মাত্র এক বছরের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় চারটি নির্মাণের সম্মুখযোদ্ধা ফাহাদ ফাসিল এখন নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন সহ মহীরুহ সব প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে আরাধ্য ব্যক্তি। তার সিনেমা নিজেদের প্ল্যাটফর্মে রিলিজ করার জন্যে লড়াইয়ে সামিল হয় একেকটি স্ট্রিমিং সাইট। ঠিক এভাবেই সমসাময়িক অভিনেতাদের আড়ালে রেখে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ক্রমশই তিনি রূপান্তরিত হচ্ছেন 'ইন্টারন্যাশনাল সুপারস্টার' এ...

মালায়ালাম সুপারস্টার ফাহাদ ফাসিলের সাম্প্রতিক 'মালিক' সিনেমা দেখে অনেক সিনেমাপ্রেমীরই এ উপলব্ধি হতে বাধ্য, দুর্দান্ত এই নির্মাণ বড়পর্দায় দেখলে যে তৃপ্তি পাওয়া যেতো, তার অনেকটুকুই অনুপস্থিত ওটিটির এই সংকীর্ণ মঞ্চে। কিন্তু বাস্তবতা এটাই, মহামারীর শাপে দেশ-বিদেশ কোনোখানের পরিস্থিতিই স্বাভাবিক নেই। কবে নাগাদ খুলবে প্রেক্ষাগৃহ, কবে থেকে মানুষ উপস্থিত হতে পারবে রূপোলী পর্দার সমুখের আলো-আঁধারি আসনে, তা নিয়ে নিশ্চিত নন কেউই। আবার এই অনিশ্চয়তা নিয়ে সাতপাঁচ ভেবে পিছিয়ে এসে স্থবির থাকাও বোধহয় সমীচীন নয়।

এরকম জটিল পরিস্থিতিতে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর মারফতে যতটুকু সুবিধা আদায় করে নেয়া সম্ভব, তার পুরোটা নেয়াই তাই সবচেয়ে সুবিবেচক সিদ্ধান্ত। যে সিদ্ধান্তের প্রতিফলন দেখি ফাহাদ ফাসিলের সাম্প্রতিক সিনেমাগুলোয়। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত তাঁর চারটি সিনেমা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে। এবং চারটি সিনেমাই জনপ্রিয় হয়েছে, দোর্দণ্ডপ্রতাপে রাজত্ব করেছে অনলাইন দরবারে।

এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয়, ফাহাদ ফাসিলের সমসাময়িক মলিউডের অভিনেতা, যেমন- দুলকার সালমান কিংবা নিভিন পৌলির গত এক বছরে কোনো নতুন সিনেমা মুক্তি পায় নি। পৃথ্বীরাজ এর একটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, যা আবার ব্যবসাসফল হয়নি। কিংবদন্তি ম্যামোথি এবং মোহনলালের সিনেমা মুক্তি পেয়েছে মাত্র একটি করে। সুতরাং সবকিছু বিবেচনায় এটুকু বলা মোটেও বাতুলতা না, ওটিটির এহেন স্বর্ণ-সময়ে মলিউডের এই সুপারস্টার সহশিল্পী সবার থেকে এগিয়ে আছেন যোজন যোজন দূরত্বে। 

মহেশ নারায়ণের পরিচালিত 'সিইউ সুন' মুক্তি পায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে, স্ট্রিমিং সাইট 'অ্যামাজন প্রাইম' এ। ফাহাদ ফাসিলের অভিনীত ভারতের প্রথম 'কম্পিউটার স্ক্রিন' ফিল্ম, প্রথম থেকেই দর্শকের ইতিবাচক সাড়া পায়। সেখান থেকে শুরু। পরবর্তীতে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া 'ইরুল' এ ফাহাদ ফাসিলের সেই পাগলাটে রহস্যময় চরিত্র, সে চরিত্রকে যোগ্য সংগত দেয়া দারুণ সিনেম্যাটোগ্রাফী আর টানটান থ্রিলারের জম্পেশ পটবয়লার... বেশ জনপ্রিয় হয় এ কাজটিও। পরের নির্মাণ- জোজি। শেক্সপিয়ারের 'ম্যাকবেথ'কে অনুপ্রেরণা মেনে নির্মিত 'জোজি' সিনেমার অনেকটুকু অংশই একা টেনে নিয়ে যান ফাহাদ ফাসিল, সিনেমাটির সাথে যুক্ত করেন 'সুপারহিট' তকমা। ওটিটিতে সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত 'মালিক' এর কথা আলাদা করে না বললেও চলে৷ যে সিনেমার প্রশংসাবাক্য ফুরোয়নি এখনও। সাউথ ইন্ডিয়ান যে দুটি সিনেমা নিয়ে এখনও চলছে মাতামাতি, তার একটি- 'মালিক' এবং দ্বিতীয়টি- 'সারপাট্টা পারামাম্বারাই।' 

'মালিক' এ করেছেন দুর্দান্ত অভিনয়! 

এক বছরের মাথায় দারুণ জনপ্রিয় চারটি নির্মাণের সম্মুখযোদ্ধা ফাহাদ ফাসিল এখন নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন সহ মহীরুহ সব স্ট্রিমিং সাইটের সবচেয়ে আরাধ্য ব্যক্তি। ফাহাদ ফাসিলের সিনেমাগুলো ওটিটি'তে রিলিজ করার জন্যে চাহিদা আর দাবী নিয়মিতই বাড়ছে। যদিও কিছু মানুষের দাবী, ওটিটি'তে ফাহাদ ফাসিলের যেসব সিনেমা জনপ্রিয় হচ্ছে, সেগুলো বড়পর্দায় মুক্তি পেলে, অত জনপ্রিয় হতো না। কারণ হিসেবে তারা দাঁড় করছেন দর্শকের মনস্তত্ব কে। সাধারণত দর্শক সিনেমাহলে যায় 'লার্জার দ্যান লাইফ' কিছু দেখার জন্যে। ফিলোসফিক্যাল, মেটাফোরিক্যাল, সাইকোলজিক্যাল, স্লোবার্ণ যেসব নির্মাণ স্ট্রিমিংসাইটগুলোতে স্তুতিবাক্য কুড়োচ্ছে, তারা জায়ান্ট স্ক্রিনের সামনে থতমত খেতো কী না, তা নিয়েও সন্দিহান এসব মানুষেরা। কিন্তু সত্যিটা এই, দর্শক আজকাল পাল্টেছে আকছার। তাদের রুচিবোধ, থট প্রসেস এবং হজমেও এসেছে পরিবর্তন। ভালো নির্মাণ হলে আজকাল সেগুলো যে মুখ থুবড়ে পড়ে না, বরং তুলকালাম ঘটায়, তার জন্যে বেশিদূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই, মালায়ালাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। 

আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয়, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সুবাদেই ফাহাদ ফাসিলের জনপ্রিয়তার গণ্ডি ক্রমশই চেনা-পরিচিত গণ্ডি ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সারা পৃথিবীতে। আগে যেমন অন্য দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ নানা কাঠখড় পুড়িয়ে, নিদারুণ কায়ক্লেশে, ন্যায়-অন্যায় বহু উপায়ের বদৌলতে দেখতো মালায়ালাম নির্মাণ, সে সংকট ফুরিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল স্ট্রিমিং সাইটের আশীর্বাদে সহজলভ্য হয়েছে নির্মাণ। যা বাড়িয়ে দিচ্ছে দর্শকসংখ্যার গণ্ডিকেও। ফাহাদ ফাসিলও তাই ক্রমশই 'মালায়ালাম সুপারস্টার' থেকে রূপান্তরিত হচ্ছেন 'ইন্টারন্যাশনাল সুপারস্টার' এ। জনপ্রিয়তা দুর্বার বেগেই বাড়ছে তাঁর। 

ক্রমশই তিনি রূপান্তরিত হচ্ছেন 'ইন্টারন্যাশনাল সুপারস্টার' এ!

এমন না যে, ফাহাদ ফাসিলের জনপ্রিয়তা আগে কম ছিলো, বা, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম তার জন্যে শাপেবর হয়ে এসেছে। তিনি বরাবরই দুর্দান্ত অভিনেতা,  তা নিয়ে মোটেও সন্দেহ নেই। এই গুণী অভিনেতা অভিনয় করেছেন ব্যাঙ্গালোর ডেজ, কুম্বালাঙ্গি নাইটস, টেরান্স, মহেশিন্তে প্রতীক্কারাম এর মতন ক্লাসিক সব নির্মার্ণে। যেসব নির্মাণ কাঁপিয়েছে প্রেক্ষাগৃহ। যেসব নির্মাণ নিয়ে কথা হয় আজও। যেসব নির্মাণের মুগ্ধতার রেশ আজও প্রাসঙ্গিও। সুতরাং, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সুবাদে তিনি কতটুকু জনপ্রিয় হলেন, সে আলাপ গৌণ। বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হওয়ার তার মানসিকতা। 

'টেরান্স' এ করেছিলেন অতিমানবীয় অভিনয়! 

যেহেতু প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি বিনোদনের আরেকটি উৎস তৈরী হয়েছে, সেটাকে ফাহাদ ফাসিল যেভাবে গ্রহণ করেছেন, তার বরাতেই নির্ধারিত হয়েছে তাঁর পরবর্তী সাফল্য-সূচি। ঠিক এখান থেকেই শেখার আছে বাকিদের। এবং পরিবর্তনের যে হাওয়া-বদল শুরু হয়েছে ইদানীং, এবং হাওয়া-বদল এর সে প্রক্রিয়ায় ফাহাদ ফাসিলের যে ভূমিকা, তাতে যে তিনি ইন্ডাস্ট্রির বাকিদের জন্যে অনুকরণীয় আদর্শের এক অবতারেই পরিণত হয়েছেন, তা বোধহয় আলাদা করে আর না বললেও চলে। তাঁর এই জয়রথ চলুক। তাঁর এই প্রচেষ্টা দেখে বাকিরাও শিখুক। এটাই প্রত্যাশা। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা