নাটকের টিকেট বিক্রি করার জন্যে সংগঠনের তরুণদের সাথে সাথে নিজেও তিনি দাঁড়াতেন। নাটকের বই কেউ কিনতো না, তবুও প্রত্যেক নাটকের সময়েই একগাদা নাটকের বই নিয়ে স্টল সাজিয়ে নিজেই একটা চেয়ার নিয়ে বসে পড়তেন সেখানে। শেষসারিতে বসে বসে থিয়েটারে আসা প্রায় সব নাটক দেখতেন তিনি...

মৃত্যুবিষয়ক কিছু বই পড়ছি বেশ কিছুদিন ধরে। বইগুলোর মধ্যে একটা বই বেশ ইন্টারেস্টিং। যেখানে নিজ নিজ ক্ষেত্রে কৃতী কিছু মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এক সাংবাদিক এবং সেই সাক্ষাৎকারগুলো একত্রে সংকলিত করে বই বের করেছেন তিনি। সে বইতেই পড়লাম, এক গুণী মানুষকে জিজ্ঞেস করা হলো- মৃত্যু নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

সে হেসে হেসে উত্তর দিচ্ছে- 

কোনো ভাবনা-চিন্তা নাই। তবে আমি মরলেও মানুষ আমাকে মনে রাখবে। কারণ যেসব লেখা লিখেছি, আমাকে ভোলা সম্ভব না। 

চমকপ্রদ উত্তর। এরকম উত্তর দিয়েছিলেন আরো কিছু মানুষ। বইটা লেখাও হয়েছিলো ভালো শব্দের গাঁথুনিতে। শব্দের আঠায় আটকে যাচ্ছিলাম। মানুষের মৃত্যুজনিত ভাবনা বেশ গভীর। সে ভাবনায় তলিয়ে যাচ্ছিলাম। এরকমই এক সময়ে জানতে পারলাম গুণী অভিনেতা ডঃ ইনামুল হকের প্রয়াণের সংবাদ। কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম।

এই বইয়ের যে বিষয়; মৃত্যুচিন্তা, ডঃ ইনামুল হকের মৃত্যুবিষয়ক এরকম কোনো সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে কী না, আমার জানা নেই। তবে এটুকু তো বলাই যায়, এই গুণী মানুষেরও গোটা জীবনের যে কীর্তি, সে কীর্তি তাকে অমরত্ব দিয়ে দিয়েছে এরমধ্যেই। সে হিসেবে, তার গড়পড়তা দেহ বিলীন হলেও তিনি কি প্রকৃতপক্ষে কোনোদিন বিস্মৃত হবেন? 

এই সরল হাসিমুখ দেখা হবেনা আর! 

গুণী এ অভিনেতার জন্ম ফেনী সদরের মটবী এলাকায়, তেতাল্লিশে। এখান থেকেই প্রাথমিক পড়াশোনা শেষে চলে এলেন ঢাকায়। প্রথিতযশা নটরডেম কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করলেন। কলেজে পড়ার সময়েই প্রথমবার অভিনয়ের স্বাদ পেলেন। তাও আবার মঞ্চের বড় আয়োজনে! 'ভাড়াটে চাই' নামক এক নাটক ছিলো সেটি৷ বিস্ফোরণের জন্যে সলতের গোড়ায় একটুখানি অগ্নিসংযোগই তো যথেষ্ট। সেটিই যেন করে দেয় এ নাটক। ইনামুল হক মজে গেলেন নাটকে! এরপর বহুবার উঠলেন নাটকের মঞ্চে। টেলিভিশনে। বহু জায়গায়। শুরুটা এখান থেকেই। 

যাই হোক, অভিনয় করছেন৷ কিন্তু পাশাপাশি পড়াশোনাও চলছে সমানতালে। কলেজের পাট চুকোনোর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। রসায়ন বিভাগ থেকে অনার্স এবং মাস্টার্স কমপ্লিট করেন৷ পাড়ি জমান বিদেশে। ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর দেশে ফিরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন তিনি। এখানেই কাটিয়ে দেন দীর্ঘ ৪৩ বছর! এখানে থাকাকালীন ১৫ বছর রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান এবং দুই বছর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ডিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। অদ্ভুত হয়ে খেয়াল করি, 'রসায়ন' এর মতন খটোমটো এক বিষয়ের সাথে সম্পর্ক যে মানুষের, সে মানুষই আবার জীবনের রসায়ন খুঁজে পাচ্ছেন অভিনয়ে। কখনো থিয়েটারে। কখনো টেলিভিশনের পর্দায়। অদ্ভুত বৈপরীত্য যেন! 

আটষট্টি সালে প্রতিষ্ঠিত থিয়েটার সংগঠন 'নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়’ এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাসদস্য তিনি। এই সংগঠন এর ভাইস প্রেসিডেন্টও ছিলেন তিনি অনেকদিন।  বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ, দেওয়ান গাজীর কিসসা, নূরল দীনের সারা জীবন... নাটকগুলোতে তিনি অভিনয় করেন এই সংগঠনের সদস্য হিসেবেই। পরবর্তীতে 'নাগরিক নাট্যাঙ্গন’ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। আমৃত্যু দলটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন গুণী এই অভিনেতা। তিনি মনে করতেন, থিয়েটার শুধু বিনোদনের মঞ্চ না। থিয়েটার আলোর মঞ্চ। সে আলোয় বিকশিত হওয়ার মঞ্চ। ঠিক যে কারণেই হয়তো, তিনি 'থিয়েটার' এর সাথে লেগে রইলেন আমৃত্যু। অসাধারণ সব থিয়েটার নাটকের কারিগর হিসেবে রইলেন নেপথ্যে। 

আহমদ ছফা বলতেন, প্রত্যেক শিল্পীরই দায় রয়েছে নিজের সময়কে শিল্পের মধ্যে দিয়ে তুলে ধরার। সে দায় মেটাবার চেষ্টা খুব স্পষ্টভাবেই লক্ষ্য করি ইনামুল হকের ক্ষেত্রে। উনসত্তরে দেশ যখন উত্তাল, গণঅভ্যুত্থানে ফুঁসে উঠছে সময়, তখন তিনি নাটককে বানালেন আন্দোলনের মাধ্যম। আন্দোলনমুখী নাটকে অংশ নিলেন। জনতার সংগ্রামের সাথে ঐক্যবদ্ধ হলেন। একই বিষয় লক্ষ্য করি, সত্তর সালেও। পিশাচ আইয়ুব খানের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি আবারও আন্দোলনের মূলস্রোতে। হাতিয়ার? নাটক। এই ধারা বজায় রইলো একাত্তরেও। ট্রাকে ঘুরে ঘুরে সেসময় পথনাটক করতেন গুণী এ নির্মাতা।   

তিনি শুধু যে শিক্ষক ও অভিনেতা ছিলেন, তা না মোটেও। তিনি বই লিখেছেন। থিয়েটারের সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন। একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার'সহ নানা অর্জন তার নামের পাশে। তবুও কী নিরহংকারী জীবন কাটালেন তিনি, তা ভাবলে বিস্ময় হয়! পাশাপাশি থিয়েটার নিয়ে ছিলো তার অদ্ভুত রকমের পাগলামি। নাটকের টিকেট বিক্রি করার জন্যে সংগঠনের তরুণদের সাথে সাথে নিজেও তিনি দাঁড়াতেন। নাটকের বই কেউ কিনতো না, তবুও প্রত্যেক নাটকের সময়েই একগাদা নাটকের বই নিয়ে স্টল সাজিয়ে নিজেই একটা চেয়ার নিয়ে বসে পড়তেন সেখানে। শেষসারিতে বসে বসে থিয়েটারে আসা প্রায় সব নাটক দেখতেন তিনি। সেসব নাটক নিয়ে তার আলোচনা-সমালোচনা জানাতেন। থিয়েটার, নাটক নিয়ে এমনটাই ছিলো তার আবেগ, অনুরাগ, পাগলামো। 

প্রচুর পড়াশোনা করতেন তিনি! 

এই গুণী অভিনেতার পঞ্চাশতম জন্মদিনে শিল্পকলা একাডেমিতে বেশ জাঁকজকমের উৎসব করা হয়েছিলো। প্রচন্ড খুশি হয়েছিলেন তিনি, এ আয়োজন দেখে। সেই একই শিল্পকলা একাডেমিতে গত রাতে নেয়া হয়েছিলো তার লাশ। আজ হয়তো একরাশ মাটির নীচে শেষগন্তব্যে চুপটি করে অন্তর্লীন হয়ে যাবেন তিনি। জীবন এরকমই। অদ্ভুত। অতৃপ্তির। অসমাপ্তির। তবু এই নশ্বর জীবন উপেক্ষা করে প্রকট হয়ে উঠবেন এক থিয়েটার পাগল মানুষ, যিনি থিয়েটারের ঐ বড় মঞ্চ, কড়া আলো আর চড়া মেকাপের প্রেমে পড়েছিলেন। যে প্রেম বহাল ছিলো আজীবন। যে প্রেম মনে করায় জহির রায়হানের সে উদ্ধৃতিকেই-

থিয়েটার বাদ দিয়ে জীবন হয় না। জীবন বাদ দিয়ে থিয়েটার হয় না।

বিনম্র শ্রদ্ধা রইলো। ওপারে ভালো থাকবেন, এটাই কায়মনোবাক্যে প্রার্থণা। 

​​​​​


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা