নুহাশ হুমায়ূনের 'ষ'তে যেমন লিঙ্গবৈষম্য, মানসিক স্বাস্থ্য, সৃষ্টিতত্ব'সহ বহুকিছুকে যুক্ত করা হয়েছিলো আবহমান ভূতের গল্পের সাথে, সেরকমটা হয় 'ফরেইনারস অনলি'তেও। যে কারণেই, এই নির্মাণ দেখে মুগ্ধ হতেও হয় বিস্তর! 

চামড়ার বৈষম্যে যুগে যুগে কালে কালে সংঘর্ষ হয়েছে বিস্তর। বহু প্রাচীন এ সংঘর্ষ এখন যে স্তিমিত, তাও বলা যায় না। 'রেসিজম' নামের বিষবাষ্প এখনও যেভাবে মাথা ফুঁড়ে ওঠে মাঝেমধ্যে, বৈশ্বিক এই অসঙ্গতির বদান্যতায় বিশ্ব-মানচিত্র যেভাবে বিষিয়ে ওঠে কখনোসখনো, 'সাদা সাদা কালা কালা' নীতিতে এখনও যেভাবে মুখোমুখি দাঁড়ায় প্রতিপক্ষ শিবির, তাতে বেশ ভালোই বোঝা যায়, সাদা-কালোর এ ধ্রুপদী দ্বৈরথ এখনও বেশ প্রাসঙ্গিক। এবং যে প্রাসঙ্গিক দ্বৈরথেরই খানিকটা ইঙ্গিত আসে স্ট্রিমিং সাইট 'হুলু'তে আসা নুহাশ হুমায়ূনের 'ফরেইনারস অনলি' নামের শর্টফিল্মে। যে কারণে এই ওয়েব কন্টেন্ট চমকেও দেয় বিস্তর‍! 

নুহাশ হুমায়ূনের নির্মাণগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক বোধহয় এটাই- যে জঁরার গল্পই তিনি বলুক না কেন, সে গল্পে তিনি কিছু না কিছু সোশ্যাল ইনজাস্টিসের বার্তা দেবেন। সে বার্তা কন্টেন্ট এবং কন্টেক্সট'ভেদে সাটল হতে পারে, লাউড হতে পারে, মেটাফোরিক্যাল হতে পারে, লিটের‍্যালও হতে পারে। যারা নুহাশের হরর অ্যান্থোলজি 'ষ' দেখেছেন, তারা ইনার মেসেজ দেবার এ বিষয়টা রিলেটও হয়তো করেছেন ভালোভাবে। ভালো লাগলো এটাই, 'ষ'তে যেমন লিঙ্গবৈষম্য, মানসিক স্বাস্থ্য, সৃষ্টিতত্ব'সহ বহুকিছুকে নুহাশ যুক্ত করেছিলেন আবহমান ভূতের গল্পের সাথে, সেরকমটা হয়েছে 'ফরেইনারস অনলি'তেও। যে কারণেই, এই নির্মাণ দেখে মুগ্ধ হতেও হয়েছে বিস্তর! 

অনুসন্ধিৎসু পাঠক যারা আছেন, তারা একটু খোঁজ করলে দেখবেন, ঢাকার কিছু কিছু জায়গা আছে, যেখানে বাড়িওয়ালারা শুধুমাত্র বিদেশীদের ঘর ভাড়া দেন। সোজা বাংলায়- সাদা চামড়ার মানুষেরাই তাদের টার্গেট অডিয়েন্স। কেন তারা শুধু বিদেশীদের ঘরভাড়া দেন, তার স্বপক্ষে তাদের যুক্তিগুলোও নেহায়েত ফেলনা না। তারা মনে করেন- দেশীয়দের তুলনায় বিদেশীরা বেশি সভ্য। তারা ভদ্র। তারা ঠিক সময়ে বাসা ভাড়া দেয়। বাসার কোনো ক্ষতিও তারা করে না। অর্থাৎ, বাড়িওয়ালাদের চোখে যা 'আদর্শ ভাড়াটে'র প্রধানতম বৈশিষ্ট্য, বিদেশিরা ঠিক সেরকমই। কিন্তু, প্রশ্ন উঠতে পারে, শুধুমাত্র বিদেশীদেরকে ঘরভাড়া দেবার কি এটাই একমাত্র কারণ? নাকি, সাদা চামড়া দেখলে আনুগত্যপ্রবণ হবার আদিম আগ্রহও তাদের এ অন্যায় আচরণের প্রভাবক? 

'ফরেইনারস অনলি' শুরু হয় হাসান নামের এক যুবককে দিয়ে, যিনি ট্যানারি ব্যবসায় বহুদিন থেকে যুক্ত। বিস্তর চামড়া ছেনেকুটে, যাপিত সংগ্রামে লিপ্ত  হয়ে সময়ের ফেরে যিনি বেশ কিছু নগদ নারায়ণেরও অধিকারী হয়েছেন। যিনি মনে করেন, তার এখন একটা ভদ্রগোছের আবাসস্থল দরকার। নিজের সোশ্যাল স্ট্যাটাস বাড়ানো দরকার। যেজন্যে তিনি বের হন ঘর ভাড়া করতে। কিন্তু 'নিজভূমে পরবাস' শব্দবন্ধের যোগ্য পরিস্থিতি  মেনে তিনি সর্বত্রই দেখতে পান, চামড়াতুষ্টির জয়গান। কোথাও তিনি বাড়ি ভাড়া পান না। সবখানেই সাদা চামড়ার আহ্বান। নিজের ভূখণ্ডে চামড়ার এহেন বৈপরীত্যে ক্রমশ নানাবিধ জটিলতার জটাজালে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যেতে যেতে একসময়ে তিনি হয়ে ওঠেন বিদ্রোহী, এবং সে বিদ্রোহের ফলাফলে শেষপর্যন্ত তিনি করেন এমন এক কাজ, যা মেটাফোরিক্যালি অনেক কিছুর ইঙ্গিত দিয়ে টানে যবনিকাপাত। শেষ হয় গল্প। 

নানাবিধ অনুষঙ্গকে আনা হয় এ নির্মাণের টাইমফ্রেমে

পনেরো মিনিটের একটা গল্প, কিন্তু সে গল্পে যেভাবে  চামড়াজাত আস্ফালনকে প্রকট করেন নুহাশ হুমায়ূন, মূলত সেটাই প্রাথমিক মুগ্ধতার দিক। বিলবোর্ডে রঙ ফর্সা করার ক্রিমের বিজ্ঞাপন, বাড়িওয়ালার কথার আড়ালে বর্ণবাদমূলক কটুক্তি,  শ্বেতাঙ্গ বিদেশির প্রতি দেশীয় দোকানীর মাত্রাহীন আদিখ্যেতা... টুকরো টুকরো সমীকরণে যেভাবে নুহাশ দাবার বোর্ডে যুযুধান সৈন্যদলের অবস্থান নিয়ে নানাবিধ নিরীক্ষা চালান, এবং সে নিরীক্ষায় সাদা চামড়ার অন্ধ অনুকরণ, গাত্রবর্ণে সামাজিক অবস্থা নির্ধারণ কিংবা অহেতুক বিদেশতোষণ... যেভাবে উঠে আসে সবই, তাতে টনক নড়ে। নড়ে বোধের প্রাচীরও। আপাতদর্শনে 'ফরেইনারস অনলি' হয়তো গা গুলিয়ে দেয়ার মত এক গল্প, কিন্তু সে গল্পের ভীষণ রুটেড প্রেমিস এবং সে প্রেমিসে ইউনিভার্সাল ডগমাটিজম'কে ব্লেন্ড করার বিষয়টিই হয়ে থাকে সবচেয়ে সুন্দর। 

মোস্তফা মনওয়ার করেছেন প্রাসঙ্গিক অভিনয়

সত্যিই তো, শুধুমাত্র বিদেশি পাসপোর্ট এবং সাদা চামড়া থাকার কারণে ভিনদেশী এক মানুষ যদি দেশের জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা কারো থেকে বেশি সুবিধে পায়, অথবা ঈশ্বরপ্রদত্ত গাত্রবর্ণেই যদি ম্লান হয় কোনো একজনের দিনান্ত পরিশ্রম কিংবা সাফল্যের জয়তিলক, তাহলে কি স্বাভাবিক বোধসম্পন্ন কোনো মানুষ বিষয়টি চুপ করে দেখবেন? নাকি, তিনি প্রতিবাদ করবেন? যদি প্রতিবাদ করেন, তাহলে কেমন হবে সে প্রতিবাদ? তিনি কি এই সুবিধাভোগী মানুষদের বিরুদ্ধে ক্রুসেডে নামবেন? নাকি, এদের সমকক্ষ হতে চাইবেন কোনো না কোনোভাবে? এসবের খুব প্রিসাইজ এক ন্যারেশনই 'ফরেইনারস অনলি।' যেখানে দেখার খোরাক যতটুকুই থাকুক না কেন, ভাবনার খোরাক আছে বিস্তর। যেটাই মূলত এই কন্টেন্টকে পৌঁছে দেয় আলাদা মাত্রায়৷ 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা