আত্মহত্যার কথা বলা হলেও, দিনশেষে বুরারির ঘটনাটা একটা অমীমাংসিত রহস্যের নাম। পুলিশের খাতায়ও আনসলভড মিস্ট্রি হিসেবেই ঠাঁই পেয়েছে এটি। পরিচালক লীলা যাদবও জোর করে এটিকে 'খুন' বা 'আত্মহত্যা' কোন মোটিভেই জোর দেননি। তিনি শুধু ঘটনা ও তদন্তের সঙ্গে জড়িত লোকজন এবং স্বজনদের বয়ান তুলে ধরেছেন নিরপেক্ষভাবে...

পয়লা জুলাই ২০১৮, সকাল বেলা। দিল্লি শহর ঘুমায় না, জেগে থাকে দিনরাত। তবে বুরারি এলাকাটা রাত দশটা বাজতেই নিরিবিলি হয়ে যায়, সকালে আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে ওঠেও একটু বেলা করে। তবে সেই দিন একটু অন্যরকম হলো। বুরারির সন্ত নগরের ২৪ নম্বর সড়কের দোতলা বাড়িটির সামনে পুলিশের ভিড়, সাইরেন বাজিয়ে একের পর এক এম্বুলেন্স ঢুকছে এলাকায়, মিডিয়া কর্মীরা ভিড় জমাচ্ছেন, টিভি চ্যানেল আর পত্রিকার লোগোওয়ালা গাড়িতে ছেয়ে গেছে ২৪ নম্বর রোড। 

আশেপাশের বাড়িগুলোর বাসিন্দারা উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন কী হচ্ছে সেখানে। তবে খবরটা তারা পেয়ে গেছেন ততক্ষণে। গত বিশ বছর ধরে যে ভাটিয়া পরিবারকে তারা চেনেন, সুখে-দুঃখে যারা একসঙ্গে দুইটি দশক কাটিয়ে দিয়েছেন, সেই পরিবারের এগারো জন সদস্যের লাশ পাওয়া গেছে ঘরের ভেতর! 

শুধু দিল্লি নয়, গোটা ভারতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল মর্মান্তিক এই ঘটনা। ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল পরিবারের দশ সদস্যের লাশ। আরেকজনের মৃতদেহ আবিস্কৃত হয়েছিল শোবার ঘর থেকে। তারও মৃত্যু হয়েছিল শ্বাসরোধে। প্রথমে হত্যাকান্ড ভেবেই তদন্ত শুরু করেছিল পুলিশ। কিন্তু তদন্ত করতে গিয়ে বেশ কিছু অদ্ভুত ঘটনার দেখা পায় তারা। ধীরে ধীরে রহস্যের জট খোলে, একেকটা সুতো ধরে এগিয়ে যেত যেতে তদন্ত কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, হত্যাকান্ড নয়, এটি ছিল গণ-আত্মহত্যার ঘটনা। ভারতের ইতিহাসে এমন কিছু এর আগে কখনও ঘটেছে বলে জানা নেই। 

‘হাত, আঁখ অউর মু বাঁধনে সে হি মোক্ষ কি প্রাপ্তি হোগি’। ভাটিয়া পরিবারেই  ডায়েরিতে লেখা ছিল এই লাইনগুলো। বাংলা করলে অর্থটা দাঁড়ায়- 'হাত, চোখ আর মুখ বাঁধলে (মৃত্যুর আগে) মোক্ষ প্রাপ্ত হওয়া যাবে।' কোনো গুপ্ত সাধনা বা অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাস করে এই ‘মোক্ষ’র লোভেই পয়লা জুলাইয়ের মধ্যরাতে বুরারির সন্তনগরের গোটা ভাটিয়া পরিবার চোখ, মুখ বেঁধে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে পড়েছিল বলে সিদ্ধান্তে উপনীত হয় পুলিশ। 

হাউজ অফ সিক্রেটস: দ্য বুরারি ডেথস

তাদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এমনকি প্রতিবেশিরাও ঘুণাক্ষরে কল্পনা করতে পারেনি, এই মানুষগুলো মনের ভেতরে এমন ভ্রান্ত বিশ্বাস লুকিয়ে রেখে নিজেদের শেষ করে দিতে চলেছে। ত্রিশে জুনের দিবাগত রাতে গোটা বুরারি যখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সন্ত নগরের ২৪ নম্বর রোডে মৃত্যুর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে এনেছিল এই এগারোজন। যে দলে ছিলেন আশি বছরের প্রৌঢ়া থেকে চৌদ্দ বছরের কিশোরও! 

বুরারির সেই ম্যাস-সুইসাইডের ঘটনা নিয়ে নেটফ্লিক্স একটা ডকুমেন্টরি বানিয়েছে, গত ৮ অক্টোবর রিলিজ পেয়েছে 'হাউজ অফ সিক্রেটস: বুরারি ডেথস নামের সেই ডকুমেন্টরি। পরিচালক লীলা যাদব এই ঘটনা নিয়ে পাবলিক ডোমেইনে থাকা তবে তথ্যগুলোকেই চমৎকারভাবে সন্নিবেশ করেছেন। তুলে এনেছেন নিহতদের আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী, ঘটনার তদন্তকাজে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তা, মৃতদেহগুলোর পোস্ট মর্টেমের সঙ্গে জড়িত থাকা মেডিকেল এক্সপার্ট, সেই ঘটনা কাভার করা একাধিক সাংবাদিক ও নিউজরুম এডিটর, এমনকি একজন অভিযুক্তের (যিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন বলে পরে জানিয়েছে পুলিশ) বয়ানও। নির্দিষ্ট কোন ঘটনার ওপর এমন সুনির্মিত ইনভেস্টিগেটিভ ডকুমেন্টরি খুব কমই পাওয়া যায়। এই জনরায় 'হাউজ অফ সিক্রেটস: বুরারি ডেথস' তাই অনন্য এক সংযোজন। 

প্রথাগত ডকুমেন্টরির বাইরে গিয়ে হাউজ অফ সিক্রেটস অনন্য হয়ে উঠেছে একটি জায়গায়। ঘটনার তিন বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও যেখানে কেউ আলো ফেলেনি, সেই অন্ধকারে হাত দিয়েছেন পরিচালক লীলা যাদব। এই ডকুমেন্টরির মাধ্যমে মেন্টাল হেলথের ইস্যুটাকে আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন তিনি। আমাদের প্রতিটা পরিবারই যে গোপনীয়তার আধারে পরিণত হচ্ছে, পারস্পরিক যোগাযোগ কমছে, বাড়ছে ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রাচীরের উচ্চতা- সেটা খুব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লীলা। 

এরা সবাই নিহত হয়েছিলেন সেই রাতে

১৩৫ মিনিটের এই ডকুমেন্টরির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রহস্যের চাদরে মোড়ানো। আপনি পুরো ঘটনাটা হয়তো গুগলের মারফতে জানেন, কিন্তু 'হাউজ অফ সিক্রেটস' এর প্রেজেন্টেশনটাই এমন; দেখে মনে হবে সম্পূর্ণ নতুন একটা ঘটনা, নতুন আঙ্গিকে দেখছেন আপনি। ডায়েরি পাঠক হিসেবে নেপথ্যের কণ্ঠস্বর ভয় জাগানিয়া এক শিহরণ উপহার দিয়েছে। সেইসঙ্গে এ আর রহমানের মিউজিক যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা। অনন্য সিনেমাটোগ্রাফি এবং ক্যামেরা ওয়ার্ক 'হাউজ অফ সিক্রেটস' দেখার অভিজ্ঞতাটাকেই অনন্য করে তুলেছে। 

আত্মহত্যার কথা বলা হলেও, দিনশেষে বুরারির ঘটনাটা একটা অমীমাংসিত রহস্যের নাম। পুলিশের খাতায়ও আনসলভড মিস্ট্রি হিসেবেই ঠাঁই পেয়েছে এটি। কারণ সেই ১১ জনের সবাই আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি বাকিদের হত্যা করে পরিবারের নির্দিষ্ট কেউ একজন নিজেও আত্মহত্যা করেছিলেন- সেই প্রমাণ আজও মেলেনি। লীলা যাদবও জোর করে এটিকে 'খুন' বা 'আত্মহত্যা' কোন মোটিভেই জোর দেননি। তিনি শুধু প্রত্যক্ষদর্শী আর স্বজনদের বয়ান তুলে ধরেছেন, ঘটনার সঙ্গে বিভিন্নভাবে জড়িত নানা জনের নানা ঘরানার বক্তব্যকে তিনি ধারণ করেছেন অবিকলভাবেই। এজন্যেই হাউজ অফ সিক্রেটস দর্শকের কাছে পুরোপুরি সৎ এবং নিরপেক্ষ থাকতে পেরেছে। 

বুরারি ডেথসের মতো মর্মান্তিক ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটেছে। ২০০৭ সালে ময়মনসিংহে আদম ধর্মের অনুসারী এক পরিবারের নয়জন ট্রেনের নিচে আত্মহত্যা করেছিলেন এমনই কোন 'মোক্ষ' লাভের আশায়। গতকাল 'হাউজ অফ সিক্রেটস' দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, বাংলাদেশের ঘটনাগুলোকে কি কখনও এভাবে পর্দায় তুলে আনতে পারব আমরা? কেউ কি নিজের কাঁধে তুলে নেবে এই দায়িত্ব? সন্ধ্যে নাগাদ জানতে পারলাম, পরিচালক ভিকি জাহেদ নাকি আদম পরিবারের আত্মহত্যার সেই ঘটনা নিয়ে কন্টেন্ট নির্মাণে হাত দিয়েছেন, স্ক্রিপ্টও চূড়ান্ত হয়ে গেছে। ভিকি জাহেদের জন্য শুভকামনা, দারুণ কিছুর প্রত্যাশায় রইলাম। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা