নির্মাতা কবির খান ইমোশনাল ড্রামা বানাতে কতটা সিদ্ধহস্ত তা বজরঙ্গি ভাইজান, ফ্যান্টম কিংবা টিউবলাইট দেখলেই বুঝতে পারার কথা। '৮৩' নামক স্পোর্টস পিরিয়ড ড্রামায় সেই ইমোশন তিনি কতটুকু আর কিভাবে সঞ্চার করবেন, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা। কবির-রনবীর জুটি ঠিক কতটা খোলতাই হবে, সেটিই এখন প্রমাণের পালা!

নিজের দেশের ক্রিকেট টিম যখন প্রতিদিনই নাস্তানাবুদ হচ্ছে প্রতিপক্ষের কাছে, এরকম এক সময়ে প্রতিবেশী দেশের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের ঐতিহাসিক ঘটনার উপর নির্মিত সিনেমা '৮৩' এর ট্রেলার দেখে খানিকটা মিশ্র অনুভূতিতে আক্রান্ত হলাম। বৈশ্বিক আসরে বড় কোনো ট্রফি জেতার প্রতিক্রিয়ায় যেভাবে খোলনলচে পালটে যায় সবকিছু, সেটা ভেবে নিজের দেশের জন্যে খানিকটা আক্ষেপও হলো। সঠিক জানা নেই, আক্ষেপের এ সমীকরণ শেষ কবে হবে। তবে আপাতত এই বিষাদ সরিয়ে কথা বলা যাক '৮৩' এর ট্রেলার নিয়েই।

সাল ১৯৮৩ নিয়ে ভারতবাসীর আবেগ চিরন্তন। এক বিশ্বকাপের সুবাদে তারা যে অনুভূতিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, সে অনুভূতি সঞ্চারিত হয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। স্মৃতি মলিন হয়। কিন্তু কিছু স্মৃতি মলিনতার ধার ধারে না। সফেদ আবেশ ছড়িয়ে জ্বলজ্বলে আবহে থেকে যায় মস্তিষ্কে। এ স্মৃতিও অনেকটা সেরকম। ছিপছিপে কোঁকড়াচুলো কপিল দেবের হাতে যে রাতে বিশ্বকাপের শিরোপা উঠলো, সে রাতে বিরল এক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে অশ্রুসজল বহু ভারতীয় যে সারারাত ঘুমোতে পারেনি, তা নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায়। ট্রেলারের এক অংশে ভারতীয় ক্রিকেট টিমের বিশ্বকাপ দলের ম্যানেজার পি আর মান সিং বলছিলেন- পয়ত্রিশ বছর আগে স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু সম্মান, সেটা আজও পাইনি, ক্যাপ্টেন।  বিশ্বমঞ্চে সম্মান পাওয়ার সে কাজটিই যেন হয়ে যায় এই শিরোপার বদৌলতে। বিশ্বকাপ জেতার প্রতিক্রিয়ায় ক্রিকেট নিয়ে ভারতের আগ্রহ, মাতামাতি কিংবা  উন্মাদনা উঠে পড়ে বিশেষ এক উচ্চতাতেও। যে উচ্চতাকে স্পর্শ কিংবা উপলব্ধি করার জন্যেই কবির খানের এই নির্মাণ- '৮৩।' 

এ সিনেমার ট্রেলারে ঐতিহাসিক সে সময়কে ধরার আপ্রাণ চেষ্টাই করলেন কবির খান। অস্ট্রেলিয়া এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে নাকানিচোবানি খাওয়ার পরের ম্যাচ অর্থাৎ জিম্বাবুয়ের সাথে ভারতের ম্যাচ দিয়ে শুরু হলো ট্রেলারের ন্যারেশন। ধারাভাষ্যকার জানালেন, এই ম্যাচে কেবলমাত্র বড় মার্জিনে জিততে পারলেই ভারত টিকে থাকবে টুর্নামেন্টে। আর যদি তা না হয়, তাহলে ফেরার টিকেট কাটাটাই সমীচীন। এরকম এক 'ডু অর ডাই' ম্যাচে খেলতে নেমেও প্রথমে ছন্দপতন। তাসের ঘর। ভারতের স্কোরকার্ডে ৯ রান যুক্ত হতেই অদৃশ্য ৪ উইকেট। সাজঘরে যখন শঙ্কার থমথমে কালো মেঘ, তখন ক্রিজে নামলেন কপিল দেব। তারপর? তারপরের অংশটুকু সিনেমাতেই দেখে নেয়া সমীচীন। 

ভারত যখন তিরাশির বিশ্বকাপ খেলতে যায় ইংল্যান্ডে, তখন তাদের আর্থিক অবস্থা শোচনীয়। 'আন্ডারডগ' হিসেবে তাদের অবস্থান তখন এতটাই তলানিতে, কেউই ঠিক অতটা গুরুত্ব দেয়নি তাদের। বিশ্বকাপের বাকি টিমেরা টিমবাস পেলেও তাদের জন্যে টিমবাসের ব্যবস্থা রাখা হয় না, দর্শকেরাও কোনো প্রত্যাশা রাখেনা তাদের উপরে। এরা যে কিছুই করতে পারবে না, সেটি মেনেই যেন হতে থাকে বাকিসব কাজ। টিম ইন্ডিয়ার 'মিট দ্য প্রেস' এর সময়ে সাংবাদিকদের অধিকাংশ আসন মুখব্যাদান করে তাকিয়ে থাকতো। সাংবাদিকদের নিয়মিত উপেক্ষাবাণে নিরন্তর বিদ্ধ হতো এই আন্ডারডগ টিম। এভাবেই ক্রমাগত অপমান, উপেক্ষা, বঞ্চনার সমীকরণের মধ্যে শুরু হয় ভারতের বিশ্বকাপ অভিযান। প্রথম দুই ম্যাচে ধাক্কা খাওয়ার পরে তৃতীয় ম্যাচ, আচমকাই দেয়ালে পিঠ। এরপরই শুরু অসাধ্যসাধন করার গল্প।  প্যারাডাইম শিফটের অন্যরকম এক উপাখ্যানের শুরু এখান থেকেই। 

মাঠের রোমাঞ্চ রীতিমতো গায়ে কাঁটা দেবে অনেকেরই! 

মাঠের এসব রোমাঞ্চের মাঝেই আশেপাশের নানা কমেডি সাসপেন্স, ইমোশনাল আপ-ডাউন,  ইন্ডিয়ান জিঙ্গোইজম এর সাত-সতেরো... সবই উপস্থিত প্রায় চার মিনিটের এ ট্রেলারে৷ ক্যামিও দৃশ্যে দীপিকা পাড়ুকোন আছেন। সিচুয়েশনাল কমেডি আছে। গুজবাম্প দেয়ার মতন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আছে। তবে সবকিছু ছাপিয়েও চোখ আটকে রইলো রনবীর সিং এ। এই অভিনেতা যখন যে চরিত্রে অভিনয় করেন, তখন পুরোপুরিই সে চরিত্রে ঢুকে যান, তা সবারই জানা। '৮৩'তে তিনি যেন আরেক ধাপ সরেস। ট্রেলারের কিছু অংশ দেখে খানিকটা ধন্দেই পড়ে গিয়েছিলাম যেন। 'রনবীর সিং' নাকি কপিল দেবকেই দেখছি সরাসরি, বিভ্রান্ত হচ্ছিলাম। কপিল দেবের মতন মেকআপ, ডায়লগ ডেলিভারি, বডি ল্যাংগুয়েজ তো আছেই। কোথাও গিয়ে যেন কপিল দেবের সে সময়ের সত্বাটাকেই ধারণ করে নিয়েছেন রনবীর সিং। মুগ্ধ হয়েছি। পাশাপাশি বাকি সব অভিনেতাদের অভিনয়, মেকআপ অনবদ্য। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে ভারতের দ্বৈরথের ঈষৎ কমিক রিলিফ যোগ করা হলো যেখানে, সে অংশটুকুও উপভোগ্য। 

ক্যামিও দৃশ্যে দীপিকা পাড়ুকোনও উপস্থিত হলেন! 

নির্মাতা কবির খান ইমোশনাল ড্রামা বানাতে কতটা সিদ্ধহস্ত তা বজরঙ্গি ভাইজান, ফ্যান্টম কিংবা টিউবলাইট দেখলেই বুঝতে পারার কথা। '৮৩' নামক স্পোর্টস পিরিয়ড ড্রামায় সেই ইমোশন তিনি কতটুকু আর কিভাবে সঞ্চার করবেন, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা। কবির-রনবীর জুটি ঠিক কতটা খোলতাই হবে, ভারতীয়দের আবেগের জায়গায় ঠিক কতটুকু আলোড়ন তুলবে এই নির্মাণ, সেটিই এখন আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা