ছিলেন বিবিসি'র সাংবাদিক। দারুণ গান গাইতেন। গানের অ্যালবামও বের করেছিলেন। কমিশনড অফিসার হিসেবে চাকরি করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও। একসময়ে সব ছেড়েছুড়ে এলেন অভিনয়ে। ক্রমশ দুর্দান্ত সব পারফরম্যান্স দিয়ে মুগ্ধ করলেন সবাইকে। কিন্তু এই অভিনয়েও থিতু হলেন না শেষমেশ...

'একই অঙ্গে এত গুণ' বলে যে চালু প্রবাদ আছে বাংলায়, সেটি পুরোপুরি খেটে যায় এই মানুষটির সাথে। চেহারায় সম্মোহনের লেশমাত্র নেই, নায়কোচিত অবয়ব নেই ছিঁটেফোঁটাও, কিন্তু শুধুমাত্র অভিনয় দিয়েই তিনি বহুকাল মুগ্ধ করেছেন সবাইকে। অভিনয়ের আগে ছিলেন বিবিসি'র সাংবাদিক। ছায়ানট থেকে 'নজরুল সঙ্গীত' এর উপর কোর্স করেছেন। বের করেছিলেন গানেরও অ্যালবাম। যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথেও। কিন্তু ললাটে ছিলো অভিনয়ের রাজটীকা, তিনি অন্য কোথাও তিষ্ঠোতে পারেন নি তাই। থিতু হয়েছিলেন অভিনয়ের মঞ্চে। কিন্তু সেখানেও থাকা হয়নি বেশিদিন। অভিমান করে অভিনয় থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন একপর্যায়ে৷ মাঝখানের কিছু বছর অস্বস্তিকর নীরবতার পরে তিনি আবার ফিরেছেন অভিনয়ে। মানুষটি হাসান মাসুদ; আমাদের অলরাউন্ডার!  

কিছু অভিনেতার অভিনয় দেখলে তা আরোপিত না বাস্তব, তা নিয়ে বিভ্রান্ত হতে হয়। তেমনটা হয় হাসান মাসুদের ক্ষেত্রেও। যদিও আমরা ঐ প্রবাদকে তীব্রভাবে বিশ্বাস করি- আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারি; সে প্রবাদ অনুযায়ী, হাসান মাসুদ খানিকটা পিছিয়েই পড়েন। কিন্তু অভিনয়ের ক্ষেত্রে চেহারাই যে মূল আলোচনা না, সেটাকেই ক্রমশ অবলম্বন করেন তিনি। তথাকথিত 'গ্ল্যামার' না থাকা সত্বেও বছরের পর বছর ধরে দুর্দান্ত সব অভিনয়ে তাই তিনি ছাড়িয়ে যান কাছে-দূরের অনেককে। তার অভিনীত ব্যাচেলর, মেড ইন বাংলাদেশ, হাউসফুল, রঙের দুনিয়া, গণি সাহেবের শেষ কিছুদিন, আমাদের সংসার...যারা দেখেছেন, তারা হাসান মাসুদের প্রবল পরাক্রম নিয়ে তাই বিন্দুমাত্র সন্দিহান হন না মোটেও। 

মানুষটির বৈচিত্র‍্যময় কর্মজীবনের উল্লেখ আগেই করেছি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে যুক্ত হয়েছিলেন বাংলাদেশ সামরিক একাডেমিতে, ক্যাডেট হিসেবে৷ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশনও পেয়েছিলেন। সেখানে বেশিদিন মন টিকলো না। নিলেন অবসর। যুক্ত হলেন সাংবাদিকতার সাথে। প্রথমে কাজ করেছেন 'নিউ নেশন' পেপারের সাথে। এরপর 'বিবিসি'র বাংলা বিভাগের সাংবাদিক হিসেবে যুক্ত থাকা অবস্থাতেই মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর 'ব্যাচেলর' সিনেমায় ডাক পেলেন অভিনয়ের। এই সিনেমায় 'হাসান ভাই' চরিত্রে যে অভিনয় করলেন, চরিত্রটিকেই জনপ্রিয় বানিয়ে দিলেন তিনি! তখন 'হাসান মাসুদ' নাট্যমঞ্চে তুমুল আলোচিত এক নাম। 

এরপর কালস্রোতের বহুবিচিত্র বাঁকে নানারকম কাজ করেছেন। তার অভিনীত চরিত্রগুলো ক্রমশ নামডাক করেছে। এবং জনপ্রিয়তার সেই তোড়ে ক্রমশ তিনিও 'গতানুগতিক অভিনয়' এর বহুল সমালোচিত সেই চক্রে ঢুকে পড়েছেন। যখন টনক নড়লো তাঁর, দেখলেন, যেসব নাটকে তিনি অভিনয় করছেন এবং যেসব চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব আসছে, অধিকাংশই লোক-হাসানো, সস্তা ও চটুল কথাবার্তার। দিনের পর দিন একই চরিত্র, একঘেয়ে অভিনয় করতে করতে তিনি ক্রমশ বিপর্যস্ত হলেন। একটা সময়ে তাই সবার অগোচরে, নীরবে-নিভৃতে অভিনয় থেকে নিলেন বিদায়। মাঝখানে অনেক নির্মাতাই গিয়েছেন তার কাছে, নানারকম চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন তাকে। কিন্তু হাসান মাসুদ বরাবরই শ্রদ্ধার সাথে ফিরিয়ে দিয়েছেন সেসব প্রস্তাবকে।

এক যুগেরও বেশি সময় করেছেন দুর্দান্ত সব অভিনয়! 

কিন্তু 'বৈকুন্ঠের খাতা' নাটক থেকে আমরা যেমন সেই বিখ্যাত উক্তি দেখি 'সাহিত্যের কামড় অনেকটা কচ্ছপের কামড়ের মতন, একবার কামড়ে ধরলে আর ছাড়ে না...', এ বিষয়টা হয়তো অভিনয়ের জন্যেও খানিকটা সত্য হয়ে দাঁড়ায়।  হাসান মাসুদও তাই বেশিদিন উপেক্ষা করতে পারেন না অভিনয়কে। সে কারণেই আবার ফেরা ক্যামেরার সামনে। গত বছরে কলকাতার একটি নির্মানেও যুক্ত হওয়ার কথা ছিলো তার। মহামারীর কারণে তা বিলম্বিত হয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বেশকিছু নির্মানের সাথে যুক্ত হয়েছেন তিনি। কিছু ধারাবাহিকে অভিনয় শুরু করেছেন। ইন্টারন্যাশনাল স্ট্রিমিং সাইট 'জি-ফাইভ' এ মোস্তফা সরয়ার ফারকী'র ওয়েব সিরিজ 'লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন'এর কুশীলব তালিকায়ও আছে হাসান মাসুদের নাম। এই ওয়েব সিরিজের ট্রেলারে তাঁর অভিনয় নিয়ে রীতিমতো বিশ্লেষণ হচ্ছে এখন। সুতরাং এটা বলার হয়তো এখনই মোক্ষম সময়, হাসান মাসুদ ফিরেছেন, বেশ ভালোভাবেই ফিরেছেন।

'লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন' এ অভিনয় করছেন তিনি! 

গুণী এ মানুষটি অভিনয়ের পাশাপাশি লিখছেন একটি বইও। নিজের সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে রম্যরসের আত্মজীবনী 'গুডবাই' হয়তো খুব তাড়াতাড়িই আসবে পাঠকের কাছে। লেখালেখির পাশাপাশি গান, পড়াশোনাও চলছে সমানতালে। আমরা প্রত্যাশা করি, সবকিছু সামাল দিয়ে অলরাউন্ডার এ মানুষটি অভিনয়েও দুর্দান্ত শৈলী দেখাবেন। পুরোনো 'হাসান মাসুদ' যে ফুরিয়ে যায়নি, সেটা প্রমাণ করবেন। বাংলাদেশের সংস্কৃতিক্ষেত্রে গুনী মানুষের অভাবজনিত এ সময়ে তিনি নিয়মিত হবেন অভিনয়ে, প্রত্যাশা সেটাও। 

নিরন্তর শুভকামনা। 

ফিচার ছবি কৃতজ্ঞতাঃ দৈনিক প্রথম আলো 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা