ঊনলৌকিক সিরিজের চতুর্থ পর্ব ‘হ্যালো লেডিজ’ বাকি তিন পর্বের চেয়ে একদমই আলাদা। ২৪ মিনিটের এপিসোডে স্লো পেস ঠিক না গেলেও রহস্য আর অলৌকিকতার কারণে দর্শক আঠার মতো লেগে থাকবে গল্পের সাথে...

আমরা মানুষেরা বড় অদ্ভুত। অদ্ভুতুড়ে অনেককিছুই হয় আমাদের সাথে। সবকিছুর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে দেই আমরা। কিন্তু এমন অনেক কিছুও আমাদের সাথে হয় যেগুলোর কোন ব্যাখ্যা দেয়া যায় না। কিছু ভৌতিক, কিছু অশরীরী, কিছু অলৌকিক, কিছু ঊনলৌকিক। 

ধরুন, পরিবার নিয়ে প্রিয় কোন রিয়্যালিটি শো দেখতে বসেছেন। ধরলাম, সালমান খানের বিগ বস। বিগ বসের বাড়িতে সব জায়গায় ক্যামেরা। আমরা দেখছি প্রতিটা কন্টেস্টেন্টকে দিন-রাত। তারা যা করছে তা ই দেখতে পাচ্ছি। সালমান আসলেন পর্দায়, সরাসরি টিভি স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। আপনার দিকে তাকিয়েই যেন প্রশ্ন করলেন- সারাদিন অন্যদের দেখে মজা পাও, আমি তো তোমাকেই দেখছি। সোফার কভারটা তো বেশ সুন্দর। স্বাভাবিকভাবেই আপনি হকচকিয়ে যাবেন। সে কি তাহলে ক্যামেরায় আপনার ড্রয়িং রুম দেখছে? এমনটাও কি সম্ভব?

আমরা অনেককিছুই দেখি স্বপ্নে, বাস্তবে। কিছু থাকে হ্যালুসিনেশন, কিছু স্রেফ কল্পনা। এমন অনেক ঘটনাই আমরা দেখি যেগুলো আমাদের সাথে ঘটে নি এখনো, কিন্তু পরে গিয়ে ঠিকই ঘটে। সেগুলোর নাম দিয়েছি দেজাভ্যু। কীভাবে দেখি আমরা? তাহলে তো আরও অনেক কিছুই আমাদের দেখতে পাবার কথা। 

ঊনলৌকিকের চতুর্থ পর্ব ‘হ্যালো লেডিজ’ সেই দেখার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। প্রথমেই আমরা দেখতে পাই একটি রিয়্যালিটি শো ‘হ্যালো লেডিজ’ এর সেট। যেখানে হাউজওয়াইফরা পার্টিসিপেট করে, সে শোয়ের উপস্থাপিকার নাম সিসিলি। যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন মিথিলা। একশন বলার সাথে সাথেই সিসিলি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে মুখস্থ স্ক্রিপ্ট বলে যায় গড়গড় করে। তারপরই হুট করে সে থেমে যায়, ক্যামেরার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। তার চোখেমুখে ভয়, শঙ্কা। কী যেন দেখে ফেলেছে সে ক্যামেরায়! 

এরকমটা সে প্রায়ই দেখে। সেটে থাকা জুনিয়র এসিস্ট্যান্টকে সে বলে যে আজ সে খারাপ কিছু দেখেছে। প্রায়ই এরকম বলে সিসিলি তাকে, তাই সে গুরুত্ব দেয় না। বলে ঘুমানোতে সমস্যা, ডাক্তার দেখান। সিসিলি বলতে গিয়েও থেমে যায় সে কী দেখেছে। ডাক্তারের কাছে গেলে বলবে হ্যালুসিনেশন, ওষুধ ধরিয়ে দিবে হয়তো। কিন্তু সিসিলি জানে সে যা দেখেছে তা সত্যি, কোথাও না কোথাও, কারও না কারও ড্রয়িং রুমে ঐ ঘটনাটা ঘটেছে। তার চোখে স্পষ্ট এখনো সে ড্রয়িং রুমটার ছবি- একটা সোফা, দেয়ালে একটা ক্যাডেট কলেজের ড্রেস পরা কিশোরী মেয়ের ছবি। কিন্তু কী হয়েছে সেখানে? সিসিলি কি খুঁজে পাবে সে ড্রয়িং রুম? আদৌ কি সে যা দেখেছে তা সত্যি?

হ্যালো লেডিজ- এর বিভিন্ন দৃশ্য

ঊনলৌকিক সিরিজের চতুর্থ পর্ব ‘হ্যালো লেডিজ’ বাকি ৩ পর্বের চেয়ে একদমই আলাদা। সাদাকালো কালার টোন ব্যবহার করায় ইউনিক লেগেছে। খুবই স্লো পেসের গল্প। ২৪ মিনিটের এপিসোডে স্লো পেস ঠিক না গেলেও রহস্য আর অলৌকিকতার কারণে দর্শক আঠার মতো লেগে থাকবে। লেগে থাকবে ইরেশ যাকেরের আশরাফ চরিত্রের জন্যেও। পুরো এপিসোড বলা যায় তার একার কাঁধেই। তিনি সে দায়িত্ব পালন করেছেনও সুনিপুণভাবে। আশরাফের কনফিউশন, তার এক্সপ্রেশন, তার ক্লান্তি, তার হতাশা সবকিছুই ইরেশ তুলে এনেছেন পর্দায়। 

মিথিলাও অল্প সময়ে বেশ ভালো কাজ দেখিয়েছেন। তবে এই এপিসোডের মূল নায়ক বরাবরের মতোই পর্দার পেছনের লোকগুলো। শিবব্রত বর্মন, রবিউল আলম রবি, নেয়ামত উল্লাহ মাসুমের চিত্রনাট্য, ইশতিয়াক হোসেনের ক্যামেরা ওয়ার্ক, সালেহ সোবহান অনিমের সম্পাদনা ও রংবিন্যাস, রাশেদ শরীফ শোয়েবের মিউজিক, নাঈমা জামানের আর্ট ডিরেকশন, সবগুলো ডিপার্টমেন্টই অসাধারণ কাজ দেখিয়েছে। কিছু কিছু শট ছিল যেগুলো অনেকদিন চোখে লেগে থাকবে। ডাস্টবিনে টিভি ফেলার পর হুট করে চালু হয়ে যাওয়া আর ইরেশের তাকিয়ে থাকা, পুরোই অশরীরী অনুভূতি দিয়েছে। 

‘হ্যালো লেডিজ’ অনেকগুলো সাটল ম্যাসেজও দিয়েছে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স, হাউজওয়াইফদের সাথে সামগ্রিক আচরণ, প্যারেন্টিং, ইত্যাদি নিয়ে। সাথে ট্রুম্যান শোয়ের মতো কিছুটা ফিলও দিয়ে গেছে। ঊনলৌকিকের প্রতিটা পর্বই ভাবার জন্য কিছু না কিছু এলেমেন্ট রেখে যাচ্ছে। আর দিয়ে যাচ্ছে দারুণ কিছু দেখার পরিতৃপ্তিও। এই সাইকাডেলিক মুগ্ধতা বজায় থাক শেষ পর্বেও।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা