হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে অনেকের লোভী বলে মনে হতে পারে। তবে তিনি লোভী ছিলেন না। তিনি বলতেন- 'শিল্পীর সময়ের দাম আছে। আপনার কাজে তো আমি ফাঁকি দিচ্ছি না মশাই, আমার পারিশ্রমিক দিতে তাহলে আপনার এত গড়িমসি কেন?'

শ্রোতাদের অনুরোধ ছাড়া সাধারণত হেমন্ত মঞ্চে থাকতেন আর গাইতেন টানা ৪৫ মিনিট। পরপর গান সাজানো থাকতো তার। নির্দিষ্ট সময়ের পর আর এক সেকেন্ডও মঞ্চে থাকতেন না হেমন্ত। 

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বলা একটা বাক্য নিয়ে বেশ রসিকতা হত তখনকার ইন্ডাস্ট্রিতে। বাক্যটি ছিল- 'আমার বাকিটা?' মঞ্চে ওঠার আগে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আয়োজকদের বলতেন- আমার বাকিটা? 

অ্যাডভান্স ছাড়া নিজের বাকি পারিশ্রমিক আদায় না করে হেমন্ত কখনও মঞ্চে উঠতেন না। একবার এক আয়োজক অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে হেমন্তের সামনে এসে আলাপ করতেই হেমন্ত সেই পুরোনো বাক্যটা বললেন- আমার বাকিটা? আয়োজক ভদ্রলোক আঙুল দিয়ে নিজের বুকপকেটের ভেতরে ইশারা করলেন, অর্থাৎ বোঝালেন- আপনার টাকা এখানেই সুরক্ষিত আছে। হেমন্ত বলে উঠলেন- টাকাটা আপনার বুকপকেটে থাকার চাইতে আমার সাইডপকেটে থাকাটা বেশি ভাল নয় কি? 

আয়োজক ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় পড়ে গিয়ে হেমন্তকে তার টাকাটা দিয়ে দিয়েছিলেন।

পারিশ্রমিক কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নেয়ার ক্ষমতা ছিল হেমন্তের। ধীরেন বসু নামের এক ভদ্রলোক প্রায় প্রতিবছর আসতেন "বঙ্গ সংস্কৃতি" অনুষ্ঠানে ধীরেন বসুকে নিয়ে গান গাওয়ানোর জন্য।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

একবার ধীরেন বাবু হেমন্তের বাড়ি আসতেই হেমন্ত তার ড্রাইভার কাম সহকারী সনদকে বললেন- সনদ, ওটা নিয়ে আয় তো। বাড়ির অন্দরমহল থেকে সনদ এক বাণ্ডিল টাকা নিয়ে আসলেন আর হেমন্তের হাতে দিলেন। হেমন্ত সেই বান্ডিল ধীরেন বসুর হাতে দিয়ে বললেন- গতবছর কীসব যাতা নোট দিয়েছিলেন মশাই? কেমন ছেঁড়াখোঁড়া সব নোট! আগে এগুলো পাল্টে দিন, এরপরে আপনার অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আলাপ হবে। তাছাড়া একদম নয়।  

ভাবুন, একটা মানুষ এক বছর ধরে টাকা সযত্নে রেখে দিয়েছেন কারণ সেই পুরোনো নোট তিনি ফেরত দেবেন বলে। পারিশ্রমিক আদায়ের ব্যাপারে একটা মানুষ কতটাই না কঠিন ছিলেন। 

এতসব ঘটনা শুনে অনেক পাঠক হয়ত ইতিমধ্যেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে লোভী বলে আখ্যায়িত করে ফেলেছেন মনে মনে। তবে সেটা তিনি ছিলেন না। তিনি বলতেন আর মেনে চলতেন- শিল্পীর সময়ের দাম আছে। আপনার কাজে তো আমি ফাঁকি দিচ্ছি না মশাই, আমার পারিশ্রমিক দিতে তাহলে আপনার এত গড়িমসি কেন? 

আমাদের মিডিয়ায় এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের কাছে অনেকে টাকা পাওনা, অনেক মানুষের ন্যুনতম পারিশ্রমিক তারা দিতে চান না কাজ শেষ হওয়ার বছরখানেক পরেও। এইসব লোকেরা যখন তাদের প্রিয় শিল্পীর নাম তালিকায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নাম বলে, তখন আমার কেন জানি হাসি পায়!

আজ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্মবার্ষিকী। তার ব্যক্তিত্ব থেকে নিয়মানুবর্তিতা সহ নিজের অধিকার আদায় করে নেয়া- সবকিছুই শেখার আছে আমাদের। তার গান শোনার পাশাপাশি এগুলোও আমরা কোনদিন শিখে ফেলতে পারব- এই কামনায় তাকে জানাই জন্মবার্ষিকীর শুভেচ্ছা।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা