞ্জ' এর দখল নেয়ার জন্যে মরিয়া ফ্রিমেন, আট্রেইডেইস এবং হারকোনেনস...প্রত্যেকেই। গল্প 'আরাকিস' এ আসার পরমুহূর্ত থেকেই গতি পায়। ক্রমশ নানাবিধ অনুষঙ্গ যুক্ত হতে শুরু আরাকিস এর মরুভূমিতে। ভিন্ন ভিন্ন শিবির যুদ্ধাংদেহী মনোভাবে দাঁড়ায় একে অন্যের বিপক্ষে। সম্মুখ সমরে।

প্রথমেই যেটা বলার, 'ডিউন' নিয়ে এ পর্যন্ত যত সিনেমা, সিরিজ, ডকুমেন্ট্রি হয়েছে, সেগুলোর তুলনায় ভিলেনেভের এই নির্মাণ প্রথমেই স্বতন্ত্রতা দেখিয়েছে এর অভিনব এক্সিকিউশনে। প্রত্যেক হাউজের আলাদা ঘ্রাণ, আলাদা আবহ, আলাদা পোশাক, আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা, 'আরাকিস' এর থমথমে ভয়াবহতা, আকাশে ভেসে বেড়ানো অদ্ভুতদর্শন যান...এসব নিয়ে ভিলানেভ এবং গোটা টিম যে প্রচুর গবেষণা করেছেন, তা বলাই বাহুল্য। এবং এই ডিউনিভার্স এর পুরো বিষয় নির্মাতা যেভাবে ধীরে ধীরে খোলসা করেছেন দর্শকের সামনে, সেটিও অভিনব। নির্মাতা ডেভিড লিঞ্চ যেমন আক্ষেপ করে বলেছিলেন- দুই ঘন্টার সিনেমায় 'ডিউন' উপন্যাস এর কিছুই আনা সম্ভব নয়, সেটি মাথায় রেখেই ভিলেনেভ সুতোর জট ছাড়িয়েছেন ধীরে ধীরে। তড়িঘড়ি না করে। 

যদিও এই 'ধীরে বহো' নীতি ঠিক ক'জন দর্শকের পছন্দ হবে, সেটি বেশ ভাববার মতন বিষয়। স্লোবার্ণ স্ক্রিনপ্লে'র রূপান্তরের সাথে ধৈর্য ধরে রাখা বেশ অগ্নিপরীক্ষাই হয়ে যাবে অনেকের জন্যে। তাছাড়া 'সাইফাই' শুনলেই আমরা যেমন ভাবি অদ্ভুত স্পেসস্যুট পরে কিছু মানুষ তুমুল মারপিট করছে, তাও নেই এখানে। বরঞ্চ রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন, পরাবাস্তববাদ...গ্রে ম্যাটারকে ব্যস্ত করার যেসব উপাদান আনা হয়েছে এখানে, তাও অনেক দর্শকের করোটিকে বেশ ভালোই উত্তপ্ত করবে। সে হিসেবে বলা যায়, ভিলেনেভের এই নির্মাণ সব দর্শকের জন্যে নয়। যেসব দর্শক সিনেমা বোঝার জন্যে খানিকটা মেহনত করতে রাজি, ভিলেনেভের 'ডিউন' তাদের জন্যেই। 

সিনেম্যাটোগ্রাফী কিংবা সেট ডিজাইন অথবা সিজিআই নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। দুর্দান্ত। আলাদা করে বলতে হবে শব্দের কথা। এ নির্মাণে বাদবাকি সবার পাশাপাশি আলাদা এক চরিত্র হয়েই যেন দাঁড়িয়েছিলো শব্দ, বিজিএম। যার পুরোপুরি কৃতিত্ব হ্যান্স জিমারের। শব্দের গুণে এই নির্মাণ উপভোগের মাত্রা যে বেড়ে যাবে বহুগুণে, তা সিনেমা দেখলেই বোঝা যাবে।

মহামারীর পরে অনেক প্রেক্ষাগৃহ আস্তে আস্তে খুলছে। যারা প্রেক্ষাগৃহে সরাসরি জায়ান্ট স্ক্রিনে এই সিনেমা দেখার সুযোগ পাবেন, তাদের যে বেশ অন্যরকম এক অভিজ্ঞতাই হবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এছাড়াও স্টারকাস্ট- জ্যাসন মোমোয়া, অস্কার আইজ্যাক, টিমোথি চ্যালামেট, রেবেকা ফার্গুনস...তারাও আড়াই ঘন্টার এ জার্নিকে সময়ের নানা ভাগে বেশ উপভোগ্য করেই তুলবে।

জ্যাসন মোমোয়া!

 

তবে সতর্কতা এটাই, 'ডিউন' দেখতে গেলে আগে থেকে পড়াশোনা করে যাওয়ার বিকল্প নেই। প্রারম্ভিক কিছু বিষয় জেনে গেলে দেখার তৃপ্তি বাড়বে। এবং অতি অবশ্যই স্লোবার্ণ স্ক্রিনপ্লে'র সাথে অভ্যস্ত থাকতে হবে। খুব বেশি অ্যাকশনের প্রত্যাশা না করে ভিন্ন স্বাদের এক গল্প প্রত্যাশা করে গেলে 'ডিউন' দেখে আশাহত হবেন না কেউই। এবং ডেনি ভিলেনেভ যেভাবে শুরু করেছেন 'ডিউন', তাতে তিনি যে আগের নির্মাতাদের পরিণতি অনুসরণ করবেন না, তা এখনই বেশ বোঝা যাচ্ছে। ফ্রাঙ্ক হার্বার্ট যে জমাট রহস্যের পৃথিবীর গল্প লিখে গিয়েছিলেন 'ডিউন' এ, সেটি ভিলেনেভ যে বেশ ভালোই আত্মস্থ করেছে, তা এই নির্মাণ দেখলেই বুঝতে পারবেন মনোযোগী দর্শক। ভিলেনেভের 'ডিউন' এর চমৎকারিত্বের সেটিই প্রধান কারণ! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা