আশা করি, 'আলিগড়', 'শহিদ' অথবা 'স্ক্যাম ১৯৯২' এর মতন সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত 'ফারাজ'এও দুর্দান্ত শৈলী দেখাবেন হানশাল মেহতা। ক্যামেরার কলমে গল্প লিখতে তিনি দক্ষ একজন মানুষ। নিরপেক্ষ থেকে এবারেও সে কাজ তিনি বজায় রাখবেন, প্রত্যাশা এটাই...

সত্য ঘটনা অবলম্বনে বানানো সিনেমা-সিরিজগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তির দিক, এমন সব ঘটনা-মানুষ-বিষয় কে মানুষের চোখের সামনে তুলে আনা যায়, যা হয়তো কোনোদিনই সেভাবে সবার সামনে আসতো না। এই যেমন গত বছরে দেখেছিলাম- এ বিউটিফুল ডে ইন দ্য নেইবারহুড। 'ফ্রেড রজারস' নামের এক বাস্তব মানুষকে পর্দায় দুর্দান্তভাবে তুলে এনেছিলেন টম হ্যাঙ্কস। পরে ফ্রেড রজারস নিয়ে আরো খানিকটা জানার চেষ্টা করলাম। দেখলাম, তার জীবন-গল্প সিনেমার চেয়েও বহুগুণে সুন্দর। সিনেমায় যতটুকু দেখলাম, তা হিমশৈলের ডগা। তাঁর জীবনের অনেকটুকুই সেখানে অব্যক্ত। কিন্তু তবুও এ সিনেমা না দেখলে আমি হয়তো 'ফ্রেড রজারস' নামের এ মানুষটিকে নিয়ে এত আগ্রহীও হতাম না। এত অসাধারণ এক মানুষ রয়ে যেতো অগোচরে। সিনেমার সৌকর্যের দিক এখানেই। 

গত বছর ভারতের 'সনি লিভ' স্ট্রিমিং সাইটে রিলিজ পেলো 'স্ক্যাম ১৯৯২ঃ দ্য হারশাদ মেহতা স্টোরি।' তর্ক-বিতর্ক সাপেক্ষে বলা যেতে পারে, ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ওয়েব সিরিজ এটি। সেখানে জানলাম 'ব্রোকার' থেকে 'দ্য গ্রেট বুল' হয়ে ওঠা হারশাদ মেহতার রূপান্তরের আখ্যান। এই ওয়েব সিরিজ কোনোদিনও না এলে আমি এই মানুষটিকে নিয়ে কোনোদিনও আগ্রহী হতাম কী না সন্দেহ। পরবর্তীতে হারশাদ শান্তিলাল মেহতা'কে নিয়ে খানিকটা পড়াশোনা করলাম। যদিও তিনি অপরাধী, কিন্তু তার অপরাধ; শিল্পগুণে এতটাই সমৃদ্ধ, মুগ্ধ হলাম। আরেকটু মুগ্ধ হলাম, এই ওয়েব সিরিজের নির্মাতা হানশাল মেহতার উপরে। ওয়েব সিরিজে 'হারশাদ মেহতা' চরিত্রটির পোর্ট্রেয়াল তিনি এতটাই অসাধারণ এবং নিরপেক্ষভাবে করেছেন, বাস্তবের হারশাদ মেহতা নিয়ে পড়াশোনা করেও আমি খুব একটা পার্থক্য করতে পারিনি। 

স্ক্যাম ১৯৯২ঃ দ্য হারশাদ মেহতা স্টোরি! 

নির্মাতা হানশাল মেহতা এ কাজটি বরাবরই করেন। সত্য ঘটনা নিয়ে সিনেমা বানাতে তিনি আগে থেকেই পটু। যে সিনেমা দিয়ে তিনি 'পরিচালক' হিসেবে প্রথমবার লাইমলাইটে এসেছিলেন, সেই 'শহিদ' সিনেমার প্রশংসা মানুষ আজও করে। আইনজীবী শহিদ আজমি, যিনি ছিলেন একজন  হিউম্যান রাইট অ্যাক্টিভিস্টও, সে মানুষটির সংগ্রাম, আততায়ীর হাতে মৃত্যু, ভারতীয় বিচারব্যবস্থার তামাশা...সবকিছুকে এত দুর্দান্তভাবে হানশাল মেহতা নিয়ে এলেন পর্দায়, মানুষ হতবাক হলো, ক্ষুব্ধ হলো, বিষাদগ্রস্ত হলো। রাজকুমার রাও দুর্দান্ত অভিনয় করলেন, হানশাল মেহতা 'শ্রেষ্ঠ পরিচালক' হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রইলো, শহিদ আজমী নামের প্রতিবাদী সেই মানুষটির আবার ফিরে আসা। মানুষের স্মৃতিতে, মানুষের হৃদয়ে। 

তবে 'শহিদ' সিনেমার চেয়েও আমি বেশি মুগ্ধ হয়েছিলাম হানশাল মেহতার আরেকটি সিনেমা 'আলিগড়' এ।  আমরা অনেকেই মনোজ বাজপেয়ী'র 'ফ্যামিলি ম্যান' অথবা 'গ্যাংস অব ওয়াসিপুর' এর অভিনয় নিয়ে মুগ্ধ হই, তাদের মধ্যে অনেকেই 'আলিগড়' সিনেমা দেখেছেন কি না, জানি না। একজন শিক্ষক, যিনি কিনা আবার কবিও, তাকে যখন সমকামিতার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়া হয়, সে সময়ে সে শিক্ষকের চোখে-মুখে-হৃদয়ে যে যন্ত্রণা-ক্ষোভ-অভিমানের জন্ম হয়, তার পুরোটুকু মনোজ বাজপেয়ী যেভাবে তুলে এনেছিলেন 'আলিগড়' সিনেমার ক্ষুদ্র চৌহদ্দি তে, মুগ্ধ হয়েছি। 'রামচন্দ্র সিরাস' নামক আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের জীবন-গল্প অবলম্বনে বানানো এ সিনেমায় দুর্দান্ত অভিনয় করে মনোজ 'ফিল্মফেয়ার ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড'ও পেয়েছিলেন। তবে আমি মুগ্ধ হয়েছি, হানশাল মেহতায়। ২০১৬ সালের ভারতে সমকামী এক শিক্ষকের বেদনার গল্প পর্দায় তুলে ধরার যে সাহস তিনি দেখিয়েছেন এবং মনোজ বাজপেয়ীকে দিয়ে অমন সুন্দর অভিনয় তিনি করিয়েছেন, তা যদি কেউ ভুলে যায়, তা অন্যায় হবে, বড্ড অন্যায় হবে। 

'আলিগড়' এ মুগ্ধ করেছেন মনোজ বাজপেয়ী! 

সত্যঘটনা অবলম্বনে বানানো সিনেমাগুলোয় হানশাল মেহতা যেন বরাবরই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সঞ্জীব কাপুরের কুকিং শো 'খানা খাজানা'র ডিরেক্টর হিসেবে কাজ শুরু করে তিনি টিভি শো, সিনেমা কম নির্মাণ করেন নি৷ তবুও তিনি জনপ্রিয় সেসব নির্মাণের জন্যেই, যেসব নির্মাণের গল্পের জন্যে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন সত্যিকারের মানু্ষের , সত্যিকারের ঘটনার। মনে পড়ছে 'ওমের্তা' সিনেমার কথাও। যেখানে আহমেদ ওমর সাঈদ শেখ নামক পাকিস্তানী বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ জঙ্গীকে উপজীব্য করে হানশাল মেহতা পর্দায় এনেছিলেন রক্তপাত, হিংস্রতা, বর্বরতার আখ্যান। মুগ্ধ হয়েছিলাম এ নির্মানেও।বর্বরতার সীমা-পরিসীমা যেন ভুলে গিয়েছিলাম 'ওমের্তা' দেখে। 

হানশাল মেহতা, মনোজ বাজপেয়ী! 

হানশাল মেহতা সামনে আসবেন 'ফারাজ' নিয়ে, এ তথ্য অনেকেই জানেন। গুলশানের হলি আর্টিজানে ২০১৬ সালে যে নারকীয় জঙ্গি হামলা হলো, সেটাকে উপজীব্য করেই সিনেমা। যদিও একই কনসেপ্টে আরো আগেই সিনেমা বানিয়েও সেটা দেখানোর সুযোগ পান নি, এদেশের গুণী নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। সে আক্ষেপের কথা নাহয় না বলি। তবে স্বস্তি এটাই, হানশাল মেহতা নিজেই হলি আর্টিজানের এই ঘটনা নিয়ে সিনেমা বানাচ্ছেন৷ বলিউডে সত্য ঘটনা অবলম্বনে যারা সিনেমা-সিরিজ বানান, তারা অনেক ক্ষেত্রেই যে কাহিনী বিকৃত করার এক মহান ক্রুসেডে নামেন, তাদের থেকে হানশাল মেহতা বরাবরই ভিন্ন পথের পথিক। ঠিক এ কারণেই ভরসা করা যায়, টিপিক্যাল টেরোরিজম-এক্সট্রিমিজম-ক্রাইমে ভরা কোনো থ্রিলার না হয়ে এই সিনেমা হয়তো আসলেই সত্যঘটনা তুলে আনবে। দেখাবে ধর্মের নামে অধর্মের পথে হাঁটা একদল অসভ্যের ধৃষ্টতা। 

তবে আক্ষেপ একটু থেকেই যায়। আমাদের দেশের কত কত ঘটনা, কত কত মানুষ...তাদের নিয়ে কাজ হচ্ছে না। যারাও বা তাদের নিয়ে সামান্য হলেও কাজ করতে চান, তারাও সে কাজ মুক্তি দিতে পারছেন না। আমাদের শিল্পসংস্কৃতির স্বপ্নকে কতল করার জন্যে খড়্গহস্ত যেসব ঘাতক ওঁত পেতে আছেন, তাদের কথা ভাবলে বিস্ময় হয়, বিবমিষা হয়, আক্ষেপ হয়। তখন দিনশেষে অসহায় চোখে তাকাতে হয় অন্য কোথাও। ভরসা করতে হয় অন্য দেশের হানশাল মেহতাদের মর্জির উপর। 

আশা করি, 'আলিগড়', 'শহিদ' অথবা 'স্ক্যাম ১৯৯২' এর মতন সত্যঘটনা অবলম্বনে নির্মিত 'ফারাজ'এও দুর্দান্ত শৈলী দেখাবেন হানশাল মেহতা। ক্যামেরার কলমে গল্প লিখতে তিনি দক্ষ একজন মানুষ। নিরপেক্ষ থেকে এবারেও সে কাজ তিনি বজায় রাখবেন, প্রত্যাশা এটাই। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা