সত্যি তো এটাই, যারা 'গেম অব থ্রোন্স' এর পাঁড় ভক্ত, তাদের জন্যে 'হাউজ অব দ্য ড্রাগন' স্মৃতিরোমন্থনের মোক্ষম দাওয়াই। এবং, পুরো সিজন জুড়ে বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়েই হলো তা। ওপেনিং ক্রেডিটে চিরচেনা ইন্ট্রো, রক্ত-রাজত্ব-রাজনীতির সর্পিল গলিঘুঁজি, চরিত্রদের সাথে দর্শকের একাত্মতা... নষ্টালজিক হওয়া ছাড়া উপায়ও কি ছিলো মোটেও?

কোনো একটি নির্মাণ যখন তুমুল জনপ্রিয় হয় এবং বিশ্বব্যাপী বেশ বড় একটা অডিয়েন্সকে হুক করে ফেলে, এবং পরবর্তীতে যখন সেই নির্মাণকে কেন্দ্র করে আরো কোনো কাজ হয়, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড়ায়- পূর্বসুরীর জনপ্রিয়তা কি ছাপাতে পারবে সাম্প্রতিক কাজ? যে অডিয়েন্সকে ক্যাটার করছে এই কন্টেন্ট, তা কি গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতে উতরোবে? নানাবিধ শিল্পের এই যে মোচ্ছব, এই মোচ্ছবের মহাস্রোতে কি টিকে থাকতে পারবে সদ্যোজাত এ সৃষ্টি? ঠিক এ প্রশ্নগুলোই মাথায় এসেছিলো, যখন শোনা গেলো, 'গেম অব থ্রোন্স' এর প্রিক্যুয়েল আসবে 'হাউজ অব দ্য ড্রাগন' শিরোনামে। এবং 'হাউজ অব দ্য ড্রাগন' এর প্রথম সিজন শেষে এটুকু রাখঢাক না করেই বলা যায়- পূর্বসুরীর পথ থেকে খানিকটা বিচ্যুত হয়েও বেশ দারুণভাবেই এগোচ্ছে আগুন-রক্তের এ উপাখ্যান। 

'গেম অব থ্রোন্স' এর যে পটভূমি, সেখান থেকে তিনশো বছর পিছিয়ে 'হাউজ টারগেরিয়ান' এর এই যে রাজত্ব, সেখানে রাজত্বের আড়ালের নানা হিসেব-নিকেশ- রক্তপাত দেখে কতটুকু তাড়িত হওয়া যাবে, সে প্রশ্ন ছিলো। 'গেম অব থ্রোন্স' কিংবা অন্যান্য জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজগুলোর সাথে দর্শকের সখ্যতার যে মূল কারণ, অর্থাৎ, চরিত্রের সাথে একই স্পিরিচুয়াল জার্নিতে থাকা, সেটা যে 'হাউজ অব দ্য ড্রাগন' এর ক্ষেত্রে অনুপস্থিত হবে, এখানে যে বড় বড় টাইম জাম্প থাকবে, চরিত্রগুলো কাছে আসার আগেই যে বেমালুম হবে অদৃশ্য, সেটা নিয়েও ছিলো ভ্রুকুটি। বাজেটের 'ভাঁড়ারে টান'ও ছিলো দুশ্চিন্তার কারণ। কিন্তু, সেসবকিছু থাকা সত্বেও 'হাউজ অব দ্য ড্রাগন' সেভাবেই নাড়া দিলো, যেমনটা প্রত্যাশা ছিলো সিংহভাগ দর্শকের। প্রাথমিক মুগ্ধতার সেটাই কারণ। 

আগামী সিজনে রেনেইরা টারগেরিয়ানের উপরে আলো থাকবে অনেকটুকু

কিং ভিসেরিস টারগেরিয়ানের টালমাটাল সময়কাল, ডেমন টারগেরিয়ানের স্বেচ্ছাচার, রেনেইরা টারগেরিয়ানের অপ্রত্যাশিত সব চাল, এলিসেন্ট হাইটাওয়ারের সর্পিল সঞ্চারন, ড্রাগনের সশব্দ হুঙ্কার, ক্ষমতার কৃষ্ণকায় লোভ, রাজত্বের রাজনীতি, ফায়ার অ্যাণ্ড ব্লাড... বিভিন্ন-বিচিত্র উপাদানকে মিলিয়ে গল্পের বুনোট যেরকম, যেরকম করে ফাঁদা হয়েছে ঘটনা-পরম্পরার প্রেক্ষাপট, সেখানে নানাবিধ চলকের উপস্থিতি যেভাবে বিচিত্র সহাবস্থানে, সেসব দুর্দান্ত। তারা ক্লিকও করেছে ভালোভাবে। যদিও, গল্পের বিল্ডাপে প্রথমদিকে ঢিমেতালের প্রগ্রেস অনেকেরই ঠিক ভালো লাগেনি। আবার, কালার টোনের ডার্ক অ্যাটমোস্ফিয়ারও কিছু এপিসোডে চোখের পীড়া দিয়েছে বেশ। ক্যারেক্টারদের হুটহাট পরিবর্তন হওয়াও ছিলো খানিকটা ধৈর্যচ্যুতির কারণ। কিন্তু, 'গেম অব থ্রোন্স' এর সিজন ফিনালের অন্তিমপর্বে  টিরিয়ন ল্যানিস্টার যেমনটা বলেছিলেন, ভালো গল্পই আমাদের আটকে রাখে কক্ষপথে, তেমনটা হয়েছে এখানেও। বিচ্যুতির নানাবিধ উপলক্ষ্য থাকা সত্বেও মূল গল্পই আমাদের রেখেছে জুড়ে। সে সাথে, থেকে থেকে 'গেম অব থ্রোন্স' এর প্রোভোকেটিভ হিন্টসও ছিলো এই জার্নির সাথে অ্যাটাচড হওয়ার বিশেষ প্রভাবক। 

'হাউজ অব দ্য ড্রাগন' এর তুরুপের তাস- ডেমন টারগেরিয়ান

পাশাপাশি, গুরুত্বপূর্ণ অবয়বে ধরা দিয়েছে 'হাউজ অব দ্য ড্রাগন' এর স্ট্রাটেজিও, যে স্ট্রাটেজি 'গেম অব থ্রোন্স' থেকে খানিকটা স্বকীয়ই মনে হয়েছে। 'নগ্নতা' যেখানে ছিলো 'গেম অব থ্রোন্স' এর প্রথম দিককার অন্যতম সেলিং পয়েন্ট, সেখানে 'হাউজ অব দ্য ড্রাগন' এর সেক্সুয়াল পোর্ট্রেয়াল খুবই মিনিমাল, সাটল। যুদ্ধের ইঙ্গিত এই টিভি সিরিজ বারবারই দিলেও ঠিকঠাক যুদ্ধ হয়েছে মাত্র একবার। তবে, যুদ্ধের ডামাডোলে ঘাটতি থাকলেও তা যে গল্পের জৌলুশ কমিয়েছে, তাও না। যুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা ছাপিয়ে বরং এই সিরিজে উঠে এসেছে অন্যান্য প্রসঙ্গ। জেন্ডার ডেস্ক্রিমিনেশন, এলজিবিটিকিউ, পাওয়ার স্ট্রাগল, ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন, মিথ, ফ্যান্টাসি... বহুকিছু। এসব যে খুব ফোর্সফুলি এসেছে, তাও না। খুবই অর্গানিক্যালি ব্লেন্ড করা হয়েছে যাপিত সব সোশ্যাল কন্টেক্সটকে। এটা হওয়ারও ছিলো৷ বিশাল ক্যানভাসের গল্পে সবকিছুই লাউড হতে হবে, ওভার দ্য টপ হতে হবে, এমন মাথার দিব্যি যেহেতু কেউ দেয়নি, সেহেতু এই সাটল অ্যাপ্রোচটাও বেশ বুদ্ধিদীপ্ত ছিলো।

তবে, যারা জর্জ আর আর মার্টিনের 'ফায়ার অ্যান্ড ব্লাড' পড়েছেন, তারা জেনে থাকবেন, এই এপিকে অনেককিছুই মার্টিন সরাসরি না বলে বরং সাটল মেটাফোরের আশ্রয়ে বুঝিয়েছেন। কিন্তু সেগুলোই যখন 'হাউজ অব দ্য ড্রাগন' এর অ্যাডাপ্টেশনে এসেছে, কেন যেন সোজাসুজি দেখিয়ে দেয়া হয়েছে সব। যেটা হয়তো অনেক পাঠকেরই মনঃপীড়ার কারণ হবে। কিছু বিষয়, যেসবের মীমাংসা মার্টিন নিজেও বইতে করেননি, সেগুলোর সরাসরি পোর্ট্রেয়াল না করে খানিকটা রূপকের আশ্রয় বোধহয় নেওয়া যেতো। টাইম জাম্পের ফলশ্রুতিতে ক্যারেক্টারদের সাথে একীভূত না হবার যে আক্ষেপ, সেটা অন্য কোনোভাবে পূরণ করার প্রয়াস দেখলেও বোধহয় স্বস্তি হতো। আরেকটু 'র' বোধহয় এই এপিকও হতে পারতো। সেসব হয়নি। সেখানে খানিকটা অতৃপ্তির আনাগোনা। 

তবে, এগুলো সবই ছোটখাটো স্বগতোক্তি। সত্যি তো এটাই, যারা 'গেম অব থ্রোন্স' এর পাঁড়ভক্ত, তাদের জন্যে 'হাউজ অব দ্য ড্রাগন' স্মৃতিরোমন্থনের মোক্ষম দাওয়াই। এবং, পুরো সিজন জুড়ে বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়েই হলো তা। ওপেনিং ক্রেডিটে চিরচেনা ইন্ট্রো, রক্ত-রাজত্ব-রাজনীতির সর্পিল গলিঘুঁজি, চরিত্রদের সাথে দর্শকের একাত্মতা...  'গেম অব থ্রোন্স' এর প্রত্যেক সিজন শেষে পরবর্তী সিজনের জন্যে যেমন হাপিত্যেশ থাকতো, থাকতো বহুরকম অঙ্ক কষা, সেটা বহাল রইলো এই সিরিজের শেষেও। যে ক্লিফহ্যাঙ্গারে শেষ হলো মার্টিন বুড়োর এই মহাকাব্যের প্রথম অধ্যায়, সেখানে যেভাবে অ্যাড্রেনালিন রাশ হলো, তাতে বেশ ভালোই বোঝা গেলো- এই মহাকাব্যের পরবর্তী অংশটুকু কেমন হবে, সেটা জানার জন্যেও দর্শকের থাকবে একাগ্র আগ্রহ। নিঃসীম প্রতীক্ষা। এই নৈরাশ্যের পৃথিবীতে এই প্রতীক্ষাও বা কম কি?


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা