হিউমার, টেরোরিজম, সিক্রেট এজেন্ট, ফ্যামিলি লাইফ, রিলেশনশিপ- সবকিছু মিলিয়ে দ্য ফ্যামিলি ম্যান কমপ্লিট একটা প্যাকেজ। সবচেয়ে বড় কথা রাজ এন্ড ডিকে চুপিসারে ইন্ডিয়ার সব সোশিও-পলিটিক্যাল ইস্যু টাচ করে করে যাচ্ছেন। কাশ্মীর থেকে তামিলনাড়ু হয়ে সামনে হয়তো অরুণাচল!

ইন্ডিয়া থেকে আসা বেস্ট সিরিজের তকমা দিয়ে দিলাম আজ থেকে ফ্যামিলি ম্যানকে। যেটা এতদিন ব্যক্তিগতভাবে আমার পক্ষ থেকে পাতাল লোককে দেয়া ছিল। পাতাল লোককে হাইলি রেট করি আমি ক্যারেক্টার ডেভলপমেন্ট আর ইম্পরট্যান্ট ইস্যু ছোঁয়ার কারণে। তবে এক সিজনে যেরকমভাবে কম্প্যাক্ট একটা গল্প আপনি বলতে পারবেন, সে একই গল্প, একই ক্যারেক্টার দ্বিতীয় সিজনে কন্টিনিউ করতে গেলে বেশ হ্যাপা হবে রাইটিং পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে। 

ফ্যামিলি ম্যান সিজন টু ফ্যামিলি ম্যান সিজন ওয়ানের মতো ভালো না। 'ভালো না' বলতে নেগেটিভ কিছু বুঝাতে চাচ্ছি না। কারণ, ফ্যামিলি ম্যান সিজন ওয়ানে অনেক কিছুই আনকোরা ছিল। হসপিটালের সেই ওয়ান টেক এম্বুশ, ফ্যামিলির সাথে নিজের সিক্রেন্ট এজেন্ট লাইফের পারফেক্ট ব্যালেন্স এসবকিছুই নতুন লেগেছিল। দ্বিতীয় সিজনে এসে স্বাভাবিকভাবেই সে জায়গায় নতুন কিছু লাগবে। চরিত্র তো বদলানো যাবে না, বদলানো যাবে না গল্পও। তাহলে কীভাবে শ্রীকান্ত তিওয়ারিকে নতুন বিপদে ফেলা যায়?

রাজ এন্ড ডিকে, আমার দেখা অন্যতম স্মার্ট দুজন ডিরেক্টর। তারা সবসময় নতুনত্ব আনতে চান তাদের কাজে। আমরা ইন্ডিয়া থেকে প্রচুর এমন ফিল্ম-সিরিজ দেখেছি যেখানে কাশ্মীর ইস্যু, হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব, জাতীয়তাবাদ উঠে এসেছে। কিন্তু ফ্যামিলি ম্যান সিজন ওয়ানে এসে সে কাশ্মীর ইস্যুকে রাজ এন্ড ডিকে নতুন চোখে দেখেছেন। একদিকে ঠিকই যেমন পাকিস্তানি টেরোরিস্ট, তাকে সহায়তা করা ভারতীয় মুসলিম গোষ্ঠী ছিল বরাবরের মতো তেমনি ভারতে মুসলমানদের দাবিয়ে রাখা, গো মাংস নিয়ে ক্রমাগত হেনস্তা করা ও শেষমেষ নিরীহ মুসলমান ছেলের মৃত্যুও উঠে এসেছিল নির্মম বাস্তবতায়। 

সিজন টুতে এসে রাজ এন্ড ডিকে পুরো গল্প নিয়ে গেলেন শ্রীলঙ্কা ও তামিলনাড়ুতে। কাশ্মীরের গল্পগুলো বারবার পর্দায় উঠে আসলেও তামিল টাইগারদের যুদ্ধ, প্রতিবাদ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এসব আড়ালেই ছিল অনেকটা। শ্রীলঙ্কা ও ভারতের সুসম্পর্কের কারণেই কীনা কিছুটা রাখঢাকই যেন ছিল সবসময় পর্দায় এদের দেখানোর ব্যাপারে। ঠিক যেমন সেভেন সিস্টারসের প্রতিবাদ ও কান্নাও কেউ শোনে না। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

ফ্যামিলি ম্যান-২ এর একটি দৃশ্যে মনোজ ও প্রিয়ামনি

ফ্যামিলি ম্যান সিজন টুতে আমরা দেখা পাই শ্রীলঙ্কান তামিল টাইগারদের, যাদের হাতে আগে ক্ষমতা ছিল কিন্তু ভারতের সহায়তায় তাদের ক্ষমতা অপসারণ করে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে দুপক্ষের চলা যুদ্ধের কারণে মোরাল মোটিভ হারিয়েই গেছে অনেকটা। কেবল কে কাকে শেষ করে দিতে পারে সেটারই যেন অপেক্ষা। সে সন্ত্রাসী সংগঠনকে কোণঠাসা করে ফেলার পর তাদের নেতারা ভারতের তামিলনাড়ুতে ও লন্ডনে আশ্রয় নেয়। লন্ডনে থাকা নেতারা কলকাঠি নাড়িয়ে প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হয়ে ওঠে। একইসাথে তারা ভারতকে একটা সবক দিতে চায় আর ওদিকে শ্রীলঙ্কার সরকারের ভিতও নাড়িয়ে দিতে চায়। 

শ্রীকান্ত এসব থেকে অনেক দূরে কর্পোরেট লাইফ লিড করছে। কিন্তু তার সিক্রেট এজেন্ট সত্তা তো আর ৯-৫ টা অফিস করে অভ্যস্ত না, তাই মাঝেমাঝেই সে তার বন্ধু জেকেকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করে বিভিন্ন ইনভেস্টিগেশন নিয়ে। ঘটনাচক্রে সেও জড়িয়ে পড়ে এই ইনভেস্টিগেশনে কারণ দাবার কোর্টে পুরনো অনেক ঘুঁটিই আবার ফিরে এসেছে। ওদিকে পরিবারের ওপরও ধেয়ে আসছে একের পর এক বিপদ? শ্রীকান্ত কি এবার সফল হবে নাকি ব্যর্থ হবে আগেরবারের মতো?

জাস্ট টেকনিক্যাল পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে ফ্যামিলি ম্যানের কিছু ব্রিলিয়ান্স বলি। দুই সিজন পরপর দেখলে বুঝবেন ভিজুয়ালি কতো কন্ট্রাস্টিং। পাশাপাশি রাখলে আরও বোঝা যাবে। প্রথম সিজনে কাশ্মীরের সে সবুজ, শীতল পাহাড়-প্রকৃতি আর এই সিজনে তামিলনাড়ুর সমুদ্র, মাছ আর হলদেটে আভা। 

প্রথম সিজনে যে শীতল বরফকুঁচি উড়ে বেড়াতো, এই সিজনে এসে তা রূপ নিয়েছে চিটচিটে ঘামে ভেজা গরমে। এই ভিজুয়াল শিফটটা দারুণ লেগেছে। সাথে বদলে গেছে সিরিজের স্কোরও। চেন্নাইয়ের লোকাল গান, বিট সঙ্গ দিয়ে গেছে পুরোটা সময়। Jordindian এর Vanko গানটাও শুনতে পেলাম। প্রতিটা অভিনেতার ঘামে ভেজা শরীর, সিরিজের প্রায় অর্ধেক ভাষা তামিল, সমুদ্র, বোট, মদ আর মাছে ঠিকই দর্শকের মাথায় অবস্থানগত একটা চেঞ্জ চলে আসে না চাইলেও। 

অভিনেতাদের কথা বলতে গেলে মনোজ বাজপেয়ি বরাবরের মতো ইফোর্টলেস। অনুপমা চোপড়ার সাথে একটা ইন্টারভিউতে রাজ এন্ড ডিকে বলেছিলেন যে মনোজকে নিয়ে তাদের চিন্তাই নেই কোন, সে হচ্ছে শচিন টেন্ডুলকার, রান করবেই নিশ্চিতভাবে। তাদের চিন্তা ছিল সামান্থাকে নিয়ে। সাউথের এই গ্ল্যামারাস নায়িকা কি এক তামিলিয়ান রেবেলের রোল করবেন? অবাক করা ব্যাপার সামান্থা নাকি সাথে সাথেই রাজি হয়ে যান। চরিত্রের প্রয়োজনে তিনি নিজেকে ঘরে বন্দী করে রাখতেন, মানসিকভাবে ডার্ক একটা মোডে চলে যেতে চেয়েছিলেন কারণ তার চরিত্র অন্ধকার চোরাগলিতে পথ হাতড়ে বেড়াচ্ছে। 

ক্যারিয়ারের সেরা অভিনয়টা করেছেন সামান্থা

যে সুইট স্পটটা সামান্থা খুঁজে বের করতে চেয়েছিলেন, সিরিজ দেখে আমি কনফিডেন্সের সাথে বলতে পারি সামান্থা সেটায় সফল হয়েছেন। সামান্থা আক্কেনেনির জীবনের সেরা পারফরম্যান্স নির্দ্বিধায় এই রাজি চরিত্র। খুব কম অভিনেত্রীই আমার ধারণা এই রোল করতে চাইতেন ও করলেও জাস্টিস করতে পারতেন। তামিলিয়ানদের ন্যাচারাল স্কিন কালার আনতে গিয়ে সামান্থা তার স্কিন টোন ডার্ক করেছেন। যে কাজটা আজ অব্দি কোন সিনেমা-সিরিজেই আমি সফলভাবে করতে দেখি নি, কিন্তু এখানে একটুও অড লাগে নি। 

তবে স্কিন কালার, ডায়লগ ডেলিভারি এসব কিছুই রাজি চরিত্রে নগণ্য ছিল। রাজি চরিত্রে দরকার ছিল মূলত একটা জোন, যে জোনে সামান্থা পুরোপুরি ছিলেন। আবেগহীন, এক নির্মম রেবেল, যে কীনা তার উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য যা প্রয়োজন তা ই করতে পারে। রাজির ভায়োলেন্স, রাজির ব্যাকস্টোরি, রাজির সারভাইভাল, রাজির চোখে আটকে থাকা হাজারো তামিল টাইগারদের কান্না-সবকিছুই সামান্থা নিখুঁতভাবে উঠিয়ে এনেছেন তার পারফর্মেন্সে।

দ্য ফ্যামিলি ম্যান- এই সিরিজের প্রতিটা চরিত্রের একটা গল্প আছে। একদম সবচেয়ে কম স্ক্রিনটাইম পাওয়া প্রধানমন্ত্রীর সিকিউরিটি হেড সাম্বিতের কথাই ধরি। সব মিলিয়ে ৫ মিনিটও ছিলেন না স্ক্রিনে। জাস্ট ৫ সেকেন্ড, ১০ সেকেন্ডের জন্যই এসেছেন প্রতি পর্বে। এই চরিত্রেও ভিপিন শর্মা অসাধারণ কাজ করেছেন। ওনারও একটা গল্প আছে। উনি চা খেতে পারেন না আরাম করে। তাই যতবারই স্ক্রিনে এসেছেন চা নিয়ে কোন না কোন একটা আলাপ ছিল। ছোট ছোট নুয়ান্স, এসবই চরিত্রগুলোকে মাথায় গেঁথে দেয়। 

বেশকিছু জিনিস ভালো লাগে নি এই সিজনে, মনে হয়েছে এতো ডার্ক টার্ন না নিলেও হতো। কিন্তু সেগুলো আলাপ করতে ইচ্ছে করছে না। হিউমার, টেরোরিজম, সিক্রেট এজেন্ট, ফ্যামিলি লাইফ, রিলেশনশিপ সবকিছু মিলিয়ে দ্য ফ্যামিলি ম্যান কমপ্লিট প্যাকেজ। সবচেয়ে বড় কথা রাজ এন্ড ডিকে চুপিসারে ইন্ডিয়ার সব সোশিও-পলিটিক্যাল ইস্যু টাচ করে করে যাচ্ছেন। কাশ্মীর থেকে তামিলনাড়ু হয়ে সামনে হয়তো অরুণাচল! এরকম সাহস কে কবে দেখিয়েছেন তিরিশ বছর আগে মণি রত্নম ছাড়া? এগিয়ে যাক ফ্যামিলি ম্যান। দরকার আছে এমন কন্টেন্টের।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা