দুই বছর আগে ঠিক আজকের দিনে সৃষ্টিকর্তা এই মানুষটাকে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের কাছে। পৃথিবীর বুকে যে পরিমাণ অবহেলা আর কটুক্তির শিকার তিনি হয়েছেন, সেটা নিশ্চয়ই তাকে হতে হচ্ছে না অন্য জগতে। সেখানে কেউ তার দিকে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছে না, উচ্চতা নিয়ে বাজে কথা শোনাচ্ছে না, তাকে দশজনের চেয়ে আলাদা চোখে দেখছে না কেউ।

হুমায়ূন কবীর, যাকে আমরা হুমায়ূন সাধু নামে চিনি, সেই মানুষটা হারিয়ে গেছেন চিরতরে। 'ঊন-মানুষ' বা 'চিকন পিনের চার্জার' দিয়ে যিনি আমাদের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন, তিনিই যাত্রা করেছেন অজানার পথে। 

জন্ম তার চট্টগ্রামে, দশ ভাইবোনের বিশাল সংসার। স্বাভাবিক মানুষ বলতে আমাদের সমাজ যে ছবিটা বোঝে, হুমায়ূন কবীর সেরকম কেউ ছিলেন না। উচ্চতায় খাটো ছিলেন। তবে বুদ্ধি বা মানসিকতায় নয়। সেই খাটো হওয়াটাই তাকে পদে পদে বিপত্তির মুখে ফেলেছে। স্কুলে শিক্ষকেরা ভর্তি করাতে চাননি তাকে, বড়বোনের কাছে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন তিনি।

বড় ভাই পড়তেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, পদার্থবিজ্ঞানে। তিনি এসে অনুরোধ করলেন শিক্ষকদের, তারা যাতে একটা সাময়িক পরীক্ষা পর্যন্ত হুমায়ূনকে দেখে। কথা দিলেন, রেজাল্ট ভালো না হলে সে আর স্কুলে আসবে না। পরীক্ষা হলো, দেখা গেল, ক্লাসের প্রায় দেড়শো ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে হুমায়ূন হয়েছেন প্রথম! ক্লাসের বন্ধুরা তাকে ঘাড়ে তুলে মিছিল করতে করতে বাড়িতে নিয়ে এলো। সেই প্রথম হুমায়ূন কবীর তার চারপাশের দুনিয়াকে জানিয়েছিলেন- 'আমি সবার চেয়ে আলাদা। আমি আলাদা আমার যোগ্যতার কারণে, আমার মানসিকতার কারণে, শারীরিক আকারের কারণে আমি আলাদা নই।' বই পড়ার ঝোঁক ছিল ছোটবেলাতেই। লিখতেও পছন্দ করতেন। স্বপ্ন দেখতেন, বইমেলায় তার লেখা বই প্রকাশিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পরে আরেকটা পোকা ঢুকলো মাথায়- সেটার নাম সিনেমা।

অবহেলা আর কটুক্তির শিকার হতে হয়েছে মানুষটাকে

২০০০ সালের ঘটনা, চট্টগ্রামে এক কর্মশালায় এসেছেন বিজ্ঞাপন ও নাটকের নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তার কথা শুনে হুমায়ূন মুগ্ধ হয়ে গেলেন। নিজেকে বানিয়ে নিলেন ফারুকীর ভাবশিষ্য, ঠিক করলেন, গুরুর সাথে তাকে কাজ করতেই হবে। পড়াশোনা শেষ হতেই পাড়ি জমালেন ঢাকায়, জাদুর শহরে তার গুরু থাকেন! ফারুকীর সাথে দেখা হলো তার, পরিচয় দিলেন- 'বস, আমি চিটাগাং থেকে আসছি!' দিনভর আড্ডা হলো ফারুকী আর তার ভাইব্রাদারদের সঙ্গে। মনের গহীনে স্বপ্নের বিশাল এক টুকরো মেঘ লুকিয়ে হুমায়ূন আবার ফিরলেন চট্টগ্রামে, যে মেঘটা থেকে বৃষ্টি ঝরবে ক'দিন বাদেই।

হুমায়ুন সাধু ফারুকী
গুরু ফারুকীর সাথে সাধু

আবার ঢাকায় এলেন, এবার পাকাপাকিভাবে। থাকার জায়গা নেই, আয়-উপার্জনও শূন্যের কোঠায়। ফারুকীকে খুলে বললেন তার স্বপ্নের কথা। পড়াশোনা তার ভালো লাগেনি কখনও। তিনি লিখতে চান, পরিচালনা করতে চান। ফারুকী তাকে বোঝালেন, এ বড় কঠিন পথ, অনেক ধৈর্য্যের প্রয়োজন। হুমায়ূন আশ্বাস দিলেন, তার জন্যে ধৈর্য্য কোন সমস্যা না। শুরু হলো ভিন্নপথের যাত্রা, হুমায়ূন কবীর নামের মানুষটার নাম হয়ে গেল হুমায়ূন সাধু। নিজের জীবনের প্রত্যাখ্যান আর যন্ত্রণা নিয়ে সাধু লিখেছিলেন একটা গল্প। স্বাভাবিকের ভীড়ে একটুখানি অস্বাভাবিকতা যে একটা মানুষের জীবনকে কতটা বদলে দিতে পারে, চারপাশের মানুষগুলোর চোখে তাকে অবহেলা আর করুণার পাত্র বানিয়ে দিতে পারে, সেই বর্ণনা তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন প্রতিটা লাইনে, প্রতিটা সংলাপে। ফারুকীকে দেখালেন তিনি গল্পটা, ফারুকীও বানিয়ে ফেললেন নাটক- নাম তার ঊন-মানুষ। মানুষের খুব কাছাকাছি, তবুও সে পরিপূর্ণ মানুষ নয়। সমাজের চোখে, মানুষের চোখে সে আলাদা। নাম ভূমিকায় অভিনয় করলেন হুমায়ূন সাধু নিজে, এক পলকে তাকিয়ে থাকার মতো পারফরম্যান্স! শেষদিকে যখন তার মুখে সংলাপ এলো- 'দৈর্ঘ্য-প্রস্থে আর কতটুকু হলে একটা মানুষকে মানুষ বলা যায়?' শুনে নিজের প্রতি, ভ্রান্ত সমাজব্যবস্থার প্রতি, এই সমাজে ভুল ধারণা নিয়ে বাস করা মানুষগুলোর প্রতি একটা ঘৃণার জন্ম নিয়েছিল। মানুষ হয়েও কেন একজনকে এত তাচ্ছিল্য, এত উপহাস সইতে হবে? স্রষ্টা তাকে একটুখানি কম উচ্চতা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন বলে? কটুক্তিটা স্রষ্টাকে করুন না, বানিয়েছেন তো তিনিই!

'চিকন পিনের চার্জার' নামে একটা নাটক বানিয়েছিলেন, ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল নাটকের নামটা। নাটকে অভিনয় করেছেন, পরিচালনা করেছেন, তাকে দেখা গেছে সিনেমায়, লিখেছেন বই, চিত্রনাট্য, বানাতে চেয়েছিলেন সিনেমাও- পারফেক্ট একজন অলরাউন্ডার ছিলেন মানুষটা। দুনিয়া তাকে নিয়ে হেসেছে, মশকরা করেছে, তার দিকে আঙুল তুলে তাকে বলেছে- ইউ আর আনফিট! সাধু হেসেছেন, একমনে নিজের কাজটা করে গেছেন। জীবনটা দীর্ঘ হয়নি, কিন্ত মনে রাখার মতো অনেকগুলো কাজ করে গেছেন এই ছোট্ট সময়েই। একশো বছরের জীবনে লোকে যা করতে পারে না, সাধু তার এক তৃতীয়াংশেই এরচেয়ে অনেক বেশি ছাপ রেখে গেছেন!

কেউ তাকে অভিহিত করছেন ঊনমানুষ হিসেবে, হয়তো সজ্ঞানে, কিংবা অজ্ঞানে। সাধু ঊনমানুষ ছিলেন না, ছিলেন পরিপূর্ণ মানুষের চেয়েও বেশিকিছু। আমাদের দেখার চোখটা বড্ড সংকীর্ণ, তাই আমরা তাকে মানুষের চেয়ে কম কিছু হিসেবেই বিবেচনা করেছি, এখনও করছি। আসলে তো আমরাই ঊনমানুষ, হুমায়ূন সাধু নন!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা