'ফ্রেন্ডস' এর যাত্রা শুরু হয়েছিলো এক কাকতালীয় ঘটনার মাধ্যমে। এই টিভি শো টানা ছাব্বিশ বছর জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে সব পরিসংখ্যানকে স্রেফ 'সংখ্যা' বানিয়ে। যেরকমটা আগে হয়নি কখনো আর...

২৭ বছর আগের এই দিনে 'ফ্রেণ্ডস' নামে এক  টিভি-সিরিজ আত্মপ্রকাশ করে আমেরিকায়। আত্মপ্রকাশের পরে সেটি আগ্রাসী ভঙ্গিতে গ্রাস করে নেয় আপামর সাধারণ মানুষজনকে। আমেরিকার সীটকমের ইতিহাসকেই পুরোপুরি পাল্টে দেয় এই টিভি সিরিজ। কিন্তু কী ছিলো এই টিভি সিরিজে, যা মানুষকে মুগ্ধ করে রেখেছে শেষ হয়ে যাওয়ার এত বছর পরেও? ঠিক কোন দিক থেকে এরা হয়ে গিয়েছে অসাধারণের চেয়েও বেশি কিছু?

মজার গল্প দিয়েই শুরু করি। এই টিভি সিরিজের নাম 'ফ্রেন্ডস' হওয়ারই কথা ছিলো না! ১৯৯৩ এর দিকে দুইজন মানুষ; ডেভিড ক্রেন এবং মার্টা কাফম্যান সাত পৃষ্ঠার এক স্ক্রিপ্ট লেখেন নতুন সিটকমের জন্যে। নাম দেন- ইনসমনিয়া ক্যাফে। ইনসমনিয়া ক্যাফের সাথে 'ফ্রেন্ডস' এর কনসেপ্টে অনেকটাই মিল থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে ছিলো তীব্র অমিল। এনবিসি যখন স্ক্রিপ্ট টা নিলো, তখন সিটকমের নাম পরিবর্তন হয়ে হলো- ফ্রেন্ডস লাইক আস। শ্যুটিং এর আগ আগ দিয়ে এসে নাম আরেকবার পরিবর্তিত হলো। তখন নাম হলো- সিক্স অফ ওয়ান। শেষমেশ যখন এটা আত্মপ্রকাশিত হবে হবে সময়, তখন এর নাম হয়ে গেলো ফ্রেন্ডস!

'ফ্রেন্ডস' এর দুই স্রষ্টা ডেভিড ক্রেন ও মার্টা কাফম্যানের কথা তো আগেই বললাম। তারা দুইজন মিলে 'ফ্যামিলি অ্যালবাম' নামে একটা সিটকম বানিয়েছিলেন একটা টিভি চ্যানেলের জন্যে। কিন্তু সেটা প্রত্যাখান করে দেয় টিভি চ্যানেলটি। ধাক্কা খেলেন ক্রেন ও কাফম্যান। তারা এবার শুরু করলেন অন্য একটি সিরিজ বানানোর কাজ। ছয়জন তরুণ-তরুণীর ম্যানহাটনের জীবনযাপন, সেই জীবনযাপনের হাস্যরসাত্মক দিকগুলো নিয়ে একটা স্ক্রিপ্ট লিখে ফেললেন তারা। মজার ব্যাপার হলো, ক্রেন ও মার্টার তরুণ বয়সের অনেকটাই উঠে এসেছিলো এই টিভি সিরিজের স্ক্রিপ্টে। স্ক্রিপ্ট এমনভাবেই করা হয়েছিলো, যাতে এই টিভি সিরিজ দেখে মানুষ একটু হলেও শান্তি পায়। 'ফিল গুড' শো বলতে আমরা যা বুঝি, সেরকম যেন হয় বিষয়টা।

এরকমই একটা টিভি সিরিজের প্রাথমিক স্ক্রিপ্ট বানিয়ে ক্রেন ও মার্টার সেটি পাঠিয়ে দিলেন এনবিসি টিভি চ্যানেলের কাছে। স্ক্রিপ্ট টা বেশ সাদরেই গ্রহণ করলো এনবিসি। এর পেছনে একটা কারণও আছে। ওয়ারেন লিটলফিল্ড ছিলেন তখন এনবিসি এন্টারটেইনমেন্ট এর প্রেসিডেন্ট। তিনি চাচ্ছিলেন- ইয়াংদের ভালোভাবে কানেক্ট করে, এরকম কোনো শো আসুক এনবিসি'তে। ঠিক সে সময়টাতেই ক্রেন ও মার্টার পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ছয়জন তরুণ-তরুণীর জীবনের গল্প। কাকতালীয় ব্যাপার হলেও ব্যাটেবলে মিলে গেলো পুরোটা। শুরু হলো 'ফ্রেন্ডস' বানানোর কাজ।

এনবিসি যখন প্রকাশ করলো, তারা এরকম একটি টিভি সিরিজ বানানো শুরু করেছে, মানুষজন হুমড়ি খেয়ে আসতে লাগলো এই টিভি সিরিজে অভিনয়ের জন্যে। প্রথম সীজনের পঁচাত্তরটা চরিত্রের জন্যে আবেদন করলো ১০০০ জনেরও বেশি মানুষ! এদের মধ্য থেকে আসল চরিত্র খুঁজে বের করতে রীতিমতো কালঘাম ছুটে গিয়েছিলো পরিচালকদের। দুয়েকটা চরিত্রের জন্যে স্ক্রিপ্ট পরিবর্তনও করতে হয়েছিলো অনেকটা। সবমিলিয়ে বেশ অনেকটা সময় লাগিয়ে চরিত্র বাছাইয়ের কাজ করলেন পুরো টীম।

এরপর শুরু হলো পুরো সীজনের লেখালেখির কাজ। বিভিন্ন জায়গা থেকে তরুণ লেখকদের ডাকা হলো স্ক্রিপ্টের খসড়া অনুযায়ী 'ফান এলিমেন্ট, সাসপেন্স, ডায়ালগ' লেখার জন্যে। বড়সড় কর্মযজ্ঞ শুরু হলো স্ক্রিপ্ট রাইটিং নিয়ে। পুরো সীজনের স্ক্রিপ্টের কাজ শেষ হলো একসময়ে এসে।  প্রত্যেক এপিসোডের শ্যুটিং শুরুর আগে মেইন ক্রিয়েটর অর্থাৎ ক্রেন ও মার্টার স্ক্রিপ্টের একটা রিভিউ করে দিতেন। এভাবেই কাজ শুরু হলো বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিটকম টিভি সিরিজের। ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়ার্নার ব্রোস স্টুডিওতে বিকেল চারটার সময়ে ডিরেক্টর'স কাট বোর্ডে ঠক করে শব্দ হলো। শুরু হলো এক মাস্টারপিস নির্মানের কাজ।  বাকিটা হয়ে গেলো ইতিহাসেরই অংশ!

এই ছয়টি চরিত্রকে ভুলতে পারবে কেউ? আদৌ কী সম্ভব? 

টানা দশ সীজন ধরে চলা এ টিভি সিরিজ যারাই দেখেছেন, তারাই হয়ে গিয়েছেন পাঁড়ভক্ত। র‍্যাচেল, মনিকা, ফিবি, জো, চ্যান্ডলার, রস পুরো এক দশক ধরে হাসিয়েছেন সবাইকে। কিন্তু সবগুলো সীজন শেষে যখন শেষ সীজনের শেষ পর্ব এসেছে, আমরা বুঝতে পারি চরিত্রদের হাসির সাথে মাখা রয়েছে  নিখাদ বিষাদ। ফ্রেন্ডস শেষ করেছেন অথচ ঐ টিপিক্যাল সেট, একইরকমের ইন্ট্রো মিউজিক এবং প্রত্যেকটা ক্যারেক্টারের পাগলামি ভেবে একটুও দীর্ঘশ্বাস ফেলেন নি, এমন মানুষ একজনও আছেন বলে আমি অন্তত বিশ্বাস করি না। পরিচালকেরা চেয়েছিলেন এমন একটি টিভি সিরিজ বানাবেন, যেটি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডিতে আটকে থাকবে না। বছরের পর বছর চলে যাবে, গল্পের আবেদন ও চরিত্রদের জন্যে ভালোবাসা রয়ে যাবে একইরকম বিশুদ্ধ ও খাঁটি। 'ফ্রেন্ডস' এর ক্ষেত্রে সেটি যেন সার্থকও হয়েছে পুরোপুরি।

দশ সীজনের প্রত্যেক এপিসোডই ছিলো হিউমারে পুরোপুরি ঠাসা!

'ফ্রেন্ডস'কে শুধুমাত্র টিভি শো বললে সেটি আসলে 'ফ্রেন্ডস' এর মাহাত্ম্য বা ব্যপ্তিকে পুরোপুরি মোটেও প্রকাশ করে না। 'র‍্যাচেল গ্রিন' চরিত্রে অভিনয় করা জেনিফার অ্যানিস্টন এর হেয়ার স্টাইলের নামই হয়ে গিয়েছিলো 'দ্য র‍্যাচেল'। এই হেয়ার স্টাইল কপি করেছে সারা পৃথিবীর অনেক মানুষ। জো কথা কথায় বলতো 'হাউ ইউ ডুইন', সেটা ট্রেডমার্ক হয়েছে, বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে কথাবার্তার এক অন্যতম অনুষঙ্গই হয়ে গিয়েছে। অনেক পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে এই সিটকম মানুষকে ইংরেজি শিখতেও সাহায্য করেছে অনেকটাই। সারা পৃথিবীতে অজস্র ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট, দোকানপাট হয়েছে এই টিভি সিরিজের নামে।

লেখাটা যখন লিখতে বসেছিলাম, তখন বেশ কিছু প্ল্যান ছিলো। সেই প্ল্যানের এক অংশ ছিলো এই টিভি সিরিজের অসাধারণত্ব বোঝাতে 'ফ্রেন্ডস' কতগুলো এ্যাওয়ার্ড জিতেছে, তা লিখবো। কিন্তু, পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরেও আসতে হলো। কারণ কিছু কিছু টিভি সিরিজ আছে, যেগুলোর মাহাত্ম্য বোঝাতে সেটি কয়টা পুরস্কার জিতেছে, তা মোটেও বলতে হয় না। সময় তাদের সপক্ষে স্বাক্ষ্য দেয়। যারা এসব অসাধারণ নির্মান দেখে বছরের পর বছর ধরে হৃদয়ে সেগুলোকে যত্ন করে আগলে রেখেছে, তারা এই সৃষ্টিগুলোর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। সে হিসেবে 'ফ্রেন্ডস' অনেক দিন থেকেই মানুষের অন্দরমহলের স্থায়ী বাসিন্দা।

যারা হয়তো অনেক আগেই এই টিভি সিরিজ দেখেছেন, তারা এখনো ফোবির গোলাপি সাইকেল, টিপিক্যাল কমলা সোফা, মনিকা আর র‍্যাচেলের এ্যাপার্টমেন্টের বেগুনি দরজা দেখে নষ্টালজিক হন। এখানেই 'ফ্রেন্ডস' এর চমৎকারিত্ব। ম্যানহাটনের ছয়জন তরুণ-তরুণীর সাতাশ বছর আগের জীবনযাপন এখনো আমাদের হিপনোটাইজ করে রাখে পি সি সরকারের জাদুর মতন, যে জাদু ক্রমশ বাড়েই। কখনো কমেনা।

লেখাটা শেষ করা যাক একটা লাইন দিয়ে, যে লাইনটিকে অতিশয়োক্তি মনে হতে পারে আপনার; কিন্তু 'ফ্রেন্ডস' এর এতকাল ধরে চলে আসা অসাধারণ যাত্রাপথকে ফুটিয়ে তুলতে এর চেয়ে সংক্ষেপ আর কিছু নেই-

Don’t watch friends all ten season because than there is nothing left in life to watch.

এক লাইনে এটাই 'ফ্রেন্ডস'।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা