নির্মাণের শিরোনামের 'তেলাপোকা' বারবারই এসেছে ক্যামেরার সামনে। কখনো হ্যান্ডমাইকের শব্দে, কখনো লিফলেটে, কখনো র‍্যাপে। পাশাপাশি তেলাপোকা মারার বিষ বিক্রি করা রহস্যময় ভদ্রলোক, চায়ের দোকানে জটলার মধ্যমণি রঙিন টেলিভিশনে বাংলা সিনেমা, নির্মাণের একেবারে প্রথম দৃশ্যেই তেলাপোকার তড়পানো ও অদূরে পিস্তলের আওয়াজের মেলবন্ধন... এগুলো বেশ দারুণভাবেই যুক্ত হয়েছে গল্পের সাথে!

অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে

শরৎচন্দ্রের অমোঘ এই বাক্যে জীবনের গূঢ় তাৎপর্য  নিয়ে যেমন এক অতলস্পর্শী ধারণা পাওয়া যায়, সে সাথে বিশেষ এক কীটের অমরত্বেরও বেশ স্বচ্ছ সুলুকসন্ধান ফুটে ওঠে চোখের সামনে। যে কীটের নাম- তেলাপোকা। গৃহাভ্যন্তরের নিঃসীম আঁধারে যার অবস্থান৷ তবে এখানে খানিকটা চমক আছে। এই তেলাপোকার বাইরেও আরেক শ্রেনীর তেলাপোকা রয়েছে, যারা আমাদের আশেপাশে 'মানুষ' হয়ে বসবাস করে। এঁদোবস্তির স্যাঁতসেঁতে গহীনে যাদের নিবাস। একটু সুযোগ পেলেই যারা ধরাকে সরাজ্ঞান করতে চায়। উড়তে চায়৷ এবং যখনই তাদের ওড়ার সাধ হয়, তখনই কেউ না কেউ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে তাদের পিষে ফেলে সস্তা চপ্পলের তলদেশে। সাঙ্গ হয় তেলাপোকার জীবনীগল্পের।

'একজন তেলাপোকা'ও হয়তো এরকম একজন মানুষরূপী তেলাপোকার আখ্যান। 'হয়তো' বলছি, কারণ মূলগল্প আগেই খোলাসা করা মোটেও সমীচীন হবে না। যাই হোক, 'একজন তেলাপোকা'র শুরুতেই আসেন আসলাম, যিনি শহরের ভাগ্যবিড়ম্বিত এক রিক্সাচালক। 'ঠুঁটোকপাল' এর সার্থক উদাহরণ যে মানুষটি রাস্তার ভুল দিক দিয়ে ত্রিচক্রযান চালাতে গিয়ে সিএনজির সাথে সংঘর্ষে আহত হন। আহত হয় রিকশাও। রিকশার যিনি মালিক তিনি আসলামকে অম্লমধুর কথা শুনিয়ে গ্যারেজ থেকে বের করে দেন। জানিয়ে দেন- আসলাম যেন ঘূনাক্ষরেও এদিকে না আসে আর।  বিড়ম্বিত আসলাম পড়ে শঙ্কায়। কী করবে? ঘরে চাল নেই, আছে বউয়ের নোংরা কটুক্তি। টাকা নেই।  আছে অভাব। অসার সব, অনেকটা যেমন- খিদের অভাবে পূর্ণিমার চাঁদ আর ঝলসানো রুটি। উদভ্রান্ত হয়ে সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে হাঁটতে থাকা আসলামের ভাগ্য আচমকাই ফেরে। মুখে মুখোশ আর হাতে এক বিশেষ যন্ত্র নিয়ে আসলাম শুরু করে নতুন জীবনের এক উপাখ্যান। শোণিত উপাখ্যান। 

গত ঈদে গোলাম মুনতাকিমের নির্মাণ 'কাউয়া' নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা  হয়েছিলো। তারই প্রেক্ষিতে যখন জানা গেলো, স্ট্রিমিং সাইট 'চরকি'তে তার নির্মাণ 'একজন তেলাপোকা' আসবে, খানিকটা প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই তৈরী হয়েছিলো। সে প্রত্যাশার পুরোটা যে পুরণ হয়েছে, এমনটা বলতে পারা না গেলেও, নির্মাণ খুব যে যাচ্ছেতাই হয়েছে, সেটিও বলা যাবেনা মোটেও। তবে মনে হয়েছে, যে গল্পকে কেন্দ্র করে পুরো নির্মাণ, সে গল্প চাইলেই আরেকটু ছিমছাম করা যেতে পারতো। সর্বসাকুল্যে আটত্রিশ মিনিটের এ নির্মাণে চাইলে প্রোটাগনিস্ট 'আসলাম' চরিত্রটিকে আরেকটু মেটাফোরিক্যালি কানেক্ট করা যেতে পারতো। বাদবাকি চরিত্রগুলোকেও খুব নিবিড়ভাবে গল্পের সাথে যুক্ত করা যেতে পারতো। যদিও তার কোনোকিছুই ঠিকঠাকভাবে হয়নি এ নির্মাণে। 

ডাবল শেডের ক্যারেক্টারে রইলেন মনোজ প্রামাণিক! 

যখন নির্মাণের দৈর্ঘ্য কম হবে, তখন কুশীলব-তালিকাও সংক্ষিপ্ত হওয়া সমীচীন। নাহয় বহু অভিনেতার ভীড়ে গল্প আপেক্ষিকতা হারায়। এই নির্মাণেও যেমন শিল্পীসংখ্যা আরেকটু কমানো যেতে পারতো। ছোট গল্প, স্বল্প কুশীলব, মধুরেণসমাপয়েৎ... এভাবেই হতে পারতো সব। হয়নি। তবুও যারা অভিনয় করলেন, স্বল্পদৈর্ঘ্যের মধ্যেও ভালো কিছু করারই চেষ্টা করলেন। প্রোটাগনিস্ট 'আসলাম' ওরফে মনোজ প্রামাণিক ডাবল শেডের ক্যারেক্টারে রইলো। খারাপ করলেন না। শতাব্দী ওয়াদুদ অল্পসময়ের 'রগচটা নেতা' হিসেবেও মানানসই। আলাদাভাবে নজর কাড়লেন হুমায়রা স্নিগ্ধাও। বাকিরাও ঠিকঠাক।

দারুণ করেছেন শতাব্দী ওয়াদুদও! 

'একজন তেলাপোকা'য় রূপক কিছু বিষয়ের উপস্থিতি বেশ সাবলীল ছিলো। নির্মাণের শিরোনামের 'তেলাপোকা' বারবারই এসেছে ক্যামেরার সামনে। কখনো হ্যান্ডমাইকের শব্দে, কখনো লিফলেটে, কখনো র‍্যাপে। পাশাপাশি তেলাপোকা মারার বিষ বিক্রি করা রহস্যময় ভদ্রলোক, চায়ের দোকানে জটলার মধ্যমণি রঙিন টেলিভিশনে বাংলা সিনেমা, নির্মাণের একেবারে প্রথম দৃশ্যেই তেলাপোকার তড়পানো ও অদূরে পিস্তলের আওয়াজের মেলবন্ধন...সবকিছুই অনবদ্য। যদি গল্প আরেকটু খোলতাই হতো, যদি চরিত্রগুলো নিয়ে আরেকটু গবেষণা হতো, তাহলে এ নির্মাণ নিয়ে যে বিস্তর কথাবার্তা হতো, তা হলফ করে বলাই যায়। যদিও তা যে হলোনা, সে দায় নির্মাতা ও নির্মাণ-সংশ্লিষ্ট সবার। আশা করবো, এবারের ত্রুটি সামলে আশাজাগানিয়া এ নির্মাতা খুব তাড়াতাড়িই দারুণ কিছু কাজ নিয়ে হাজির হবেন। রইলো শুভকামনা। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা